প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সব ধরনের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়েছে আলজেরিয়া। আবুধাবির ধারাবাহিক ‘উসকানিমূলক ও বৈরী’ আচরণের অভিযোগ তুলে বৃহস্পতিবার এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে ঠিক কোন নির্দিষ্ট ঘটনার কারণে আলজেরিয়া এত বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সে বিষয়ে দেশটির পক্ষ থেকে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
দুই দেশের সম্পর্কের সাম্প্রতিক টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে আলজেরিয়ার এই ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে পশ্চিম সাহারা, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক, আফ্রিকার সাহেল অঞ্চল এবং আঞ্চলিক রাজনীতিতে দুই দেশের ভিন্ন অবস্থান দীর্ঘদিন ধরেই তাদের সম্পর্ককে জটিল করে তুলছিল। সর্বশেষ কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত সেই দূরত্বকে আরও প্রকাশ্য করে তুলেছে।
আলজেরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্মকাণ্ড এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা আর গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচনা করা সম্ভব হচ্ছে না। দেশটির অভিযোগ, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য যে পরিসর বা সুযোগ ছিল, আমিরাতের ধারাবাহিক কর্মকাণ্ডের কারণে তা কার্যত নষ্ট হয়ে গেছে।
আলজেরিয়ার সিদ্ধান্তের পর দেশটিতে নিযুক্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূতকে তলব করা হয়। তাকে সিদ্ধান্তের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে এবং তা কার্যকর করার জন্য ৪৮ ঘণ্টা সময় দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে আলজেরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
অন্যদিকে, আবুধাবি এ সিদ্ধান্তকে স্থায়ী বিচ্ছেদ হিসেবে দেখছে না। সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা আশা করছে আলজেরিয়ার নেওয়া পদক্ষেপটি সাময়িক হবে। একই সঙ্গে দুই দেশের সম্পর্ক এবং অভিন্ন স্বার্থ রক্ষার বিষয়ে আমিরাত প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
আমিরাতের পক্ষ থেকে দুই দেশের জনগণের মধ্যকার সম্পর্কের কথাও গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা আলজেরিয়ার জনগণকে সম্মান করে এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যে বিদ্যমান বন্ধন নিয়ে গর্বিত। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসবাসরত আলজেরীয় নাগরিক ও দেশটিতে যাতায়াতকারী আলজেরীয় পর্যটকদের মাধ্যমে দুই দেশের মানুষের মধ্যে সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার পাশাপাশি আলজেরিয়া আকাশসীমা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিবন্ধিত সামরিক ও বেসামরিক উড়োজাহাজের জন্য আলজেরিয়ার আকাশসীমা বন্ধ করে দেওয়া হবে। যদিও এ নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে একটি সাময়িক ছাড় রাখা হয়েছে। চলতি বছরের শেষ পর্যন্ত আলজিয়ার্সে যাতায়াতকারী আমিরাতের বাণিজ্যিক ফ্লাইটগুলো এ নিষেধাজ্ঞার আওতার বাইরে থাকবে।
আলজেরিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সম্পর্কের অবনতি অবশ্য হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন আঞ্চলিক ও রাজনৈতিক ইস্যুতে মতপার্থক্য ক্রমে গভীর হয়েছে। আলজেরিয়ার গণমাধ্যমেও বিভিন্ন সময়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের নীতির কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে। আবুধাবি উত্তর আফ্রিকা ও আশপাশের অঞ্চলে বিভেদ উসকে দেওয়ার চেষ্টা করছে—এমন অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে আলজেরিয়ার পক্ষ থেকে উঠে এসেছে।
দুই দেশের মতপার্থক্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক। আলজেরিয়া দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিরোধিতা করে আসছে। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। একই সময়ে আলজেরিয়ার আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী মরক্কোও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে। ফলে উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এ বিষয়টি আলজেরিয়া ও আমিরাতের অবস্থানের পার্থক্যকে আরও স্পষ্ট করেছে।
পশ্চিম সাহারা ইস্যুতেও দুই দেশের অবস্থান বিপরীত। কয়েক দশক ধরে চলা এই বিরোধে আলজেরিয়া পশ্চিম সাহারার স্বাধীনতার দাবিতে লড়াইরত পলিসারিও ফ্রন্টকে সমর্থন করে। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত পশ্চিম সাহারাকে মরক্কোর অংশ হিসেবে বিবেচনা করে এবং মরক্কোর অবস্থানকে সমর্থন করে আসছে। এমনকি ওই অঞ্চলে আমিরাতের একটি কনস্যুলেটও রয়েছে। ফলে উত্তর আফ্রিকার অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী এই বিরোধ দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে।
আফ্রিকার সাহেল অঞ্চল নিয়েও আলজেরিয়া ও আমিরাতের স্বার্থের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সংযুক্ত আরব আমিরাত সাহেল অঞ্চলের কয়েকটি দেশের সঙ্গে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়িয়েছে। অন্যদিকে একাধিক দেশে সামরিক অভ্যুত্থানের পর আলজেরিয়ার সঙ্গে তার দক্ষিণের কয়েকটি প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক জটিল হয়ে উঠেছে। এই পরিবর্তিত আঞ্চলিক বাস্তবতায় দুই দেশের কৌশলগত অবস্থানও ভিন্ন দিকে এগিয়েছে।
আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট আবদেলমাদজিদ তেবউন গত বছর উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে আলজেরিয়ার সম্পর্ক নিয়ে মন্তব্য করার সময় জানিয়েছিলেন, একটি দেশ ছাড়া অন্য সব উপসাগরীয় দেশের সঙ্গে তার দেশের সম্পর্ক অত্যন্ত ভালো। তিনি ওই দেশের নাম সরাসরি উল্লেখ না করলেও তার বক্তব্যের ইঙ্গিত সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিকে ছিল বলে ধারণা করা হয়।
তেবউন সৌদি আরব, কুয়েত, ওমান ও কাতারের সঙ্গে আলজেরিয়ার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছিলেন। একই সঙ্গে নাম না নেওয়া একটি উপসাগরীয় দেশের বিরুদ্ধে আলজেরিয়ার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ এবং অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করার অভিযোগও করেছিলেন। এর মধ্য দিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা অবিশ্বাসের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।
সম্পর্কের টানাপোড়েন শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আলজেরিয়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে ২০১৩ সালের মে মাসে আবুধাবিতে স্বাক্ষরিত বিমান চলাচল চুক্তি বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু করে। তখন থেকেই দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দেয়।
এখন কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণার মাধ্যমে সেই উত্তেজনা আরও গভীর পর্যায়ে পৌঁছেছে। যদিও আবুধাবি এটিকে সাময়িক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে এবং সম্পর্কের দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে ইঙ্গিত দিয়েছে, তবু আলজেরিয়ার পক্ষ থেকে রাষ্ট্রদূতকে তলব, ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা এবং আকাশসীমা ব্যবহারে বিধিনিষেধের মতো পদক্ষেপ পরিস্থিতির কঠোরতা স্পষ্ট করছে।
দুই দেশের এই বিরোধের প্রভাব কেবল কূটনৈতিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকবে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিমান চলাচল, ব্যবসা-বাণিজ্য, নাগরিকদের যাতায়াত এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। তবে বাণিজ্যিক বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে বছরের শেষ পর্যন্ত দেওয়া ছাড় থেকে বোঝা যায়, আলজেরিয়া তাৎক্ষণিকভাবে সব ধরনের যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ করার পরিবর্তে কিছু ক্ষেত্রে সীমিত বাস্তবিক সুবিধা বজায় রাখার সুযোগ রেখেছে।
আলজেরিয়ার সিদ্ধান্তের পর এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, দুই দেশের সম্পর্কের এই সংকট কতটা দীর্ঘস্থায়ী হয়। আবুধাবি যেহেতু সিদ্ধান্তটিকে সাময়িক হিসেবে দেখছে এবং অভিন্ন স্বার্থ রক্ষায় নিজেদের প্রতিশ্রুতির কথা জানিয়েছে, ভবিষ্যতে কূটনৈতিক যোগাযোগ পুনরায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে তার জন্য আঞ্চলিক বিভিন্ন ইস্যুতে দুই দেশের মতপার্থক্য কমানো এবং পারস্পরিক আস্থার জায়গা পুনর্গঠন করা প্রয়োজন হবে।
আলজেরিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাম্প্রতিক বিরোধ মূলত উত্তর আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও সাহেল অঞ্চলের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতিফলন। ইসরায়েল, পশ্চিম সাহারা, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক—এসব বিষয়ে দুই দেশের অবস্থান যত ভিন্ন হয়েছে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কেও ততটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে। বৃহস্পতিবারের সিদ্ধান্ত সেই দীর্ঘদিনের জমে থাকা উত্তেজনাকে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক বিচ্ছেদের পর্যায়ে নিয়ে গেল।
এখন পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়, তা নির্ভর করবে দুই দেশের পরবর্তী কূটনৈতিক পদক্ষেপ এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ভূমিকার ওপর। সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হলে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। আবার পারস্পরিক অভিযোগ ও আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও বাড়লে উত্তর আফ্রিকা ও উপসাগরীয় অঞ্চলের রাজনীতিতে এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে।