আগামী বছর উদ্বোধন হতে পারে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৭ বার
আগামী বছর উদ্বোধন হতে পারে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পদ্মা নদীর পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, মৎস্যসম্পদ উন্নয়ন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনাকে সামনে রেখে আলোচিত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে আরও এক ধাপ এগিয়েছে। পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহিদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানি জানিয়েছেন, প্রকল্পটি ইতোমধ্যে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদন পেয়েছে এবং আগামী বছরের যেকোনো সময় প্রধানমন্ত্রী এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন।

শুক্রবার দুপুরে রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার হাবাসপুর এলাকায় পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প পরিদর্শনে গিয়ে পানিসম্পদমন্ত্রী এসব কথা বলেন। প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনের সময় তিনি এর সম্ভাব্য প্রভাব, বাস্তবায়ন পরিকল্পনা এবং দেশের কৃষি ও অর্থনীতিতে এর ভূমিকা নিয়ে কথা বলেন। সরকারের পক্ষ থেকে প্রকল্পটিকে দীর্ঘমেয়াদি পানি ব্যবস্থাপনা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতির অংশ। প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী ইশতেহারে এ ধরনের বৃহৎ পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি ছিল। একনেকে অনুমোদনের পর এখন প্রকল্প বাস্তবায়নের পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে আগামী বছরের কোনো এক সময়ে প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্পের উদ্বোধন করবেন বলে তিনি জানান।

সরকারের দৃষ্টিতে পদ্মা ব্যারাজ শুধু একটি পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো নয়; বরং এর সঙ্গে দেশের বিস্তৃত একটি অঞ্চলের কৃষি, মৎস্য, বিদ্যুৎ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্ভাবনা জড়িয়ে রয়েছে। পানিসম্পদমন্ত্রী প্রকল্পটিকে অর্থনৈতিক রূপান্তরের জন্য একটি ‘মাস্টারমাইন্ড মেগা প্রজেক্ট’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার দাবি, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের ২৪টি জেলার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষি এখনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নদী ও পানির ওপর নির্ভরশীল কৃষি ব্যবস্থায় সঠিক সময়ে পানি পাওয়া যেমন জরুরি, তেমনি অতিরিক্ত পানি নিয়ন্ত্রণ করাও গুরুত্বপূর্ণ। পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের মাধ্যমে পানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা তৈরি হলে কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে মনে করছে সরকার। এর ফলে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের কৃষকদের উৎপাদন পরিকল্পনা আরও স্থিতিশীল হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

পানিসম্পদমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে কৃষিতে সম্ভাব্য বিপ্লবের পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে মাছের চাষ এবং ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির সম্ভাবনাও রয়েছে। নদী ও জলসম্পদের পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতির বিভিন্ন খাত সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। কৃষি উৎপাদন বাড়লে এর সঙ্গে পরিবহন, সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতেও নতুন কর্মকাণ্ড তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রকল্পটি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বাংলাদেশের পানি ব্যবস্থাপনার ইতিহাস ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গঙ্গা চুক্তির গ্যারান্টি ক্লজ একমাত্র জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে হয়েছিল। জাতিসংঘে বাংলাদেশের পানি ব্যবস্থাপনার স্বার্থও তিনি নিশ্চিত করেছিলেন বলে দাবি করেন উপদেষ্টা।

তিনি আরও বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াও পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় বৈপ্লবিক পরিবর্তনের জন্য কাজ করেছেন। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার পানি ব্যবস্থাপনাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। নির্বাচনী ইশতেহারে তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং পদ্মা ব্যারাজের মতো বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের যে প্রত্যাশা ছিল, তা বাস্তবায়নের দিকে সরকার এগোচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের বক্তব্যে তিস্তা মহাপরিকল্পনার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি বলেন, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের কাজ শুরুর পর ভবিষ্যতে তিস্তা মহাপরিকল্পনাও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এর মধ্য দিয়ে দেশের নদী ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনার সরকারের পরিকল্পনার কথাও সামনে আসে।

পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয় গত ১৩ মে। সে সময় সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী ও একনেক সভাপতি তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেকের বৈঠকে প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। অনুমোদনের পর পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয়, মেয়াদ এবং উপকারভোগীর সংখ্যা সম্পর্কে প্রাথমিক তথ্য জানানো হয়েছিল।

সরকারের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা। প্রকল্পটি সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটির মেয়াদ পাঁচ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ অনুমোদিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, কয়েক বছরের মধ্যে এর অবকাঠামোগত কাজ সম্পন্ন করে প্রত্যাশিত সুবিধা পাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।

প্রকল্পটির সম্ভাব্য সুফলের পরিধিও বেশ বড়। সরকারের হিসাবে, দেশের ২৪টি জেলার প্রায় সাত কোটি মানুষ সরাসরি এর মাধ্যমে উপকৃত হতে পারেন। এত বড় জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকার সঙ্গে পানি ব্যবস্থাপনার এই প্রকল্পের সম্পর্ক থাকায় এর বাস্তবায়ন নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহও রয়েছে।

বিশেষ করে নদীনির্ভর কৃষিপ্রধান অঞ্চলের মানুষের কাছে পানি ব্যবস্থাপনা সরাসরি জীবিকার সঙ্গে সম্পর্কিত। কখনো অতিরিক্ত পানি, কখনো পানির সংকট—দুই ধরনের পরিস্থিতিই কৃষকের উৎপাদন ব্যাহত করতে পারে। পরিকল্পিত পানি ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা গড়ে উঠলে কৃষকদের উৎপাদন ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি জমির ব্যবহার আরও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে জলাশয় ও পানির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মৎস্যসম্পদ উন্নয়নের সম্ভাবনাও রয়েছে।

পদ্মা ব্যারাজ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনার বিষয়টিও সরকারের বক্তব্যে এসেছে। বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদার প্রেক্ষাপটে নতুন ও বহুমুখী উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে প্রকল্পের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা, সম্ভাব্য উৎপাদনের পরিমাণ এবং জাতীয় গ্রিডে এর অবদান কতটা হবে, তা বাস্তবায়নের পরবর্তী পর্যায়ে বিস্তারিতভাবে স্পষ্ট হবে।

একইভাবে কৃষি ও মৎস্য খাতে সম্ভাব্য উৎপাদন বৃদ্ধির বাস্তব সুফল পেতে শুধু ব্যারাজ নির্মাণই যথেষ্ট নয়; এর সঙ্গে পানি বণ্টন, সেচব্যবস্থা, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন হবে। বড় নদী ও পানি অবকাঠামোর ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনাও গুরুত্বপূর্ণ।

পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পকে সরকার শুধু অবকাঠামো নির্মাণ হিসেবে দেখছে না। এর মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, মৎস্যসম্পদের বিকাশ, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের একটি সমন্বিত সুযোগ তৈরি করতে চায়। প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা ও স্থানীয় অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার এই বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে সময়, অর্থায়ন, কারিগরি সক্ষমতা, পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা এবং নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করার মতো বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হলে প্রতিটি ধাপে কার্যকর সমন্বয় এবং কঠোর তদারকি প্রয়োজন হবে।

বর্তমানে প্রকল্পটি একনেকের অনুমোদন পাওয়ার পর বাস্তবায়নের প্রস্তুতি পর্যায়ে রয়েছে। প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা থেকে সরকারের পক্ষ থেকে এর গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। আগামী বছর প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করলে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন কার্যক্রম আরও দৃশ্যমান পর্যায়ে প্রবেশ করবে।

পদ্মা ব্যারাজ নিয়ে সরকারের প্রত্যাশা যেমন বড়, তেমনি মানুষের প্রত্যাশাও কম নয়। কৃষক চান উৎপাদনে স্থিতিশীলতা, ব্যবসায়ী চান স্থানীয় অর্থনীতিতে গতি, আর নদী ও পানিনির্ভর জনগোষ্ঠী চায় পানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘস্থায়ী সমাধান। এসব প্রত্যাশা কতটা বাস্তবে পূরণ হবে, তা নির্ভর করবে প্রকল্পের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের দক্ষতার ওপর।

প্রায় সাত কোটি মানুষের সম্ভাব্য সরাসরি উপকারের কথা সামনে রেখে পদ্মা ব্যারাজ তাই বাংলাদেশের পানি ব্যবস্থাপনা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হিসেবে সামনে এসেছে। আগামী বছর এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করবে বলে জানিয়েছেন পানিসম্পদমন্ত্রী। এখন নজর থাকবে নির্ধারিত সময় ও ব্যয়ের মধ্যে প্রকল্পটি কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায় এবং এর প্রত্যাশিত সুফল দেশের মানুষের কাছে কত দ্রুত পৌঁছায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত