মূলধনী যন্ত্র আমদানি কমেছে, থমকে বিনিয়োগ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৬ বার
মূলধনী যন্ত্র আমদানি কমেছে, থমকে বিনিয়োগ

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের শিল্প খাতে নতুন বিনিয়োগের গতি নিয়ে আবারও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে শিল্পের মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি প্রায় ৩৩ শতাংশ কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাইয়ে ৩০ কোটি ৭৫ লাখ ডলারের মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৪৫ কোটি ৫৯ লাখ ডলার। ফলে এক বছরের ব্যবধানে এ খাতে আমদানি কমেছে ৩২ দশমিক ৬০ শতাংশ।

অর্থনীতির জন্য মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়। কারণ উদ্যোক্তারা সাধারণত নতুন কারখানা স্থাপন, বিদ্যমান শিল্পের সম্প্রসারণ কিংবা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য বিদেশ থেকে বিভিন্ন ধরনের মেশিনারি ও মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি করেন। ফলে এ ধরনের পণ্যের আমদানি বাড়লে শিল্প বিনিয়োগ ও উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হয়। বিপরীতে আমদানি কমে গেলে নতুন বিনিয়োগের গতি মন্থর হওয়ার একটি ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, উচ্চ সুদহার, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির শ্লথগতি, ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন। এর সঙ্গে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প কমে যাওয়ায় বড় প্রকল্পনির্ভর মূলধনী যন্ত্রপাতির চাহিদাও কমেছে। ফলে ব্যবসায়ীরা নতুন কারখানা স্থাপন বা বড় পরিসরে সম্প্রসারণের বদলে বিদ্যমান ব্যবসা সচল রাখাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির সঙ্গে দেশের বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। একজন উদ্যোক্তা যখন নতুন মেশিনারি আমদানি করেন, তখন সাধারণত তার পেছনে থাকে নতুন কারখানা স্থাপন, উৎপাদন লাইন সম্প্রসারণ অথবা বিদ্যমান কারখানার আধুনিকায়নের পরিকল্পনা। এর ফলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, উৎপাদন বাড়ে এবং মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়। তাই দীর্ঘ সময় ধরে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কম থাকলে এর প্রভাব ভবিষ্যতে অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে পড়তে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা মনে করছেন, বর্তমান আমদানি প্রবৃদ্ধির বড় অংশ জ্বালানিনির্ভর। ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ ভালো না থাকায় নতুন বিনিয়োগে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ কমেছে। ফলে মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। অর্থনীতির স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে শিল্প বিনিয়োগ বাড়লে মূলধনী যন্ত্রপাতির চাহিদাও বাড়ার কথা। কিন্তু বর্তমানে নতুন বিনিয়োগের বদলে বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখার প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে।

বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শেখ মাসাদুল ইসলাম বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের সমস্যা সমাধান না হলে নতুন শিল্পে বিনিয়োগের সম্ভাবনা কম। কারণ পর্যাপ্ত ইউটিলিটি সুবিধা ছাড়া কোনো শিল্পকারখানা কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। উদ্যোক্তাদের সামনে যদি আগামী কয়েক বছরেও গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার বিষয়ে অনিশ্চয়তা থাকে, তাহলে তারা নতুন করে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে মেশিনারি আমদানি করে কারখানা স্থাপনের ঝুঁকি নিতে চাইবেন না।

শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংকঋণের পরিস্থিতিও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। উচ্চ সুদের কারণে নতুন ঋণ নেওয়ার ব্যয় বেড়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের নানা সংকট ও কিছু প্রতিষ্ঠানের তারল্য সমস্যার কারণে অনেক উদ্যোক্তার জন্য ঋণপ্রাপ্তি কঠিন হয়ে উঠেছে। ব্যবসায়ীরা যখন উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে নতুন বিনিয়োগের সম্ভাব্য লাভ-ক্ষতির হিসাব করেন, তখন অনিশ্চিত ব্যবসায়িক পরিবেশে বড় বিনিয়োগ থেকে সরে আসার প্রবণতা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

শেখ মাসাদুল ইসলাম আরও বলেন, ব্যাংকিং খাতের সমস্যার পাশাপাশি দেশে ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগও উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করছে। ব্যবসায়ীরা যখন বিনিয়োগের বদলে ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করছেন, তখন শিল্প খাতে নতুন বিনিয়োগের গতি বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে দেশের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পরিবর্তে অনেক উদ্যোক্তা বিদ্যমান ব্যবসা চালু রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।

সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প কমে যাওয়াও মূলধনী যন্ত্রপাতির বাজারে প্রভাব ফেলেছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্প বড় ধরনের বিনিয়োগের উৎস হিসেবে কাজ করেছে। এসব প্রকল্পের সঙ্গে নির্মাণ, প্রকৌশল, বিদ্যুৎ, ইস্পাত, সিমেন্টসহ বিভিন্ন শিল্পের চাহিদা যুক্ত থাকে। একই সঙ্গে বড় প্রকল্পের জন্য বিপুল পরিমাণ যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম আমদানি করতে হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আগের অনেক প্রকল্প বন্ধ বা স্থগিত হওয়ার পাশাপাশি নতুন প্রকল্পের কাজও তুলনামূলক কম হওয়ায় মূলধনী পণ্যের চাহিদায় চাপ পড়েছে।

শুধু শিল্পের মূলধনী যন্ত্রপাতিই নয়, অন্যান্য মূলধনী পণ্য আমদানিতেও পতন দেখা গেছে। জুলাইয়ে অন্যান্য মূলধনী পণ্য আমদানি কমেছে প্রায় ২৪ শতাংশ। সব মিলিয়ে মাসটিতে মূলধনী পণ্য আমদানি কমেছে ২৭ দশমিক ২০ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

তবে একই সময়ে মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানি বেড়েছে। জুলাইয়ে মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানি ১৭ দশমিক ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের আমদানি বেড়েছে ৮৩ দশমিক ৩০ শতাংশ। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি ব্যয়ও বেড়েছে। তবে মূল্য বাড়লেও প্রকৃত পরিমাণের দিক থেকে জ্বালানি আমদানি একই হারে বাড়েনি। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবেই আমদানি ব্যয়ের বড় অংশ বেড়েছে।

তৈরি পোশাক খাতের কাঁচামাল আমদানিতেও সামান্য পতন দেখা গেছে। জুলাইয়ে এ ধরনের পণ্যের আমদানি ১ দশমিক ৪০ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে অন্যান্য মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানি প্রায় ৫ দশমিক ২০ শতাংশ বেড়েছে। এতে বোঝা যায়, বিদ্যমান শিল্প ও উৎপাদন কার্যক্রম পুরোপুরি থেমে না গেলেও নতুন শিল্প স্থাপন ও বড় ধরনের সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ তুলনামূলকভাবে কম।

খাদ্য ও ভোগ্যপণ্যের আমদানির চিত্র অবশ্য ভিন্ন। জুলাইয়ে চাল আমদানি ব্যাপকভাবে কমলেও গম আমদানি বেড়েছে। সব মিলিয়ে খাদ্যশস্যের আমদানি ১৫ দশমিক ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে ভোগ্যপণ্যের আমদানি বেড়েছে প্রায় ২৪ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের আমদানি কাঠামোয় শিল্প বিনিয়োগের সঙ্গে সম্পর্কিত পণ্যের তুলনায় খাদ্য, জ্বালানি ও ভোগ্যপণ্যের মতো প্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা বেশি সক্রিয় রয়েছে।

বেসরকারি খাতের ঋণ পরিস্থিতিও বিনিয়োগের দুর্বলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হয়ে উঠেছে। গত জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন পর্যায়ের একটি। টানা কয়েক মাস ধরে ঋণ প্রবৃদ্ধি এক অঙ্কের ঘরে রয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টের পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বিনিয়োগ স্থবিরতার প্রভাবে নতুন ঋণের চাহিদা কমেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

নতুন শিল্প স্থাপন বা বড় ধরনের সম্প্রসারণ না হলে মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে না। এ কারণে বিনিয়োগ ও ঋণ প্রবাহের মধ্যে তৈরি হওয়া স্থবিরতা ভাঙা এখন অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। শিল্প উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে ফিরতে না পারলে ভবিষ্যতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির গতিও ধীর হয়ে যেতে পারে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় বন্ধ কারখানা সচল করা, কৃষি উৎপাদন বাড়ানো এবং চলতি মূলধনের ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো নিজস্ব তহবিল থেকে বিতরণ করবে এবং ১৯ হাজার কোটি টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংক পুনঃঅর্থায়নের মাধ্যমে দেবে। উভয় ক্ষেত্রেই সরকার ৬ শতাংশ সুদ ভর্তুকি দেওয়ার কথা জানিয়েছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়বে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এর মধ্যেই দেশের বাণিজ্য ঘাটতিও বেড়েছে। রপ্তানি আয় কমে যাওয়া এবং আমদানি ব্যয় বাড়ার কারণে চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২০৮ কোটি ৮০ লাখ ডলারে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ ঘাটতি ছিল ১৫০ কোটি ৯০ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ৩৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ।

সব মিলিয়ে অর্থনীতির সামনে এখন বড় প্রশ্ন হলো—কীভাবে নতুন বিনিয়োগের পরিবেশ ফিরিয়ে আনা যায়। শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য নির্ভরযোগ্য গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ, সহজ ও সাশ্রয়ী ঋণ, ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হতে পারে।

কারণ মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি কেবল একটি আমদানি পরিসংখ্যান নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের ভবিষ্যৎ শিল্পায়ন, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রশ্ন। উদ্যোক্তারা যদি নতুন কারখানা স্থাপন ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর বদলে বিনিয়োগ স্থগিত রাখেন, তাহলে তার প্রভাব আজকের বাজারের পাশাপাশি আগামী দিনের অর্থনীতিতেও পড়তে পারে। তাই বিনিয়োগের আস্থা ফিরিয়ে এনে শিল্প খাতকে আবার সম্প্রসারণের পথে ফেরানো এখন অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত