গাজা নিয়ে তথ্যচিত্রে ভেনিসে ২৪ মিনিটের করতালি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২৯ বার
গাজা নিয়ে তথ্যচিত্রে ভেনিসে ২৪ মিনিটের করতালি

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এবং বেসামরিক ফিলিস্তিনিদের হত্যার পেছনে থাকা সামরিক ব্যবস্থাকে অনুসন্ধান করে নির্মিত তথ্যচিত্র ‘নাজা’ ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। ছবিটির প্রদর্শনী শেষে দর্শকেরা প্রায় ২৪ মিনিট ৩০ সেকেন্ড দাঁড়িয়ে করতালি দিয়েছেন। উৎসবের ইতিহাসে এটি অন্যতম দীর্ঘ স্ট্যান্ডিং ওভেশন হিসেবে আলোচনায় এসেছে।

৮০ মিনিটের এই তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন ইসরায়েলি নির্মাতা ইউভাল আব্রাহাম ও র‍্যাচেল সোর। গাজা যুদ্ধের সামরিক কৌশল, নজরদারি প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক লক্ষ্য নির্ধারণ এবং এসব ব্যবস্থার মানবিক পরিণতি—এসব বিষয়কে কেন্দ্র করেই তৈরি হয়েছে ছবিটি। ভেনিসে প্রদর্শনীর পর নির্মাতাদের প্রতি দর্শকদের দীর্ঘ এই অভ্যর্থনা তথ্যচিত্রটিকে উৎসবের অন্যতম আলোচিত ছবিতে পরিণত করেছে।

আব্রাহাম ও সোর এর আগে ‘নো আদার ল্যান্ড’ তথ্যচিত্রের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি পান। ২০২৫ সালে অস্কারে সেরা তথ্যচিত্রের পুরস্কার পাওয়া ওই ছবিতে ফিলিস্তিনি সহপরিচালক বাসেল আদরা ও হামদান বাল্লালের সঙ্গে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ এবং ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার বিষয় তুলে ধরা হয়েছিল। নতুন তথ্যচিত্র ‘নাজা’তেও ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের একটি অত্যন্ত বিতর্কিত ও সংবেদনশীল দিককে সামনে এনেছেন তারা।

‘নাজা’ নির্মাণে প্রায় তিন বছর সময় নিয়েছেন দুই নির্মাতা। ছবিটির জন্য ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক এবং বর্তমান সদস্যদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তাজনিত কারণে সাক্ষাৎকারদাতাদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। তাদের মুখ ও কণ্ঠ ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিবর্তন করা হয়েছে। তেল আবিবের বিভিন্ন ছাদে রাতের আঁধারে এসব সাক্ষাৎকার ধারণ করা হয়েছে বলে নির্মাতারা জানিয়েছেন।

তথ্যচিত্রটির নামও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। নির্মাতাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ‘নাজা’ ইসরায়েলি গোয়েন্দা ব্যবস্থায় ব্যবহৃত একটি শব্দ, যা কোনো বিমান হামলায় সম্ভাব্য বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা বোঝাতে ব্যবহার করা হয়। এই শব্দকে ছবির নাম হিসেবে বেছে নিয়ে নির্মাতারা মূলত যুদ্ধের সামরিক পরিকল্পনার সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনের সম্পর্ককে সামনে আনতে চেয়েছেন।

ছবিতে সাক্ষাৎকার দেওয়া কয়েকজন ইসরায়েলি সামরিক সদস্য গাজায় লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের পদ্ধতি এবং প্রযুক্তিনির্ভর সামরিক ব্যবস্থার বিষয়ে কথা বলেছেন। বিশেষভাবে উঠে এসেছে ‘ল্যাভেন্ডার’ নামে একটি এআই-সহায়ক ব্যবস্থার প্রসঙ্গ। নির্মাতাদের দাবি, গাজায় নজরদারি করা টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক থেকে সংগৃহীত ফোনকল, মানুষের চলাচল এবং পারস্পরিক যোগাযোগের মতো তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা সাক্ষাৎকারদাতারা জানিয়েছেন।

তথ্যচিত্রে একজন সাক্ষাৎকারদাতা এই প্রক্রিয়াকে ‘কারখানার মতো’ বলে বর্ণনা করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, বিপুলসংখ্যক সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করার ক্ষেত্রে পুরো ব্যবস্থাটি ছিল অত্যন্ত পদ্ধতিগত। আরেকজন সাক্ষাৎকারদাতা দূর থেকে পরিচালিত সামরিক কার্যক্রমের অভিজ্ঞতাকে অনেকটা ভিডিও গেমের মতো অনুভূতির সঙ্গে তুলনা করেছেন। নির্মাতারা এসব বক্তব্যের মাধ্যমে যুদ্ধের প্রযুক্তিনির্ভরতা এবং মানুষের জীবনের ওপর তার প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

ছবিতে আরও কয়েকজন সাবেক বা বর্তমান ইসরায়েলি সামরিক সদস্য বেসামরিক মানুষের বাড়িঘর ধ্বংস, মানবিক আইন উপেক্ষা এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি সামরিক বাহিনীর ভেতরে তৈরি হওয়া ঘৃণার পরিবেশের বিষয়ে বক্তব্য দিয়েছেন বলে নির্মাতারা জানিয়েছেন। তাদের বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো, যেসব বাড়িকে সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, সেগুলোর অনেকগুলোতে পরিবার বসবাস করত—এমন তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জানা ছিল বলে ছবিতে দাবি করা হয়েছে।

তবে তথ্যচিত্রে উপস্থাপিত এসব বক্তব্য মূলত নির্মাতাদের অনুসন্ধান ও সাক্ষাৎকারদাতাদের দাবি হিসেবে এসেছে। গাজা যুদ্ধকে ঘিরে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনি পক্ষের বক্তব্য, সামরিক অভিযান এবং বেসামরিক হতাহতের কারণ নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র বিতর্ক রয়েছে। ফলে ‘নাজা’ মুক্তির আগেই এমন একটি বিষয়ে নতুন করে আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করেছে, যেখানে যুদ্ধের প্রযুক্তি ও মানবিক মূল্য—দুই বিষয়কে একসঙ্গে দেখা হয়েছে।

নির্মাতা ইউভাল আব্রাহাম জানিয়েছেন, তার প্রত্যাশা হলো পশ্চিমা দেশগুলো ইসরায়েলকে দেওয়া সমর্থন নতুন করে বিবেচনা করুক। নিষেধাজ্ঞাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে ইসরায়েলের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ তৈরির পক্ষেও তিনি মত দিয়েছেন। তার মতে, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনে মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক সমাধানের পক্ষে যারা কাজ করছেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় ভূমিকা তাদের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।

আব্রাহাম ও র‍্যাচেল সোর তাদের অনুসন্ধানের বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও লিখেছেন। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, গাজায় বেসামরিক মানুষের মৃত্যুকে শুধু যুদ্ধের অনিবার্য বা দুঃখজনক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং লক্ষ্য নির্ধারণ ও সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোর মধ্যেই এর একটি পরিকল্পিত মাত্রা ছিল—এমন একটি চিত্র তাদের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। এই উপসংহারই তথ্যচিত্রটির অন্যতম প্রধান বিতর্কিত বক্তব্য।

ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটির প্রদর্শনীর পর দর্শকদের প্রতিক্রিয়ায় সেই বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। প্রায় ২৪ মিনিট ৩০ সেকেন্ড ধরে দাঁড়িয়ে করতালি দেওয়ার সময় দর্শকদের মধ্যে প্রবল আবেগ দেখা যায়। কয়েকজন দর্শক ফিলিস্তিনি পতাকাও তুলে ধরেন। ছবিটির নির্বাহী প্রযোজক এবং অস্কারজয়ী নির্মাতা জোনাথন গ্লেজারও নির্মাতাদের পাশে দাঁড়িয়ে করতালিতে অংশ নেন। ‘দ্য জোন অব ইন্টারেস্ট’ ছবির প্রযোজক জেমস উইলসনও এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।

ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে দীর্ঘ স্ট্যান্ডিং ওভেশনের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এর আগে ‘দ্য ভয়েস অব হিন্দ রজব’ ছবির প্রদর্শনী শেষে প্রায় ২২ থেকে ২৩ মিনিট ধরে করতালি পেয়েছিলেন নির্মাতা কাউথের বেন হানিয়া। গাজাভিত্তিক ওই ছবিটি পরবর্তীতে উৎসবের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পুরস্কার জিতেছিল। এবারের উৎসবে বেন হানিয়া বিচারকমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

‘নাজা’ এবারের ভেনিস উৎসবের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে জায়গা পাওয়া একমাত্র তথ্যচিত্র। উৎসবের প্রাথমিক তালিকা প্রকাশের প্রায় এক মাস পর ছবিটিকে প্রতিযোগিতা বিভাগে যুক্ত করা হয়। নির্মাতারা জানিয়েছেন, প্রায় তিন বছর ধরে ছবিটির কাজ চলায় শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এটি সম্পূর্ণ করার চেষ্টা করতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত মূল প্রতিযোগিতায় জায়গা পাওয়ার পর এর প্রদর্শনী ঘিরে আগ্রহও দ্রুত বেড়ে যায়।

তথ্যচিত্রটির বিষয়বস্তু যেমন রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল, তেমনি এর নির্মাণ পদ্ধতিও আলাদা। নিরাপত্তার কারণে সাক্ষাৎকারদাতাদের পরিচয় গোপন রাখা, মুখ ও কণ্ঠ পরিবর্তন করা এবং রাতের আঁধারে সাক্ষাৎকার ধারণের মতো বিষয়গুলো ছবিটির অনুসন্ধানী চরিত্রকে আরও স্পষ্ট করেছে। একই সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়টি কীভাবে সাধারণ দর্শকের সামনে তুলে ধরা যায়, সেই প্রশ্নেও নির্মাতারা নতুন ধরনের ভাষা ব্যবহার করেছেন।

গাজা যুদ্ধ নিয়ে নির্মিত এই তথ্যচিত্র তাই শুধু চলচ্চিত্র উৎসবের একটি প্রদর্শনী হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সামরিক নজরদারি, লক্ষ্যবস্তু নির্বাচন এবং বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক যে বিতর্ক চলছে, ‘নাজা’ সেটিকে সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও নিয়ে এসেছে। প্রযুক্তি যখন যুদ্ধের সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে, তখন সেই সিদ্ধান্তের মানবিক দায় কার—এমন প্রশ্নও ছবিটির আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।

ভেনিসে দীর্ঘ করতালির পর ‘নাজা’ এখন উৎসবের পুরস্কার ঘোষণার আগেই আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। আগামীকাল শনিবার উৎসবের পুরস্কার ঘোষণা হওয়ার কথা। ছবিটি কোনো পুরস্কার অর্জন করবে কি না, তা সময়ই বলবে। তবে ভেনিসে দর্শকদের প্রায় ২৫ মিনিটের অভ্যর্থনা ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছে, গাজা যুদ্ধের রাজনৈতিক ও মানবিক বাস্তবতা নিয়ে নির্মিত এই তথ্যচিত্র চলচ্চিত্রের বাইরেও একটি বড় আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত