যুক্তরাষ্ট্রে কর্মী ভিসায় আসছে নতুন কঠোর নিয়ম

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২৯ বার
যুক্তরাষ্ট্রে কর্মী ভিসায় আসছে নতুন কঠোর নিয়ম

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের জন্য কর্মী ভিসার নিয়মে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। বিশেষ করে এইচ-১বি ভিসাধারীসহ কয়েক ধরনের বিদেশি কর্মী চাকরি হারানোর পর নতুন চাকরি খোঁজার জন্য যে অতিরিক্ত ৬০ দিন সময় পান, সেই সুযোগ বাতিল করার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবটি কার্যকর হলে চাকরি হারানোর পর যুক্তরাষ্ট্রে থেকে নতুন নিয়োগকর্তা বা ভিসা স্পনসর খোঁজার সুযোগ অনেকটাই সীমিত হয়ে যাবে।

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটির প্রস্তাবিত নিয়মে এ পরিবর্তনের কথা জানানো হয়েছে। বর্তমানে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু কর্মীভিত্তিক ভিসাধারী চাকরি হারানোর পর সর্বোচ্চ ৬০ দিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করে নতুন চাকরি বা স্পনসর খুঁজতে পারেন। ২০১৭ সাল থেকে চালু থাকা এই বিধানটি বিদেশি দক্ষ কর্মীদের জন্য চাকরি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। নতুন প্রস্তাব চূড়ান্ত হলে সেই সুবিধা আর থাকবে না।

এর অর্থ হলো, কোনো বিদেশি কর্মী চাকরি হারালে তার বৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে থাকার সময় দ্রুত শেষ হয়ে যেতে পারে। নতুন চাকরি পাওয়ার জন্য কয়েক সপ্তাহ বা মাস সময় নেওয়ার যে সুযোগ এতদিন ছিল, তা বাতিল হলে অনেক কর্মীকে অল্প সময়ের মধ্যে দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। এতে বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করা বিদেশি কর্মীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু একজন কর্মীর চাকরি হারানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বহু এইচ-১বি ভিসাধারী বছরের পর বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। তাদের অনেকের পরিবার দেশটিতে রয়েছে, সন্তানরা স্থানীয় স্কুল বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে এবং কেউ কেউ বাড়ি কিনে স্থায়ীভাবে জীবনযাপন করছেন। চাকরি হারানোর পর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে নতুন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে না পারলে পুরো পরিবারকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

এই বাস্তবতায় প্রস্তাবিত নিয়মটি বিদেশি কর্মীদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে। একজন কর্মীর চাকরি চলে যাওয়ার ঘটনা সাধারণত শুধু তার নিজের আয় বন্ধ হওয়ার বিষয় নয়; এর সঙ্গে বাসস্থান, সন্তানের পড়াশোনা, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবারের ভিসা পরিস্থিতি এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনাও জড়িয়ে থাকে। ফলে ৬০ দিনের সময়সীমা বাতিলের প্রস্তাবটি অনেক পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। দেশটির বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও পরামর্শক সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে দক্ষ বিদেশি কর্মী নিয়োগে এইচ-১বি ভিসার ওপর নির্ভর করে আসছে। ভারত, চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রকৌশলী, সফটওয়্যার বিশেষজ্ঞ, তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী এবং অন্যান্য উচ্চদক্ষ কর্মীরা এই ভিসার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করছেন।

কোনো কর্মী চাকরি হারানোর পর নতুন প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়ার সুযোগ না পেলে তাকে দ্রুত যুক্তরাষ্ট্র ছাড়তে হলে নিয়োগকর্তা ও কর্মী—উভয়ের ওপরই বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে প্রযুক্তি খাতে কর্মীদের চাকরি পরিবর্তনের সময় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, নতুন নিয়োগকর্তার স্পনসরশিপ এবং অভিবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সময় লাগে। সেই প্রক্রিয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় না থাকলে দক্ষ কর্মীদের একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে চলে যেতে বাধ্য হতে পারেন।

প্রস্তাবিত পরিবর্তন অবশ্য শুধু এইচ-১বি ভিসাধারীদের জন্য নয়। আরও কয়েক ধরনের কর্মীভিত্তিক ভিসাধারীও এর আওতায় পড়তে পারেন। আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ীদের জন্য ই-১ ভিসা, নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক কার্যক্রমে যুক্ত ব্যক্তিদের ই-২ ভিসা, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী ও ব্যবস্থাপকদের জন্য এল-১ ভিসা এবং বিজ্ঞান, শিক্ষা, ব্যবসা, ক্রীড়া বা শিল্পকলায় অসাধারণ দক্ষতার অধিকারীদের জন্য ও-১ ভিসাধারীরাও এর প্রভাবের মধ্যে আসতে পারেন।

এ ছাড়া উত্তর আমেরিকার বাণিজ্য চুক্তির আওতায় নির্দিষ্ট পেশাজীবীদের জন্য ব্যবহৃত টিএন ভিসাধারীদের ক্ষেত্রেও পরিবর্তনটি প্রযোজ্য হতে পারে। সিঙ্গাপুর ও চিলির দক্ষ কর্মীদের জন্য ব্যবহৃত এইচ-১বি১ ভিসা এবং অস্ট্রেলিয়ার বিশেষায়িত কর্মীদের জন্য ই-৩ ভিসাধারীরাও প্রস্তাবিত নিয়মের আওতায় পড়বেন।

তবে এখনই এই পরিবর্তন কার্যকর হচ্ছে না। প্রস্তাবিত নিয়মটি চূড়ান্ত করার আগে দুই মাস ধরে সাধারণ মানুষের মতামত নেওয়া হবে। এই সময়ের মধ্যে অভিবাসন বিশেষজ্ঞ, ব্যবসায়ী সংগঠন, নিয়োগকর্তা, কর্মী এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পক্ষ তাদের মতামত ও আপত্তি জানাতে পারবেন। এরপর সরকার এসব মতামত বিবেচনা করে নিয়মটি চূড়ান্ত করবে কি না, কিংবা কোনো পরিবর্তনসহ কার্যকর করবে কি না, তা নির্ধারণ করবে।

ট্রাম্প প্রশাসন অভিবাসন ব্যবস্থায় বিভিন্ন পরিবর্তনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মসংস্থান ও জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলে আসছে। বিদেশি কর্মীদের ক্ষেত্রে নিয়োগপ্রক্রিয়া আরও কঠোর করা এবং অভিবাসন ব্যবস্থার অপব্যবহার ঠেকানোর বিষয়টিও প্রশাসনের নীতিতে গুরুত্ব পেয়েছে। নতুন প্রস্তাবিত নিয়ম সেই বৃহত্তর অভিবাসন নীতিরই একটি অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অন্যদিকে, বিদেশি দক্ষ কর্মীদের ওপর নির্ভরশীল মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও নতুন নিয়মটি গুরুত্বপূর্ণ। একটি প্রতিষ্ঠান কোনো বিদেশি কর্মীকে নিয়োগ দেওয়ার পর সেই কর্মী হঠাৎ চাকরি হারালে তার যুক্তরাষ্ট্রে থাকার সুযোগ সীমিত হয়ে গেলে নিয়োগকর্তারাও দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হতে পারেন। এতে কর্মী ধরে রাখা, নতুন নিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিভা আকর্ষণের ক্ষেত্রেও প্রভাব পড়তে পারে।

বিশেষ করে প্রযুক্তি ও উচ্চদক্ষ পেশার ক্ষেত্রে একজন কর্মীকে নিয়োগের পর তার অভিবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সময় ও অর্থ ব্যয় হয়। ফলে চাকরি হারানোর পর নতুন নিয়োগকর্তার কাছে যাওয়ার জন্য যে সময়টি বর্তমানে রয়েছে, তা বাতিল হলে কর্মী ও প্রতিষ্ঠান উভয়ের জন্যই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

বিদেশি কর্মীদের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হতে পারে অনিশ্চয়তা। দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের পর হঠাৎ চাকরি হারালে একজন কর্মীর সামনে একসঙ্গে একাধিক সিদ্ধান্ত এসে দাঁড়াবে—নতুন চাকরি পাওয়া, ভিসার বৈধতা বজায় রাখা, পরিবারের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ এবং প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার প্রস্তুতি নেওয়া। প্রস্তাবিত নিয়ম কার্যকর হলে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আরও কমে যেতে পারে।

তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান নিয়মই কার্যকর থাকবে। ফলে এইচ-১বি বা অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ভিসাধারীরা আপাতত প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী চাকরি হারানোর পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নতুন কর্মসংস্থান বা স্পনসর খোঁজার সুযোগ পাবেন। প্রস্তাবিত পরিবর্তনের বিষয়ে আগামী দুই মাসের জনমত গ্রহণের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসননীতিতে এই পরিবর্তন শেষ পর্যন্ত কী প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে চূড়ান্ত নিয়মের ওপর। তবে প্রস্তাবটি এরই মধ্যে বিদেশি দক্ষ কর্মী, তাদের পরিবার এবং তাদের ওপর নির্ভরশীল মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে যেসব কর্মী দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন, তাদের কাছে চাকরি হারানোর পর ৬০ দিনের সময়সীমাটি শুধু একটি প্রশাসনিক সুবিধা নয়, বরং নতুনভাবে জীবন গুছিয়ে নেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ একটি সুযোগ। সেই সুযোগ বাতিল হলে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মী ভিসা ব্যবস্থায় একটি বড় পরিবর্তন আসতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত