নতুন পে স্কেলের গেজেট বিলম্বের কারণ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩০ বার
নতুন পে স্কেলের গেজেট বিলম্বের কারণ

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে স্কেলের গেজেট প্রকাশ নিয়ে অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হচ্ছে। মন্ত্রিসভায় নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদনের পর প্রজ্ঞাপন জারির প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকলেও আইনগত যাচাই এবং কয়েকটি বিষয় নিয়ে জটিলতার কারণে এখনো গেজেট প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। ফলে নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে একদিকে যেমন প্রত্যাশা বাড়ছে, অন্যদিকে তেমনি তৈরি হচ্ছে অনিশ্চয়তাও।

গত ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬’ অনুমোদন দেওয়া হয়। দীর্ঘদিন ধরে নতুন বেতন কাঠামোর অপেক্ষায় থাকা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তখন আশা করেছিলেন, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই প্রজ্ঞাপন প্রকাশ হবে এবং নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা পাওয়া যাবে। মন্ত্রিপরিষদ সচিবও জানিয়েছিলেন, অনুমোদনের পর এক সপ্তাহের মধ্যে গেজেট প্রকাশের লক্ষ্য রয়েছে। তবে নির্ধারিত সময় পার হলেও ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি।

বর্তমানে গেজেট প্রকাশের আগে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নতুন পে স্কেলের প্রজ্ঞাপনের রেজল্যুশন বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয় থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এরপর সেটি আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিং বা আইনি যাচাইয়ের জন্য পাঠানো হয়। ভেটিং শেষ হওয়ার পর প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে এসআরও নম্বরের মাধ্যমে গেজেট প্রকাশ করা হবে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতেও প্রজ্ঞাপনটি আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং পর্যায়ে থাকার কথা জানানো হয়েছে।

গেজেট প্রকাশে বিলম্বের পেছনে শুধু প্রশাসনিক প্রক্রিয়াই নয়, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়েও সমাধানের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে জুডিশিয়ারি সার্ভিসের বেতন ও ভাতা সংক্রান্ত কিছু বিষয় এখনো পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। জুডিশিয়ারি সার্ভিসের কর্মীরা বিভিন্ন ভাতা শতভাগ করার দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু অর্থ বিভাগের পক্ষ থেকে সে দাবির সঙ্গে পুরোপুরি সম্মতি দেওয়া হয়নি। ফলে নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদনের পরও এসব বিষয় কীভাবে চূড়ান্তভাবে সমন্বয় করা হবে, তা নিয়ে পর্যালোচনা চলছে।

অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, মন্ত্রিসভায় বেতন কাঠামো অনুমোদন হয়ে গেলেও গেজেট প্রকাশের আগে প্রজ্ঞাপনের প্রতিটি বিষয় আইনগত ও প্রশাসনিকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ গেজেট প্রকাশের পর সেটিই নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হবে। ফলে কোনো বিষয় অস্পষ্ট বা অসম্পূর্ণ রেখে দ্রুত গেজেট প্রকাশ করলে পরবর্তী সময়ে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আরও জটিলতা তৈরি হতে পারে।

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য গেজেটটি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার আরেকটি কারণ হলো, মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর বিভিন্ন মাধ্যমে নতুন পে স্কেল নিয়ে নানা তথ্য ছড়িয়ে পড়লেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানা যাবে প্রজ্ঞাপন প্রকাশের পর। বিশেষ করে কোন গ্রেডে কীভাবে বেতন নির্ধারণ হবে, বেতন ফিক্সেশনের নিয়ম কী হবে, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি কীভাবে কার্যকর হবে, পদোন্নতি বা উচ্চতর গ্রেডের ক্ষেত্রে কোন নিয়ম অনুসরণ করা হবে—এসব বিষয়ে গেজেটের নির্দেশনাই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।

একইভাবে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, উৎসব ভাতা, শিক্ষাভাতা এবং অবসর-সুবিধার মতো বিষয় নিয়েও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণার পর এসব সুবিধা নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা ও প্রত্যাশা তৈরি হলেও গেজেট প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত সেগুলোর বাস্তব প্রয়োগ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ নেই।

এদিকে সরকারি কর্মচারীদের একটি অংশ বেতন ফিক্সেশনের নিয়ম নিয়েও আপত্তি ও দাবি জানিয়েছেন। তাদের বক্তব্য, নতুন স্কেলে বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে এমন কোনো পদ্ধতি থাকা উচিত নয় যাতে দীর্ঘদিন চাকরি করার পরও কেউ প্রত্যাশিত আর্থিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। পাশাপাশি শিক্ষাভাতা, বাড়িভাড়া এবং অন্যান্য ভাতার পরিমাণ নিয়েও বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মচারীদের মধ্যে দাবি রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এসব বিষয় পর্যালোচনা করছে বলে জানা গেছে।

তবে গেজেট প্রকাশে সরকারের অনীহা রয়েছে—এমন কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। বরং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় আইনগত যাচাই ও প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতার কারণেই কিছুটা সময় লাগছে। সব জটিলতা দ্রুত নিষ্পত্তি করে প্রজ্ঞাপন প্রকাশের চেষ্টা চলছে। সংশ্লিষ্ট মহলে এমনও আলোচনা রয়েছে যে, প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ হলে আগামী সপ্তাহের শেষ দিকে গেজেট প্রকাশ হতে পারে।

নতুন পে স্কেলের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো সরকারি কর্মচারীদের মূল বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত। অনুমোদিত কাঠামোয় বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রাখা হয়েছে। ২০তম গ্রেডের সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করা হয়েছে। অন্যদিকে ১ম গ্রেডের সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ নিম্নতম ও সর্বোচ্চ পর্যায়ের মূল বেতনে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে।

নতুন কাঠামোয় ১ম থেকে ১১তম গ্রেড পর্যন্ত মূল বেতন ১০০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ১২তম থেকে ২০তম গ্রেডে মূল বেতন বাড়ানোর হার ১১৫ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়িত হলে বিভিন্ন স্তরের সরকারি কর্মচারীদের মাসিক আয় কাঠামোয় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে।

তবে বেতন বৃদ্ধির পুরো আর্থিক সুবিধা একবারে হাতে পাওয়ার সুযোগ থাকছে না। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামো চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু বর্ধিত মূল বেতনের আর্থিক সুবিধা ধাপে ধাপে সমন্বয় করা হবে। প্রথম ধাপে মূল বেতনের একটি অংশ কার্যকর হবে এবং পরবর্তী দুই ধাপে অবশিষ্ট অংশ সমন্বয় করা হবে। এর ফলে নতুন স্কেলের আর্থিক প্রভাব ধীরে ধীরে সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামোয় প্রতিফলিত হবে।

অন্যদিকে বাড়িভাড়াসহ বিভিন্ন আনুষঙ্গিক ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ কারণে সরকারি চাকরিজীবীদের অনেকের কাছে শুধু নতুন মূল বেতন নয়, অন্যান্য সুবিধা কার্যকরের সময়সূচিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর মন্ত্রিসভায় পে স্কেল অনুমোদন পাওয়ায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছিল। কিন্তু গেজেট প্রকাশে সময় বাড়তে থাকায় সেই স্বস্তির সঙ্গে এখন নতুন করে অপেক্ষা যুক্ত হয়েছে। বিশেষ করে বেতন ফিক্সেশন, বকেয়া আর্থিক সুবিধা, ভাতা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে চূড়ান্ত নির্দেশনা না থাকায় অনেকেই নিজেদের নতুন বেতন কত দাঁড়াবে, তা নিশ্চিতভাবে হিসাব করতে পারছেন না।

সরকারি চাকরিজীবীদের প্রত্যাশা, আইনগত যাচাই ও সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর সমাধান দ্রুত শেষ করে গেজেট প্রকাশ করা হবে। কারণ গেজেট প্রকাশের পরই নতুন পে স্কেলের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া আরও স্পষ্ট হবে এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিজেদের বেতন ও ভবিষ্যৎ আর্থিক সুবিধার বিষয়ে নির্ভরযোগ্য হিসাব করতে পারবেন। মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর এখন তাই সবার দৃষ্টি আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং এবং পরবর্তী প্রজ্ঞাপন জারির দিকে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত