নিজে আমল না করে উপদেশের ভয়াবহ পরিণতি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৪ বার
নিজে আমল না করে উপদেশের ভয়াবহ পরিণতি

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মানুষের জীবনে ভালো কাজের গুরুত্ব বোঝানো, অন্যকে সৎ পথে চলার পরামর্শ দেওয়া এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। তবে শুধু অন্যকে নসিহত করাই যথেষ্ট নয়; সেই নসিহতের প্রভাব নিজের জীবনেও থাকা জরুরি। একজন মানুষ অন্যকে নামাজ পড়তে বলছেন, সত্য কথা বলতে বলছেন, হারাম থেকে দূরে থাকার উপদেশ দিচ্ছেন, অথচ নিজেই যদি এসব বিষয়ে উদাসীন থাকেন, তাহলে তার সেই দ্বিমুখী আচরণ ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। এ বিষয়ে হাদিসে অত্যন্ত কঠিন সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।

বিশিষ্ট সাহাবি হজরত উসামাহ ইবনু জায়েদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছেন, কিয়ামতের দিন এক ব্যক্তিকে উপস্থিত করা হবে এবং তাকে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করা হবে। আগুনের তীব্রতায় তার নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে যাবে। এরপর সে জাহান্নামের মধ্যে এমনভাবে ঘুরতে থাকবে, যেমন গাধা চরকার চারপাশে ঘুরতে থাকে।

জাহান্নামের অন্যান্য অধিবাসীরা তার চারপাশে সমবেত হয়ে তাকে প্রশ্ন করবে, ‘হে অমুক! তোমার কী হয়েছে? তুমি তো আমাদের সৎকাজের নির্দেশ দিতে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করতে।’ তখন সে জবাব দেবে, ‘আমি তোমাদের সৎকাজের নির্দেশ দিতাম, কিন্তু নিজে তা করতাম না। আবার তোমাদের অসৎকাজ থেকে নিষেধ করতাম, অথচ নিজেই তা করতাম।’ এই হাদিস সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে।

হাদিসটির শিক্ষা মানুষের আত্মশুদ্ধির জন্য অত্যন্ত গভীর। কারণ এখানে কেবল অন্যকে ভালো কথা বলার বিষয়টি নয়, বরং নিজের কথা ও কাজের মধ্যে সামঞ্জস্য রাখার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। একজন ব্যক্তি মানুষের সামনে নিজেকে নেককার, ধার্মিক কিংবা সৎ হিসেবে উপস্থাপন করলেও তার ব্যক্তিগত জীবন যদি সেই বক্তব্যের সম্পূর্ণ বিপরীত হয়, তাহলে সেই বৈপরীত্য তার জন্য বিপদের কারণ হতে পারে।

ইসলামে ভালো কাজের প্রতি মানুষকে উৎসাহিত করা এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কিন্তু এই দায়িত্ব পালনের অর্থ এমন নয় যে, কেউ নিজের আমল সংশোধনের প্রয়োজন অনুভব করবে না। বরং অন্যকে যে ভালো কাজের দিকে আহ্বান করা হচ্ছে, নিজের জীবনেও সেটি বাস্তবায়নের চেষ্টা থাকা প্রয়োজন। মুখের কথার সঙ্গে কাজের মিল থাকলে নসিহতের প্রভাবও মানুষের ওপর বেশি পড়ে। বিপরীতে, একজনের আচরণ যদি তার নিজের বক্তব্যকে মিথ্যা প্রমাণ করে, তাহলে তার উপদেশ মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়।

দৈনন্দিন জীবনে এর নানা উদাহরণ দেখা যায়। কেউ সন্তানকে নামাজের গুরুত্ব বোঝাচ্ছেন, কিন্তু নিজে নিয়মিত নামাজ আদায় করছেন না। কেউ অন্যকে মিথ্যা বলা থেকে বিরত থাকতে বলছেন, অথচ নিজের প্রয়োজনেই মিথ্যার আশ্রয় নিচ্ছেন। কেউ হারাম উপার্জন থেকে দূরে থাকার কথা বলছেন, কিন্তু নিজের আয়ের ক্ষেত্রে হালাল-হারামের সীমারেখা উপেক্ষা করছেন। আবার কেউ মানুষের অধিকার রক্ষা ও আমানতদারিতার কথা বললেও নিজের দায়িত্ব পালনে অবহেলা করছেন। এ ধরনের দ্বিমুখী আচরণ শুধু নৈতিক দুর্বলতাই নয়, বরং একজন মানুষের আখিরাতের জন্যও মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

তবে এই হাদিসের শিক্ষা এমন নয় যে, কোনো ব্যক্তি নিজের কোনো দুর্বলতা থাকলে অন্যকে ভালো কাজের কথা বলতে পারবেন না। মানুষের প্রত্যেকেরই কমবেশি দুর্বলতা রয়েছে এবং প্রত্যেকেরই সংশোধনের প্রয়োজন আছে। কোনো ব্যক্তি নিজে কোনো ভালো কাজ পুরোপুরি করতে না পারলেও সেই কাজের গুরুত্ব অন্যকে বোঝানোর পাশাপাশি নিজের জীবন সংশোধনের চেষ্টা করতে পারেন। বরং নিজের ঘাটতি উপলব্ধি করে অন্যকে নসিহত করা এবং একই সঙ্গে নিজেকে সংশোধনের পথে এগিয়ে নেওয়া প্রশংসনীয় প্রচেষ্টা। বিপদের বিষয় হলো, কেউ যদি জেনেশুনে অন্যকে এমন কোনো কাজের উপদেশ দেন যা তিনি নিজে পালন করার কোনো চেষ্টা করেন না এবং নিজের জন্য এক ধরনের নীতি ও অন্যের জন্য আরেক ধরনের নীতি গ্রহণ করেন।

এই কারণে একজন মুমিনের জন্য আত্মসমালোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যকে উপদেশ দেওয়ার আগে নিজেকে প্রশ্ন করা প্রয়োজন—আমি যে কথাটি বলছি, সেটি কি আমার নিজের জীবনেও প্রতিফলিত হচ্ছে? আমি কি নিজেই সেই আদর্শ অনুসরণ করার চেষ্টা করছি? আমার প্রকাশ্য জীবন ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে কি বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে? এ ধরনের প্রশ্ন মানুষকে নিজের ভুল ও দুর্বলতা বুঝতে সাহায্য করে।

দ্বীনি জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। শুধু ধর্মীয় জ্ঞান জানা কিংবা অনেক ভালো কথা মুখস্থ করাই একজন মানুষের সাফল্যের প্রমাণ নয়। সেই জ্ঞান অনুযায়ী নিজের জীবন পরিচালনার চেষ্টা করাও জরুরি। কারণ জ্ঞান মানুষের দায়িত্ব বাড়িয়ে দেয়। যে ব্যক্তি কোনো বিষয় সম্পর্কে জানেন, তার ওপর সেই জ্ঞানের আলোকে আমল করার দায়িত্বও তৈরি হয়। তাই জ্ঞান যখন বাস্তব জীবনে প্রতিফলিত হয় না, তখন সেই জ্ঞান মানুষের জন্য কল্যাণের পাশাপাশি জবাবদিহির বিষয়ও হয়ে দাঁড়াতে পারে।

মানুষের সামনে ভালো হওয়ার চেষ্টা কিন্তু গোপনে ভিন্ন জীবনযাপন করাও ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত বিপজ্জনক। প্রকৃত আত্মশুদ্ধির লক্ষ্য হলো মানুষের প্রশংসা অর্জন করা নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য নিজের প্রকাশ্য ও গোপন জীবনকে সংশোধন করা। মানুষের চোখের আড়ালে কেউ কী করছেন, সেটিও আল্লাহর অজানা নয়। ফলে লোক দেখানো ধার্মিকতা বা নৈতিকতার চেয়ে আন্তরিক আত্মসংশোধনের গুরুত্ব অনেক বেশি।

হাদিসের এই সতর্কবার্তা পরিবার, সমাজ ও কর্মক্ষেত্র—সব ক্ষেত্রেই প্রাসঙ্গিক। বাবা-মা সন্তানকে যে মূল্যবোধ শেখান, তা নিজেদের আচরণে প্রকাশ পেলে সন্তানও সহজে তা গ্রহণ করে। শিক্ষক নিজে দায়িত্বশীল হলে তার শিক্ষার্থীরাও অনুপ্রাণিত হয়। সমাজের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তির নিজের জীবন যদি নীতি ও আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহলে তার বক্তব্য মানুষের ওপর বেশি প্রভাব ফেলে। অর্থাৎ নসিহতের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম অনেক সময় মুখের কথা নয়, বরং নিজের চরিত্র ও আচরণ।

একজন মানুষ যদি নিজের কোনো দুর্বলতা বুঝতে পারেন, তাহলে হতাশ হওয়ার কারণ নেই। বরং সেই দুর্বলতাকে স্বীকার করে ধীরে ধীরে নিজেকে সংশোধনের পথে এগিয়ে নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ। অন্যকে ভালো কাজের আহ্বান জানানোর পাশাপাশি নিজের জন্যও সেই আহ্বান প্রযোজ্য—এই উপলব্ধি থাকা দরকার। কারণ একজন মুমিনের জীবনে নসিহত শুধু অন্যের জন্য নয়, নিজের জন্যও।

হাদিসটি তাই মানুষের সামনে একটি গভীর আত্মজিজ্ঞাসার দরজা খুলে দেয়। আমরা অন্যকে কী বলছি, তার পাশাপাশি নিজেদের জীবনেও সেই কথার কতটা বাস্তবায়ন করছি—সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। ভালো কাজের নির্দেশ দেওয়া অবশ্যই মহৎ দায়িত্ব, কিন্তু সেই দায়িত্ব যেন নিজের আমল থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়। সত্যিকারের নসিহত তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তা মানুষের মুখের কথার পাশাপাশি তার চরিত্র, আচরণ ও দৈনন্দিন জীবনে প্রতিফলিত হয়।

নিজে আমল না করে অন্যকে উপদেশ দেওয়ার বিষয়ে হাদিসের এই সতর্কতা তাই প্রত্যেক মুসলমানের জন্য আত্মশুদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। অন্যকে সংশোধনের আগে নিজের দিকে তাকানো, নিজের ভুল স্বীকার করা, নিজের আমল ঠিক করার চেষ্টা করা এবং কথা ও কাজের মধ্যে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা করা—এসবই একজন মুমিনের জীবনে নৈতিক সৌন্দর্য ও আল্লাহভীতির পরিচয়। নসিহত শুধু উচ্চারণের বিষয় নয়; বরং তা নিজের জীবনেও ধারণ করার একটি অঙ্গীকার।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত