প্রবাসী আয়ে স্বস্তি, ছয় মাসে বেড়েছে ১৩.১ শতাংশ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩৭ বার
প্রবাসী আয়ে স্বস্তি, ছয় মাসে বেড়েছে ১৩.১ শতাংশ

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে কিছুটা স্বস্তির চিত্র দেখা যাচ্ছে। চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে বাংলাদেশে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স এসেছে ১ হাজার ৮৯৪ কোটি মার্কিন ডলার। আগের বছরের একই সময়ে এসেছিল ১ হাজার ৬৭৪ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ছয় মাসে প্রবাসী আয় বেড়েছে প্রায় ২২০ কোটি ডলার বা ১৩ দশমিক ১ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যেও এই প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা স্পষ্ট হয়েছে।

প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রার জোগান, আমদানি ব্যয় মেটানো, রিজার্ভের ওপর চাপ কমানো এবং লাখো পরিবারের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় রেমিট্যান্সের অবদান উল্লেখযোগ্য। ফলে ছয় মাসে ১৩ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধির খবর অর্থনীতির বিভিন্ন মহলে ইতিবাচক হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ থেকে আগস্ট—এই ছয় মাসের মধ্যে পাঁচ মাসেই আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবাসী আয় বেশি এসেছে। মার্চে দেশে প্রবাসী আয় আসে ৩৭৫ কোটি ২২ লাখ ডলার, যেখানে ২০২৫ সালের একই মাসে এসেছিল ৩২৯ কোটি ৫৬ লাখ ডলার। ফলে মার্চে প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ।

এপ্রিলেও রেমিট্যান্স প্রবাহের ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকে। ওই মাসে প্রবাসীরা দেশে পাঠান প্রায় ৩১২ কোটি ৭৩ লাখ ডলার। আগের বছরের এপ্রিলের ২৭৫ কোটি ২৩ লাখ ডলারের তুলনায় এ প্রবাহ ছিল প্রায় ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। মে মাসে প্রবৃদ্ধি আরও শক্তিশালী হয়। ওই মাসে দেশে আসে প্রায় ৩৪৪ কোটি ২৬ লাখ ডলার, যা আগের বছরের মে মাসের ২৯৬ কোটি ৯৬ লাখ ডলারের তুলনায় প্রায় ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি।

তবে জুনে এসে প্রবৃদ্ধির চিত্র কিছুটা ভিন্ন ছিল। ওই মাসে দেশে প্রবাসী আয় আসে প্রায় ২৮১ কোটি ৯ লাখ ডলার। আগের বছরের জুনে এসেছিল ২৮২ কোটি ২৫ লাখ ডলার। অর্থাৎ দুই বছরের একই মাসের হিসাবে জুনে রেমিট্যান্স প্রায় স্থিতিশীল ছিল এবং সামান্য কমেছে।

জুলাইয়ে আবার রেমিট্যান্স প্রবাহে জোরালো গতি ফিরে আসে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাসে দেশে প্রবাসী আয় আসে প্রায় ২৮৫ কোটি ৮৭ লাখ ডলার। আগের বছরের জুলাইয়ের ২৪৭ কোটি ৭৮ লাখ ডলারের তুলনায় এটি প্রায় ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি।

আগস্টে এসে প্রবৃদ্ধি আরও দৃশ্যমান হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ওই মাসে প্রায় ২৯৬ কোটি ডলার প্রবাসী আয় দেশে এসেছে, যা আগের বছরের আগস্টের প্রায় ২৪২ কোটি ডলারের তুলনায় ২২ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। ছয় মাসের মধ্যে আগস্টেই বছরওয়ারি হিসাবে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে আগস্টের মোট রেমিট্যান্স ২৯৬ থেকে ২৯৭ কোটি ডলারের কিছু বেশি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে; বাংলাদেশ ব্যাংকের মাসিক তথ্যেও একই সময়ের শক্তিশালী প্রবাহের চিত্র পাওয়া যায়।

রেমিট্যান্স বৃদ্ধির এই প্রবণতার পেছনে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের পরিবর্তিত পরিস্থিতি এবং প্রবাসীদের আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার ওপর আস্থার মতো বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সাম্প্রতিক সময়ে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানো সহজ ও আকর্ষণীয় করার পাশাপাশি হুন্ডির মতো অনানুষ্ঠানিক ও অবৈধ পথে অর্থ লেনদেন নিরুৎসাহিত করার ওপর জোর দিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেছেন, প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি দেশের বহিঃখাতের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক। তাঁর মতে, বৈধ ব্যাংকিং ও আর্থিক ব্যবস্থার মাধ্যমে কষ্টার্জিত অর্থ দেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রবাসী বাংলাদেশিদের আস্থা বাড়ছে। রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রক্রিয়া আরও সহজ, দ্রুত ও সুবিধাজনক করার পাশাপাশি বৈধ বৈদেশিক মুদ্রাবাজার শক্তিশালী করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

ছয় মাসের রেমিট্যান্সের উৎস বিশ্লেষণ করলেও বাংলাদেশের শ্রমবাজারের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দেশের ভূমিকা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ সময়ে সবচেয়ে বেশি প্রবাসী আয় এসেছে সৌদি আরব থেকে। দেশটি থেকে বাংলাদেশ পেয়েছে প্রায় ৩০৮ কোটি ৮ লাখ ৫০ হাজার ডলার। এরপর রয়েছে যুক্তরাজ্য। দেশটি থেকে এসেছে প্রায় ২৯৪ কোটি ২ লাখ ৭০ হাজার ডলার।

সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকেও এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ—প্রায় ২২৬ কোটি ৭২ লাখ ২০ হাজার ডলার। যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসেছে প্রায় ১৭১ কোটি ৬৫ লাখ ৪০ হাজার ডলার এবং মালয়েশিয়া থেকে এসেছে প্রায় ১৪৮ কোটি ৭০ লাখ ৬০ হাজার ডলার। এই পাঁচ দেশ মিলিয়ে ছয় মাসে বাংলাদেশ পেয়েছে প্রায় ১ হাজার ১৫০ কোটি ডলার, যা ওই সময়ে দেশে আসা মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৬০ দশমিক ৭ শতাংশ।

প্রবাসী আয়ের এই প্রবাহ শুধু জাতীয় অর্থনীতির পরিসংখ্যানেই স্বস্তির খবর নয়; এর সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে দেশের অসংখ্য পরিবারের জীবন। বিদেশে কর্মরত একজন বাংলাদেশি যখন মাস শেষে পরিবারের কাছে অর্থ পাঠান, সেই অর্থ দিয়ে অনেক পরিবার সন্তানের পড়াশোনা চালায়, ঘর নির্মাণ করে, চিকিৎসা ব্যয় মেটায় কিংবা ছোট ব্যবসায় বিনিয়োগ করে। গ্রামের অর্থনীতিতেও এসব অর্থের প্রভাব পড়ে। ফলে রেমিট্যান্স বাড়ার অর্থ অনেক পরিবারের জন্য আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্যে কিছুটা স্বস্তি তৈরি হওয়া।

অন্যদিকে, জাতীয় অর্থনীতির ক্ষেত্রেও প্রবাসী আয় বৈদেশিক মুদ্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। আমদানি ব্যয় পরিশোধ, বৈদেশিক দায় মেটানো এবং বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে তারল্য বজায় রাখতে রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে বৈদেশিক বাণিজ্য ও অর্থপ্রদানের ভারসাম্যে চাপ থাকলে রেমিট্যান্সের ধারাবাহিক প্রবাহ অর্থনীতিকে কিছুটা সুরক্ষা দিতে পারে।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারেও রেমিট্যান্সকে গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও রেমিট্যান্স প্রবাহ শক্তিশালী ছিল এবং নতুন অর্থবছরের শুরুতেও সেই প্রবণতা বজায় রয়েছে। জুলাই-আগস্টের প্রাথমিক প্রবাহও আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল।

তবে রেমিট্যান্সের এই ইতিবাচক ধারাকে দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে হলে প্রবাসীদের জন্য বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর প্রক্রিয়া আরও সহজ ও প্রতিযোগিতামূলক করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ব্যাংকিং সেবার গতি, লেনদেনের খরচ, বিনিময় হার, অর্থ পাঠানোর সুবিধা এবং দ্রুত পরিবারের হাতে টাকা পৌঁছানোর বিষয়গুলো প্রবাসীদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে অবৈধ হুন্ডি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপও অব্যাহত রাখতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, রেমিট্যান্সের প্রবাহ শক্তিশালী হলে দেশের লেনদেনের ভারসাম্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে এবং বহিঃখাতে স্থিতিশীলতা বাড়বে। সরকারের চলমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা পুনর্গঠনের উদ্যোগও ভবিষ্যতে আরও বেশি প্রবাসীকে বৈধ পথে অর্থ পাঠাতে উৎসাহিত করতে পারে।

সব মিলিয়ে মার্চ থেকে আগস্টের ছয় মাসের পরিসংখ্যান বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয়ের গুরুত্ব আবারও সামনে এনেছে। পাঁচ মাসে প্রবৃদ্ধি এবং আগস্টে ২২ দশমিক ৩ শতাংশের শক্তিশালী বৃদ্ধি দেখাচ্ছে যে বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহের সম্ভাবনা এখনও বড়। এখন এই প্রবাহকে আরও স্থিতিশীল ও টেকসই করা এবং বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের জন্য নিরাপদ, দ্রুত ও সহজ অর্থ পাঠানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ। তা করা গেলে প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থ যেমন আরও কার্যকরভাবে দেশের অর্থনীতিতে যুক্ত হবে, তেমনি বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থান ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ পাবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত