প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র ও সাবেক যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের ‘প্রাথমিক সত্যতা’ পাওয়ার বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) জনসংযোগ কর্মকর্তা ও উপপরিচালক আখতারুল ইসলামের দেওয়া বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে। প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া ওই বক্তব্যের ফলে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে জনমনে নেতিবাচক ধারণা তৈরি এবং গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে—এমন দাবি করে বক্তব্যটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়েছে।
আসিফ মাহমুদের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম জনি বৃহস্পতিবার এ আইনি নোটিশ পাঠান। নোটিশে বলা হয়েছে, প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলনে কোনো ধরনের তদন্তের পূর্ণাঙ্গ ফলাফল বা সুনির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন না করেই একজন রাজনৈতিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের ‘প্রাথমিক সত্যতা’ পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর ফলে বিষয়টি বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিকমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং আসিফ মাহমুদকে ঘিরে জনপরিসরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়।
ঘটনার সূত্রপাত গত ২ সেপ্টেম্বর। ওই দিন এক সংবাদ সম্মেলনে দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা ও উপপরিচালক আখতারুল ইসলাম আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে বদলি, নিয়োগ ও পদোন্নতি-সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগের ‘প্রাথমিক সত্যতা’ পাওয়ার কথা জানান। তার বক্তব্য প্রকাশের পর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে প্রচারিত হয়। সামাজিকমাধ্যমেও এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
আইনি নোটিশে দাবি করা হয়েছে, দুদকের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্য সাধারণ মানুষের কাছে স্বাভাবিকভাবেই একটি আনুষ্ঠানিক ও নির্ভরযোগ্য বক্তব্য হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কথা। ফলে বক্তব্যটি প্রকাশের পর আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়টি জনপরিসরে এমনভাবে উপস্থাপিত হয়, যেন তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের সত্যতা ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অথচ নোটিশে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট বক্তব্যের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন বা সুনির্দিষ্ট প্রমাণের বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়নি।
পরবর্তী সময়ে সাংবাদিকদের জন্য দুদক বিটের একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে আখতারুল ইসলাম তার দেওয়া বক্তব্যকে ভুলবশত দেওয়া হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে ‘প্রাথমিক সত্যতা’ কথাটি বাদ দেওয়ার জন্য সাংবাদিকদের অনুরোধ করা হয় বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার কিংবা সংশোধনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি—এমন অভিযোগও করা হয়েছে আইনি নোটিশে।
নোটিশদাতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রকাশ্য বক্তব্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার না হওয়ায় এর ভিত্তিতে প্রকাশিত সংবাদ ও জনমনে তৈরি হওয়া নেতিবাচক ধারণা বহাল রয়েছে। এ অবস্থায় শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে কোনো অনানুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেওয়া যথেষ্ট নয় বলেও আইনি নোটিশে দাবি করা হয়েছে। বরং জনসমক্ষে দেওয়া বক্তব্যের ক্ষেত্রে একইভাবে প্রকাশ্য ও স্পষ্টভাবে সংশোধন বা প্রত্যাহারের প্রয়োজন রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইনি নোটিশে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের কিছু তথ্যগত অসঙ্গতির কথাও তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাদের চলতি দায়িত্ব বাতিলের বিষয়টি অন্যতম। অভিযোগের বর্ণনায় ৩৮ জন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব বাতিলের কথা বলা হলেও নোটিশে দাবি করা হয়েছে, প্রকৃতপক্ষে ১১২ জন কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব বাতিল করা হয়েছিল।
নোটিশে আরও বলা হয়েছে, প্রশাসনিক আপিল ট্রাইব্যুনালের একটি আদেশ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কর্মকর্তাদের চলতি দায়িত্ব বাতিলের সিদ্ধান্ত কার্যকর করে। ফলে এ ঘটনাকে কেবল একজন ব্যক্তির সিদ্ধান্ত বা উদ্যোগ হিসেবে উপস্থাপন করা তথ্যগতভাবে বিভ্রান্তিকর হতে পারে বলে নোটিশে দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া ১৫০ জন সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাকে উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে পদোন্নতির ঘটনাতেও আসিফ মাহমুদের সম্পৃক্ততার অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে, আসিফ মাহমুদ যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ করেন ১০ ডিসেম্বর ২০২৫। অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট পদোন্নতির ঘটনা ঘটে ১১ মে ২০২৬।
অর্থাৎ নোটিশে উল্লিখিত তথ্য অনুযায়ী, যে পদোন্নতির ঘটনাকে কেন্দ্র করে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়েছে, সেটি তার উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগের প্রায় পাঁচ মাস পর ঘটে। একই সঙ্গে ওই সময়ের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রেক্ষাপটও নোটিশে তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট পদোন্নতির ঘটনা বিএনপি সরকার গঠনের তিন মাসের মাথায় ঘটে। ফলে ওই পদোন্নতির জন্য সাবেক উপদেষ্টাকে দায়ী করার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি দ্রুত জনআলোচনায় চলে আসা স্বাভাবিক। বিশেষ করে দুদকের মতো একটি সাংবিধানিক ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তার বক্তব্য হলে সেটির গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। এ কারণে তদন্তাধীন বা যাচাই-প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকা কোনো অভিযোগ প্রকাশের ক্ষেত্রে তথ্যের নির্ভুলতা, বক্তব্যের প্রেক্ষাপট এবং অভিযোগের আইনি অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আইনি নোটিশে মূলত এই জায়গাটিতেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, কোনো অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত বা অনুসন্ধানের নির্দিষ্ট পর্যায় এবং তার ফলাফল সম্পর্কে বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই ও প্রমাণের প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে কোনো ব্যক্তির সামাজিক ও রাজনৈতিক ভাবমূর্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অভিযোগ হলে দায়িত্বশীল বক্তব্যের গুরুত্ব আরও বেশি।
নোটিশে আখতারুল ইসলামকে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তার বক্তব্য ১৫ দিনের মধ্যে একইভাবে নিঃশর্তভাবে প্রত্যাহার করার আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে যথাযথভাবে যাচাই করা এবং প্রমাণসমর্থিত তথ্য ছাড়া কোনো বক্তব্য প্রদান থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বক্তব্য প্রত্যাহার বা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া না হলে তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও নোটিশে সতর্ক করা হয়েছে। এর মধ্যে দণ্ডবিধির ৫০০ ধারাসহ প্রযোজ্য আইনি বিধানের আওতায় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে, ঘটনাটি এমন সময়ে সামনে এসেছে যখন রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে জনপরিসরে আলোচনা তীব্র। কোনো অভিযোগ সত্য হলে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে তা প্রতিষ্ঠিত করা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি অভিযোগের বিষয়ে যথাযথ তথ্য-প্রমাণ ছাড়া জনমনে কোনো ব্যক্তিকে দোষী হিসেবে প্রতিষ্ঠা না করাও ন্যায়বিচারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আসিফ মাহমুদের পক্ষ থেকে পাঠানো আইনি নোটিশের মাধ্যমে মূলত প্রকাশ্য বক্তব্যের আনুষ্ঠানিক প্রত্যাহার ও তথ্যগত সংশোধনের দাবি সামনে এসেছে। এখন সংশ্লিষ্ট দুদক কর্মকর্তা কী পদক্ষেপ নেন এবং বিষয়টি পরবর্তী সময়ে কোন আইনি বা প্রশাসনিক পর্যায়ে গড়ায়, সেটিই দেখার বিষয়।
তবে এ ঘটনার মধ্য দিয়ে একটি বিষয় আবারও সামনে এসেছে—কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপনের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা ও তথ্যের নির্ভুলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ তদন্তের মাধ্যমে সত্য প্রমাণিত হলে আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। একইভাবে অভিযোগের তথ্য ভুল বা অসঙ্গতিপূর্ণ হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভাবমূর্তি রক্ষায় দ্রুত ও প্রকাশ্য সংশোধনও প্রয়োজন। রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে স্পর্শকাতর এমন ঘটনায় দায়িত্বশীল বক্তব্য এবং যাচাই করা তথ্যই জনআস্থার ভিত্তি শক্তিশালী করতে পারে।