ইউনিয়ন পর্যায়ের ক্ষুদ্র ব্যবসায় ভ্যাটের পরিকল্পনা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৬ বার
ইউনিয়ন পর্যায়ের ক্ষুদ্র ব্যবসায় ভ্যাটের পরিকল্পনা

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ভ্যাটের আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইউনিয়ন পর্যায়ের দোকান ও ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য মাসে ৫০০ টাকা, উপজেলা পর্যায়ে ১ হাজার টাকা এবং জেলা সদর ও জেলা পৌর শহর এলাকায় ২ হাজার টাকা হারে নির্ধারিত ভ্যাট আরোপ করা হতে পারে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ছোট ব্যবসায়ীদেরও প্রথমবারের মতো নির্দিষ্ট হারে নিয়মিত ভ্যাট পরিশোধের কাঠামোর মধ্যে আনা হবে।

এনবিআরের সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, প্রান্তিক পর্যায়ের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে নির্ধারিত হারে ভ্যাট আদায়ের বিষয়টি এখনো পরিকল্পনার পর্যায়ে রয়েছে। কোন ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এই ব্যবস্থার আওতায় আসবে এবং কীভাবে ভ্যাট আদায় করা হবে, তা নিয়ে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের কাজ চলছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করেই পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা রয়েছে।

প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় ভ্যাট পরিশোধের প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের সরাসরি ভ্যাট অফিসে গিয়ে অর্থ জমা দেওয়ার পরিবর্তে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে নির্ধারিত অর্থ পরিশোধের সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে এ কাজের জন্য একটি আলাদা অ্যাপ চালুর বিষয়েও চিন্তাভাবনা করছে এনবিআর। এর ফলে প্রত্যন্ত এলাকার ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য ভ্যাট পরিশোধের প্রক্রিয়া তুলনামূলক সহজ ও প্রযুক্তিনির্ভর করার চেষ্টা থাকবে।

এনবিআর ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন উপজেলার বাজার, বিপণিবিতান ও দোকানের তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে। কোন এলাকায় কতটি দোকান রয়েছে, দোকানগুলোর ধরন কী, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অবস্থান কোথায় এবং ব্যবসার পরিধি কেমন—এসব তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। পরবর্তী ধাপে ইউনিয়ন পর্যায়ের বাজার ও দোকানগুলোর তথ্যও একইভাবে সংগ্রহ করা হবে। এসব তথ্য একত্র করে দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।

তথ্য সংগ্রহের এই উদ্যোগের মাধ্যমে মূলত ভ্যাটের আওতার বাইরে থাকা ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ও অবস্থান সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা পাওয়ার চেষ্টা করছে রাজস্ব কর্তৃপক্ষ। বিভিন্ন এলাকার বাজারের আকার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এবং ব্যবসার ধরন বিশ্লেষণ করে কোন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে নির্ধারিত ভ্যাটের আওতায় আনা হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

এনবিআরের সংগৃহীত তথ্যের একটি তালিকায় দেশের বিভিন্ন এলাকার বাজারের চিত্রও উঠে এসেছে। উদাহরণ হিসেবে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার একটি প্লাজায় ৫২টি দোকানের তথ্য পাওয়া গেছে, যার মধ্যে চারটি দোকানে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র রয়েছে। রংপুর নগরের একটি বাজারে ১২১টি দোকান এবং কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার একটি বাজারে ৫০টি দোকানের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। দেশের অন্যান্য বাজারেও একইভাবে দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা নির্ধারণের কাজ চলছে।

প্রাথমিকভাবে এনবিআর দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের প্রায় তিন থেকে পাঁচ লাখ ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে এই নির্ধারিত ভ্যাট ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে চূড়ান্ত সংখ্যা নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ে সংগৃহীত তথ্য এবং পরবর্তী যাচাই-বাছাইয়ের ওপর।

এনবিআরের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, উপজেলা পর্যায়ের বাজার, বিপণিবিতান ও দোকানের তালিকা ইতোমধ্যে ভ্যাট বিভাগের কর্মকর্তাদের কাছে আসতে শুরু করেছে। ইউনিয়ন পর্যায় থেকেও তথ্য সংগ্রহ চলছে। সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণের পর ভ্যাটের নির্ধারিত হার ও আওতাভুক্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ধরন চূড়ান্ত করা হবে।

প্রস্তাবিত উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলে দেশের ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য ভ্যাট ব্যবস্থায় একটি নতুন কাঠামো তৈরি হবে। এর সঙ্গে প্রায় এক দশক আগের প্যাকেজ ভ্যাট ব্যবস্থার কিছুটা মিল রয়েছে। তখন শহরাঞ্চলের ছোট ব্যবসায়ীদের লেনদেনের পরিমাণের পরিবর্তে নির্দিষ্ট হারে মাসিক ভ্যাট দিতে হতো। সেই ব্যবস্থা প্যাকেজ ভ্যাট নামে পরিচিত ছিল। ২০১৯ সালে নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর হওয়ার পর প্যাকেজ ভ্যাট ব্যবস্থা বাতিল করা হয়।

এবার এনবিআরের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ইউনিয়ন থেকে জেলা পর্যায়ের ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য আবারও নির্দিষ্ট অঙ্কের মাসিক ভ্যাটের ব্যবস্থা চালু হতে পারে। তবে নতুন ব্যবস্থার কাঠামো, আওতা ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি আগের প্যাকেজ ভ্যাটের সঙ্গে পুরোপুরি এক হবে কি না, সেটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পরই স্পষ্ট হবে।

বর্তমান ভ্যাট ব্যবস্থায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বার্ষিক বিক্রি বা লেনদেনের পরিমাণের ভিত্তিতে নিবন্ধনের বিষয়টি নির্ধারিত হয়। বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বার্ষিক বিক্রি বা লেনদেন ৫০ লাখ টাকার বেশি হলে ভ্যাট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট প্রযোজ্য। অন্যদিকে, বার্ষিক বিক্রি বা লেনদেন ৫০ লাখ টাকার নিচে থাকা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ভ্যাট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক নয়।

এই ব্যবস্থার বাইরে থাকা প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের রাজস্ব কাঠামোর আওতায় আনতেই নির্দিষ্ট হারে ভ্যাট আরোপের চিন্তা করছে এনবিআর। রাজস্ব আদায়ের পরিধি বাড়ানো এবং ভ্যাট ব্যবস্থায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

তবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন ভ্যাট কাঠামো চালু হলে এর বাস্তব প্রভাব নিয়েও আলোচনা তৈরি হতে পারে। ইউনিয়ন পর্যায়ের ছোট দোকান, স্থানীয় বাজারের ব্যবসায়ী কিংবা সীমিত পরিসরে পরিচালিত পারিবারিক ব্যবসার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মাসিক ভ্যাটের পরিমাণ তাদের ব্যবসার সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের অনেকের ব্যবসার পরিমাণ ও আয় বড় শহর বা জেলা সদরের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের তুলনায় অনেক কম। ফলে ভ্যাট কাঠামো নির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্যবসার ধরন ও সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন হতে পারে।

অন্যদিকে, ভ্যাট ব্যবস্থার আওতা বাড়ানোর ফলে দেশের অর্থনীতির একটি বড় অংশকে আনুষ্ঠানিক রাজস্ব কাঠামোর মধ্যে আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। ছোট ব্যবসাগুলোর তথ্যভান্ডার তৈরি হলে ভবিষ্যতে নীতিনির্ধারণ, বাজার বিশ্লেষণ এবং রাজস্ব পরিকল্পনাতেও তা কাজে লাগতে পারে। ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভ্যাট পরিশোধের ব্যবস্থা চালু হলে অর্থ জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের সময় ও যাতায়াতের খরচও কমতে পারে।

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এনবিআরের মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ভ্যাট খাত থেকে ২ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য রয়েছে। এই বড় রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি বর্তমানে আওতার বাইরে থাকা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদেরও রাজস্ব ব্যবস্থার মধ্যে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

এনবিআরের পরিকল্পনা এখনো চূড়ান্ত না হওয়ায় ইউনিয়ন পর্যায়ের সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর একই হারে ভ্যাট কার্যকর হবে কি না, কিংবা প্রস্তাবিত হার অপরিবর্তিত থাকবে কি না, তা নিশ্চিত নয়। মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পর্যালোচনার পর বিষয়টি চূড়ান্ত হওয়ার কথা রয়েছে।

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য তাই নতুন এই উদ্যোগ একদিকে যেমন রাজস্ব ব্যবস্থার পরিধি বাড়ানোর একটি পদক্ষেপ, অন্যদিকে তাদের ব্যবসায়িক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নীতি নির্ধারণেরও একটি পরীক্ষা। ভ্যাট আদায়ের প্রক্রিয়া সহজ, স্বচ্ছ ও ব্যবসাবান্ধব করা গেলে নতুন ব্যবস্থাটি বাস্তবায়নে সহযোগিতা বাড়তে পারে। আর ব্যবসার সক্ষমতা বিবেচনা না করে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হলে প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের ওপর তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। ফলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে রাজস্ব আদায়ের প্রয়োজনের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বাস্তব পরিস্থিতিকেও কতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত