একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ, তীব্র হচ্ছে লোডশেডিং

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৬ বার
একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ, তীব্র হচ্ছে লোডশেডিং

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশে আবারও বাড়তে শুরু করেছে বিদ্যুৎ সংকট। একসঙ্গে একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের ঘাটতি নতুন করে বেড়েছে। এর মধ্যে ভারতের আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেছে। একই সময়ে বন্ধ রয়েছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অপারেটর রাশিয়ান নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বা আরএনপিএলের একটি ইউনিটও। এসব কারণে জাতীয় পর্যায়ে প্রায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের নতুন ঘাটতি তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে বৃহস্পতিবার দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৫৫৭ মেগাওয়াটে।

বিদ্যুৎ উৎপাদন ও চাহিদার এই ব্যবধানের প্রভাব সরাসরি পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনে। রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরাঞ্চলে দিনে একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও নির্ধারিত সময়ের বাইরেও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকছে। অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। কোনো কোনো এলাকায় ৭ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে বলে জানা গেছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় গরমের মধ্যে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষকে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।

বিদ্যুৎ সংকটের পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে কয়েকটি গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রও বর্তমানে উৎপাদনের বাইরে রয়েছে। আবার কিছু কেন্দ্র পুরো সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে গ্যাসের সরবরাহ সংকট। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পাওয়ায় বেশ কয়েকটি কেন্দ্রকে বন্ধ রাখতে হচ্ছে অথবা কম সক্ষমতায় চালাতে হচ্ছে।

আশুগঞ্জের ৪৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রও কারিগরি সমস্যার কারণে উৎপাদনের বাইরে চলে গেছে। বুধবার কেন্দ্রটি ৩১৯ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছিল। কিন্তু পরে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ায় কেন্দ্রটির উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। ফলে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ আরও কমে যায় এবং বিদ্যুতের ঘাটতি মোকাবিলায় বিতরণ পর্যায়ে চাপ বাড়ে।

গ্যাস সংকটের প্রভাবও বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। শুধু ঢাকা অঞ্চলের অন্তত সাতটি বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্যাসের অভাবে বন্ধ রয়েছে অথবা কম সক্ষমতায় চলছে। একই ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে দেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ উৎপাদন অঞ্চলেও। চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে একটি করে বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।

বৃহস্পতিবার বিকেলে দেশে বিদ্যুতের মোট চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৩৪৫ মেগাওয়াট। বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছিল ১২ হাজার ৭৮৮ মেগাওয়াট। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় উৎপাদনে ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৫৫৭ মেগাওয়াট। এই ঘাটতি পূরণ করতে বিতরণ কোম্পানিগুলোকে বিভিন্ন এলাকায় পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখতে হচ্ছে। ফলে শহর ও গ্রামের সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে আবারও লোডশেডিং নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বিদ্যুৎ পরিস্থিতিতে আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমে যাওয়া বিশেষভাবে প্রভাব ফেলেছে। ঝড়ের কারণে কয়লা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় গত ৭ আগস্ট থেকে কেন্দ্রটির উৎপাদন কমতে শুরু করে। পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে গত মাসের শেষ দিকে কেন্দ্রটি উৎপাদন বাড়ায়। দিনের বেলায় প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করছিল কেন্দ্রটি।

এরপর বৃহস্পতিবার রাতে কেন্দ্রটির উৎপাদন ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়। এতে জাতীয় গ্রিডে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছিল। কিন্তু একটি ইউনিট হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উৎপাদন আবার ব্যাপকভাবে কমে গেছে। বর্তমানে কেন্দ্রটি থেকে ৭৫০ মেগাওয়াটেরও কম বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। ফলে একদিকে চাহিদা বাড়ছে, অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ একটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে চাপ আরও তীব্র হয়েছে।

বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছে সাধারণ পরিবারগুলো। দিনের দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ঘরের স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে। ফ্রিজ, পানির পাম্প, বৈদ্যুতিক চুলা, ফ্যান ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নিয়মিত চালানো যাচ্ছে না। গরমের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফ্যান বা কুলিং ব্যবস্থা বন্ধ থাকায় মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎনির্ভর ছোট ব্যবসা ও কারখানাগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাতেও এর প্রভাব পড়ছে। সন্ধ্যা ও রাতে যখন পড়াশোনার জন্য সময় প্রয়োজন, তখন দীর্ঘ লোডশেডিং হলে তাদের স্বাভাবিক প্রস্তুতি ব্যাহত হয়। অনলাইনে কাজ করা মানুষ, ফ্রিল্যান্সার, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং কম্পিউটারনির্ভর ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদেরও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে কাজের সময়সূচি পরিবর্তন করতে হচ্ছে। ইন্টারনেট সংযোগ সচল থাকলেও বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে কাজ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

হাসপাতাল, ক্লিনিক ও অন্যান্য জরুরি সেবাকেন্দ্রেও বিদ্যুৎ সরবরাহের স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব প্রতিষ্ঠানে বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থা থাকলেও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বিভ্রাট হলে জ্বালানি ও ব্যাকআপ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। একই সঙ্গে পানি সরবরাহ, লিফট, যোগাযোগব্যবস্থা ও বিভিন্ন নাগরিক সেবাও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে বিঘ্নিত হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সামগ্রিক সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানি সরবরাহ, কেন্দ্রের কারিগরি সমস্যা এবং জাতীয় গ্রিডের ওপর আকস্মিক চাপ—এসব কারণে বাস্তব উৎপাদন অনেক সময় চাহিদার তুলনায় কমে যায়। কোনো বড় কেন্দ্র হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে সেই ঘাটতি দ্রুত পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে গ্যাস ও কয়লার সরবরাহে সমস্যা থাকলে বিকল্প কেন্দ্রগুলো থেকেও কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে দ্রুত বন্ধ থাকা কেন্দ্রগুলো সচল করা এবং গ্যাস ও কয়লা সরবরাহ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে জাতীয় গ্রিডে উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা না গেলে বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং আরও বাড়তে পারে। মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক রাখতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

বিদ্যুতের চাহিদা প্রতিদিনের জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ বা কমে যাওয়ার প্রভাব কেবল বিদ্যুৎ সরবরাহের হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব পড়ে পরিবার, ব্যবসা, শিক্ষা, চিকিৎসা ও শিল্প উৎপাদনের ওপরও। গরমের সময়ে দীর্ঘ লোডশেডিং মানুষের দুর্ভোগকে আরও তীব্র করে তোলে।

এ অবস্থায় দ্রুত বন্ধ থাকা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালু করা, যান্ত্রিক ত্রুটি মেরামত এবং প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। তবে যতক্ষণ পর্যন্ত উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে বড় ব্যবধান বজায় থাকবে, ততক্ষণ বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিংয়ের চাপ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। ফলে স্বাভাবিক বিদ্যুৎ সরবরাহ ফিরে আসার দিকে এখন সাধারণ মানুষের পাশাপাশি ব্যবসায়ী ও শিল্প খাতেরও গভীর নজর রয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত