গুদামে পর্যাপ্ত সার, মাঠে কৃষকের হাহাকার

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩১ বার
গুদামে পর্যাপ্ত সার, মাঠে কৃষকের হাহাকার

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজশাহীতে সরকারি গুদামে চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত সার মজুত থাকার পরও মাঠপর্যায়ে এর সংকট কাটছে না। আমন ধানের জমিতে সার প্রয়োগের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে প্রয়োজনীয় সার না পেয়ে কৃষকদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ ও ক্ষোভ। কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও কৃষককে খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে, আবার কোথাও বাড়তি দাম দিয়ে সার কিনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সার না পাওয়ার প্রতিবাদে কৃষকদের সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভের ঘটনাও ঘটছে।

প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের হিসাবে রাজশাহীতে বর্তমানে সারের কোনো সংকট নেই। সরকারি বিভিন্ন গুদামে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপির উল্লেখযোগ্য মজুত রয়েছে। এমনকি কোনো কোনো সারের মজুত চলতি মাসের বরাদ্দের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। ফলে গুদামে পর্যাপ্ত সার থাকার পরও কেন কৃষকের হাতে প্রয়োজনের সময় সার পৌঁছাচ্ছে না, তা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।

কৃষকদের অভিযোগ, ডিলারের দোকানে দিনের পর দিন ঘুরেও নির্ধারিত দামে সার পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে ভোরে দোকানের সামনে এসে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েও শেষ পর্যন্ত সার না পেয়ে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে। অথচ একই এলাকার অন্য কোনো দোকান বা খুচরা বাজারে তুলনামূলক বেশি দাম দিলে সার পাওয়া যাচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন তারা। এতে একদিকে কৃষকের সময় ও শ্রম নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে।

পুঠিয়া উপজেলার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি এ সংকটের চিত্র আরও স্পষ্ট করেছে। সার না পেয়ে সেখানে কৃষকদের মহাসড়ক অবরোধ করার ঘটনা ঘটে। কৃষকদের ভাষ্য, আমন ধানের জমিতে সার প্রয়োগের সময় চলে যাচ্ছে। অথচ ডিলারের দোকানে প্রয়োজনীয় সার মিলছে না। ভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেকে সার না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। কৃষকের আশঙ্কা, সময়মতো সার প্রয়োগ করতে না পারলে ধানের ফলনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

ঝলমলিয়া গ্রামের কৃষক আব্দুল আওয়াল জানান, তিন দিন ধরে বাজারে ঘুরেও তিনি ডিলারের কাছ থেকে সার সংগ্রহ করতে পারেননি। তার অভিযোগ, নির্ধারিত দামে ডিলারের দোকানে সার পাওয়া না গেলেও বেশি টাকা দিলে খুচরা বাজারে সার মিলছে। ফলে সরকারি ব্যবস্থাপনায় যে দামে কৃষকের সার পাওয়ার কথা, বাস্তবে সেই সুবিধা অনেক ক্ষেত্রেই নিশ্চিত হচ্ছে না বলে অভিযোগ তার।

কৃষক নরেন কর্মকারের অভিযোগও প্রায় একই। তার ভাষ্য, ভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়েও তিনি সার পাননি। ধানের জমিতে নির্দিষ্ট সময়ে সার প্রয়োগ করা না হলে ফলন কমে যেতে পারে—এমন আশঙ্কায় তিনি উদ্বিগ্ন। তার প্রশ্ন, সরকারি গুদামে যদি পর্যাপ্ত সার থাকে, তাহলে সেই সার কৃষকের কাছে পৌঁছাচ্ছে না কেন?

আরেক কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, তিনি সকাল ৬টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। পরে সকাল ১০টার দিকে জানানো হয়, সার শেষ হয়ে গেছে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি সরকারি বরাদ্দের সার কোথায় যাচ্ছে, সেই প্রশ্ন তোলেন।

অন্যদিকে প্রশাসনের দেওয়া তথ্য বলছে, রাজশাহীতে গুদাম পর্যায়ে সারের মজুত সন্তোষজনক। নগরীর নওদাপাড়া এলাকায় বিএডিসির সার গুদাম পরিদর্শন শেষে বিভাগীয় কমিশনার ইউসুফ আলী জানিয়েছেন, জেলায় সারের কোনো সংকট নেই। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিসিআইসির বাফার গুদামে ৯ হাজার ৮০৪ টন ইউরিয়া, ৪৩০ টন টিএসপি এবং ৮৫ টন ডিএপি মজুত রয়েছে। একই সময়ে বিএডিসির গুদামে ৬ হাজার ৩১২ টন টিএসপি, ৮০১ টন এমওপি এবং ৪ হাজার ৩৪৮ টন ডিএপি রয়েছে।

বিভাগীয় কমিশনারের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসে রাজশাহী জেলায় টিএসপির বরাদ্দ ১ হাজার ৪৫ টন। অথচ শুধু বিএডিসির গুদামেই রয়েছে প্রায় ৬ হাজার ৩০০ টন টিএসপি। আবার ইউরিয়ার মাসিক বরাদ্দ যেখানে ৫ হাজার ৭০০ টন, সেখানে বিসিআইসির বাফার গুদামেই রয়েছে প্রায় ১০ হাজার টন। অর্থাৎ সরকারি হিসাবে মজুতের পরিমাণ নিয়ে ঘাটতির কোনো চিত্র নেই।

বিভাগীয় কমিশনার ইউসুফ আলী বলেছেন, সারের কোনো ক্রাইসিস নেই এবং গুদামে পর্যাপ্ত সার রয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ অনুযায়ী নিয়মিতভাবে ডিলারদের কাছে সার সরবরাহ করা হচ্ছে। ডিলাররা সেই সার দোকানে বিক্রি করছেন বলেও তিনি জানিয়েছেন।

তবে সরকারি গুদামের মজুতের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার এই পার্থক্যই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যেই গোদাগাড়ীতে এক ডিলারের গুদাম থেকে ৮১৭ বস্তা সার উদ্ধারের ঘটনায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত দুই দফা অভিযান চালিয়ে মেসার্স কৃষি ঘর নামের ওই সার ডিলারের গুদাম থেকে ৬১৬ বস্তা এমওপি ও ২০১ বস্তা টিএসপি উদ্ধার করা হয়।

অভিযোগের ভিত্তিতে পরিচালিত অভিযানে অবৈধভাবে সার মজুতের ঘটনায় ডিলার সোলাইমান পাটোয়ারীকে এক মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, তিনি বিসিআইসি ও বিএডিসির সার ডিলার। সার মজুত ও বিক্রির বিষয়ে গত দুই মাসে তাকে তিনবার সতর্ক করা হয়েছিল। এরপরও নিয়ম না মেনে বিপুল পরিমাণ সার গুদামে মজুত রাখায় তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ইসরাত জাহান জানিয়েছেন, কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে ডিলারদের গুদাম ও বিক্রয়কেন্দ্রে অভিযান এবং তদারকি করা হচ্ছে। কেউ অবৈধভাবে সার মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি কিংবা কৃষকদের হয়রানি করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।

তবে কৃষকদের অভিযোগ শুধু একটি ডিলারের গুদামে সার মজুতের ঘটনায় সীমাবদ্ধ নয়। তাদের দাবি, অনেক সময় কোনো ডিলারের দোকানে সার নেই বলা হলেও একই এলাকার অন্য দোকানে বাড়তি দামে সার পাওয়া যাচ্ছে। এতে সরকারি বরাদ্দের সার কীভাবে খুচরা বাজারে যাচ্ছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থার কোন পর্যায়ে অনিয়ম হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু সরকারি গুদামে কত টন সার মজুত আছে, সেই হিসাব দিয়ে মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। গুদাম থেকে ডিলার এবং ডিলার থেকে কৃষকের হাতে সার পৌঁছানোর প্রতিটি ধাপের হিসাব পর্যালোচনা করা জরুরি। কোনো ডিলার কত পরিমাণ সার বরাদ্দ পেয়েছেন, কতটা উত্তোলন করেছেন, কতটা বিক্রি করেছেন এবং বর্তমানে তার গুদামে কত সার থাকার কথা—এসব তথ্য নিয়মিতভাবে যাচাই করা হলে সরবরাহ ব্যবস্থার কোথায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে, তা শনাক্ত করা সহজ হতে পারে।

বিশেষ করে যেসব এলাকায় কৃষকরা সার না পেয়ে সড়কে নেমেছেন, সেসব এলাকার বরাদ্দ ও বিতরণ ব্যবস্থার আলাদা নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কৃষকের প্রকৃত চাহিদার সঙ্গে বরাদ্দ, ডিলারের উত্তোলন এবং বিক্রির হিসাব মিলিয়ে দেখাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কাগজে-কলমে পর্যাপ্ত মজুত থাকলেই কৃষকের সংকট দূর হয় না। প্রয়োজনের সময় নির্ধারিত দামে কৃষকের হাতে সার পৌঁছানোই সরবরাহ ব্যবস্থার কার্যকারিতার প্রকৃত মাপকাঠি।

বর্তমানে রাজশাহীর কৃষকদের সামনে তাই দ্বিমুখী বাস্তবতা। একদিকে সরকারি হিসাব বলছে, গুদামে প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত সার রয়েছে। অন্যদিকে মাঠে সার সংগ্রহ করতে কৃষককে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে, কেউ কেউ খালি হাতে ফিরছেন, আবার কোথাও প্রতিবাদ-বিক্ষোভের মতো ঘটনাও ঘটছে। এই বৈপরীত্যের দ্রুত সমাধান না হলে আমন মৌসুমে কৃষকের উৎপাদন পরিকল্পনা ও ব্যয়—দুই ক্ষেত্রেই চাপ বাড়তে পারে।

কৃষকদের প্রত্যাশা, প্রশাসন শুধু গুদামের মজুত পরিস্থিতি জানিয়ে দায়িত্ব শেষ না করে সরবরাহের শেষ ধাপ পর্যন্ত নজরদারি বাড়াবে। সরকারি বরাদ্দের সার প্রকৃত কৃষকের হাতে নির্ধারিত দামে পৌঁছাচ্ছে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ গুদামে হাজার হাজার টন সার পড়ে থাকলেও তা যদি প্রয়োজনের মুহূর্তে কৃষকের জমিতে পৌঁছাতে না পারে, তাহলে সেই মজুত কৃষকের দুর্ভোগ কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে না।

রাজশাহীর কৃষকদের বর্তমান প্রশ্নটিও তাই সরল—গুদামে যদি পর্যাপ্ত সার থাকে, বরাদ্দও যদি চাহিদার চেয়ে বেশি হয়, তাহলে মাঠে এসে সেই সার কোথায় আটকে যাচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই এখন কৃষকের ভোগান্তি কমানোর সবচেয়ে জরুরি কাজ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত