নাইন ইলেভেনের পর বদলে যায় মুসলিম-আমেরিকা সম্পর্ক

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৬ বার
নাইন ইলেভেনের পর বদলে যায় মুসলিম-আমেরিকা সম্পর্ক

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

‘নাইন ইলেভেন’—দুটি শব্দ, অথচ এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এমন এক ভয়াবহ ইতিহাস, যা ২৫ বছর পরও যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি গোটা বিশ্বের রাজনীতি, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করে চলেছে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে চারটি যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করে সন্ত্রাসী হামলা চালানো হয়। নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের দুটি ভবনে বিমান আঘাত হানে, একটি বিমান আঘাত করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনে এবং আরেকটি বিমান পেনসিলভানিয়ার একটি এলাকায় বিধ্বস্ত হয়। ওই হামলায় প্রায় তিন হাজার মানুষ নিহত হন।

নাইন ইলেভেনের সেই হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নীতি, পররাষ্ট্রনীতি এবং মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক আমূল পরিবর্তিত হয়। হামলার জন্য আল-কায়েদা ও সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ওসামা বিন লাদেনকে দায়ী করে যুক্তরাষ্ট্র। এরপর শুরু হয় তথাকথিত ‘ওয়ার অন টেরর’ বা সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ। আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান, পরবর্তীতে ইরাকে আগ্রাসন এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক ও রাজনৈতিক ভূমিকা বিশ্বের বহু মুসলিম মানুষের মধ্যে আমেরিকাবিরোধী মনোভাব আরও গভীর করে।

একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও নাইন ইলেভেনের অভিঘাত পড়ে। দেশটির মুসলিম জনগোষ্ঠীর একটি অংশের বিরুদ্ধে বৈষম্য, সন্দেহ, হয়রানি ও ঘৃণাসূচক হামলার ঘটনা বেড়ে যায়। ফলে নাইন ইলেভেন শুধু একটি সন্ত্রাসী হামলার নাম নয়; এটি হয়ে ওঠে এমন এক মোড়, যার পর যুক্তরাষ্ট্র ও মুসলিম বিশ্বের পারস্পরিক সম্পর্ক নতুন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৪৬ মিনিটে আমেরিকান এয়ারলাইনসের একটি বোয়িং ৭৬৭ বিমান নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের উত্তর টাওয়ারে আঘাত করে। প্রথমে অনেকেই এটিকে দুর্ঘটনা বলে মনে করেছিলেন। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোও প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে বিমান দুর্ঘটনা হিসেবেই সম্প্রচার করছিল।

কিন্তু মাত্র ১৭ মিনিট পর দ্বিতীয় একটি বিমান দক্ষিণ টাওয়ারে আঘাত হানলে পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে যায়। দ্বিতীয় বিমানটি ভবনে আঘাত করার দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচারিত হয়। মুহূর্তের মধ্যে পরিষ্কার হয়ে যায়, এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়; যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়েছে।

এরপর জানা যায়, আরও দুটি বিমান ছিনতাই করা হয়েছিল। একটি বিমান পেন্টাগনে আঘাত হানে। অন্যটি লক্ষ্যস্থলে পৌঁছানোর আগেই পেনসিলভানিয়ার শ্যাঙ্কসভিলে বিধ্বস্ত হয়। ধারণা করা হয়, যাত্রীরা ছিনতাইকারীদের প্রতিরোধ করার চেষ্টা করায় বিমানটি নির্ধারিত লক্ষ্যস্থলে পৌঁছাতে পারেনি।

মোট ১৯ জন ছিনতাইকারী ওই চারটি বিমান ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তাদের অধিকাংশই সৌদি আরবের নাগরিক ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের তদন্তে পরে আল-কায়েদার সঙ্গে তাদের যোগাযোগের বিষয়টি উঠে আসে। হামলার পরিকল্পনার সঙ্গে খালিদ শেখ মোহাম্মদের নামও গুরুত্বপূর্ণভাবে সামনে আসে।

হামলার কয়েক দিনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের তদন্তকারী সংস্থা ও কর্মকর্তারা আল-কায়েদা এবং ওসামা বিন লাদেনের দিকে আঙুল তোলেন। ২০ সেপ্টেম্বর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে আল-কায়েদাকে হামলার জন্য দায়ী করেন এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ঘোষণা দেন।

সেই ভাষণে বুশ বিশ্বকে কার্যত দুটি পক্ষের মধ্যে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্য ছিল, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে যারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে থাকবে না, তারা সন্ত্রাসীদের পক্ষেই অবস্থান নেবে। এর মধ্য দিয়ে ‘ওয়ার অন টেরর’ শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান নয়, বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম প্রধান নীতিতে পরিণত হয়।

নাইন ইলেভেনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর, ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। তৎকালীন তালেবান সরকার আফগানিস্তানে অবস্থানরত ওসামা বিন লাদেনকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিতে অস্বীকৃতি জানালে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। আল-কায়েদার ঘাঁটি ধ্বংস এবং সংগঠনটির নেতৃত্বকে নিষ্ক্রিয় করাই ছিল অভিযানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

আফগানিস্তানের পর ২০০৩ সালে ইরাকে সামরিক আগ্রাসন চালায় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোট। যদিও ইরাকের সঙ্গে নাইন ইলেভেনের সরাসরি যোগসূত্রের প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তবুও তৎকালীন মার্কিন প্রশাসন সন্ত্রাসবাদ, গণবিধ্বংসী অস্ত্র এবং নিরাপত্তার যুক্তিতে ইরাকে সামরিক অভিযান পরিচালনা করে। পরবর্তী সময়ে ইরাকে গণবিধ্বংসী অস্ত্রের অস্তিত্ব নিয়ে মার্কিন দাবিগুলো ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়।

এসব সামরিক অভিযানের প্রভাব মুসলিম বিশ্বে ছিল গভীর। আফগানিস্তান ও ইরাকে যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের মার্কিন নীতি এবং ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতসহ বিভিন্ন ইস্যুতে মুসলিম দেশগুলোর বড় একটি অংশের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী মনোভাব আগে থেকেই ছিল। নাইন ইলেভেনের পর সেই মনোভাব আরও তীব্র হয়।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও পরিস্থিতি বদলে যায়। মুসলিমদের প্রতি সন্দেহ ও ইসলামবিদ্বেষী আচরণ বেড়ে যায়। হামলার পরপরই বিভিন্ন স্থানে মুসলিম ও আরব বংশোদ্ভূত মানুষের ওপর হামলা, হয়রানি এবং বৈষম্যের ঘটনা সামনে আসে। অনেক ক্ষেত্রে শুধু ধর্মীয় পরিচয় বা পোশাকের কারণে মানুষকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়।

মার্কিন তদন্তকারী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, নাইন ইলেভেনের আগে যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামবিদ্বেষী ঘৃণাজনিত অপরাধের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম ছিল। ২০০০ সালে এমন অপরাধের সংখ্যা ছিল কয়েক ডজন। কিন্তু ২০০১ সালে তা কয়েক শতে পৌঁছে যায়। ওই বছরের অধিকাংশ ঘটনাই ঘটেছিল ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর।

নাইন ইলেভেনের পর যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম জনগোষ্ঠীকে একদিকে সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে নিজেদের কোনো সম্পর্ক নেই—এ কথা বারবার পরিষ্কার করতে হয়েছে, অন্যদিকে তাদের নিজেদের নিরাপত্তা ও সামাজিক অবস্থান নিয়েও নতুন উদ্বেগের মুখোমুখি হতে হয়েছে। মুসলিম পরিচয় অনেক ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদের আলোচনার সঙ্গে অন্যায্যভাবে জড়িয়ে পড়তে থাকে।

তবে মার্কিন প্রশাসন বারবার দাবি করেছে, তাদের যুদ্ধ কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে নয়। প্রেসিডেন্ট বুশও একাধিকবার ইসলামকে শান্তির ধর্ম হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের লড়াই ইসলাম বা মুসলিমদের বিরুদ্ধে নয়, বরং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে। কিন্তু আফগানিস্তান ও ইরাকের যুদ্ধ, বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি এবং দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতির কারণে মুসলিম বিশ্বের অনেক মানুষের কাছে এই বক্তব্য বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়।

নাইন ইলেভেনের আরেকটি বড় প্রভাব ছিল বৈশ্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থায়। বিমানবন্দর নিরাপত্তা, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, গোয়েন্দা নজরদারি এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইন ব্যাপকভাবে কঠোর করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান ও সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা বাড়ে।

এর দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক প্রভাবও ছিল ব্যাপক। সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার নামে পরিচালিত সামরিক অভিযান, ড্রোন হামলা, বন্দিশিবির, জিজ্ঞাসাবাদ পদ্ধতি এবং নাগরিকদের ওপর নজরদারি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এসব কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে আসছে।

নাইন ইলেভেনের পরবর্তী দুই দশকে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিও নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। আফগানিস্তানে দুই দশকের যুদ্ধ শেষে ২০২১ সালে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার করে নেয়। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘতম মার্কিন সামরিক অভিযানের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। তবে যুদ্ধের মানবিক ও রাজনৈতিক ক্ষত এখনো বহন করছে আফগানিস্তান।

আজ ১১ সেপ্টেম্বর এলেই যুক্তরাষ্ট্রে সেই হামলায় নিহতদের স্মরণ করা হয়। নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন ও পেনসিলভানিয়ায় স্মরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। নিহতদের স্বজনদের কাছে দিনটি এখনো গভীর বেদনার। হাজার হাজার পরিবার সেই দিনের পর প্রিয়জন হারানোর যে শূন্যতার মধ্যে পড়েছিল, তা সময় পেরিয়েও পুরোপুরি মুছে যায়নি।

নাইন ইলেভেনের ২৫ বছর পরও বিশ্বজুড়ে এর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার প্রয়োজনীয়তা যেমন অস্বীকার করার সুযোগ নেই, তেমনি কোনো ধর্ম বা জনগোষ্ঠীকে সামগ্রিকভাবে সন্দেহের চোখে দেখা যে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে, সেটিও স্পষ্ট। ইতিহাসের এই ভয়াবহ অধ্যায় তাই শুধু একটি সন্ত্রাসী হামলার স্মৃতি নয়; বরং নিরাপত্তা, যুদ্ধ, মানবাধিকার, ধর্মীয় সহাবস্থান এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশ্বকে দীর্ঘদিন ধরে ভাবতে বাধ্য করা একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত