ভারতের সঙ্গে ১০১ চুক্তি পর্যালোচনা করছে সরকার

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৫ বার
ভারতের সঙ্গে ১০১ চুক্তি পর্যালোচনা করছে সরকার

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে সম্পাদিত চুক্তি, সমঝোতা ও সহযোগিতামূলক ব্যবস্থাগুলো নতুন করে পর্যালোচনার উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান সরকার। জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি জানিয়েছেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে ভারতের সঙ্গে করা ১০১টি চুক্তি সরকার পর্যালোচনা করছে। এই পর্যালোচনার ফলাফল শিগগিরই সামনে আসবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

শুক্রবার সকালে জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে চিফ হুইপ এসব কথা বলেন। তার বক্তব্যে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ, পারস্পরিক সমতা ও দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। একই সঙ্গে অতীত সরকারের সময়ে সম্পাদিত বিভিন্ন চুক্তি নিয়ে বর্তমান সরকারের মূল্যায়ন ও ভবিষ্যৎ অবস্থানের একটি ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে।

নুরুল ইসলাম মনি বলেন, বর্তমান সরকার অতীতে করা বিভিন্ন অনৈতিক চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। তার ভাষায়, বিএনপি সরকারের মূলনীতি হচ্ছে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। অর্থাৎ প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি যেকোনো দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও সমঝোতায় বাংলাদেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার নীতিতে সরকার এগোতে চায়।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই বহুমাত্রিক। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, যোগাযোগ, নদীর পানি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা, অবকাঠামো, নৌ ও স্থলপথে পণ্য পরিবহনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা রয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে দুই দেশের সম্পর্ক নানা পর্যায় অতিক্রম করেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন চুক্তি ও সমঝোতার মাধ্যমে সহযোগিতার ক্ষেত্রও বিস্তৃত হয়েছে। ফলে ১০১টি চুক্তি পর্যালোচনার সরকারি উদ্যোগ কেবল একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়, বরং দুই দেশের সম্পর্কের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান পুনর্মূল্যায়নের ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

চিফ হুইপের বক্তব্য অনুযায়ী, পর্যালোচনার মাধ্যমে কোন চুক্তি বাংলাদেশের জন্য কতটা উপকারী, কোন চুক্তির বাস্তবায়নে দেশের স্বার্থ কতটা নিশ্চিত হয়েছে এবং কোনো ব্যবস্থায় বাংলাদেশের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কি না—এসব বিষয় সামনে আসতে পারে। তবে সরকার ঠিক কোন কোন চুক্তি বাতিল, সংশোধন, পুনর্নির্ধারণ বা বহাল রাখার কথা বিবেচনা করছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। ফলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।

সংবাদ সম্মেলনে নুরুল ইসলাম মনি চট্টগ্রাম বন্দরের উদাহরণও তুলে ধরেন। তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশ ও বন্ধুদেশের দুটি জাহাজ একই সময়ে বন্দরে এলেও বন্ধুদেশের জাহাজ আগে খালাস পাওয়ার মতো ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তার বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের স্বার্থবিরোধী এমন বহু চুক্তি আগের সরকার করে গেছে এবং বর্তমান সরকার সেসব ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে।

তার এই বক্তব্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘বন্ধুত্ব’ ও ‘জাতীয় স্বার্থের’ মধ্যে ভারসাম্য রাখার বিষয়টি সামনে এসেছে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও সরকারের দৃষ্টিতে সেই সম্পর্ক যেন দেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে—এমন একটি নীতিগত অবস্থানের কথা তিনি তুলে ধরেছেন।

চিফ হুইপ বলেন, বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষার পরেই বন্ধুত্ব বজায় রাখা হবে। এই বক্তব্যকে সরকারের পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক যত ঘনিষ্ঠই হোক, দ্বিপক্ষীয় চুক্তির ক্ষেত্রে উভয় দেশের সমান মর্যাদা, পারস্পরিক সুবিধা এবং জাতীয় স্বার্থের ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ১৯৭২ সালের মৈত্রী, সহযোগিতা ও শান্তি চুক্তি থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে বাণিজ্য, যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে একাধিক সমঝোতা হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল পারস্পরিক সহযোগিতা ও আঞ্চলিক যোগাযোগ। পরবর্তী সময়ে সীমান্ত, নদীর পানি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, বন্দর ব্যবহার এবং ট্রানজিটসহ বিভিন্ন বিষয়ও সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। ঐতিহাসিক নথিতে দুই দেশের মৈত্রী চুক্তিতে অর্থনৈতিক, বৈজ্ঞানিক, কারিগরি, বাণিজ্য, যোগাযোগ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নদী অববাহিকা উন্নয়নের মতো সহযোগিতার ক্ষেত্র উল্লেখ ছিল।

বর্তমান সরকারের চুক্তি পর্যালোচনার উদ্যোগ তাই বৃহত্তর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন মূল্যায়নের অংশ হতে পারে। বিশেষ করে বাণিজ্য ঘাটতি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, পানি বণ্টন, ট্রানজিট ও বন্দর ব্যবহারের মতো দীর্ঘদিনের আলোচিত ইস্যুগুলোতে বাংলাদেশের স্বার্থ কতটা নিশ্চিত হয়েছে, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হতে পারে।

তবে চুক্তি পর্যালোচনা মানেই সব চুক্তি বাতিল করা নয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কূটনীতিতে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সাধারণত নির্দিষ্ট আইনগত ও কূটনৈতিক কাঠামোর মধ্যে সম্পাদিত হয়। কোনো চুক্তি পরিবর্তন বা বাতিল করতে হলে সংশ্লিষ্ট চুক্তির শর্ত, মেয়াদ, বাস্তবায়ন কাঠামো এবং দুই দেশের পারস্পরিক আলোচনার বিষয়গুলো বিবেচনা করতে হয়। তাই সরকারের পর্যালোচনার পর কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

এদিকে সংবাদ সম্মেলনে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন চিফ হুইপ। তিনি জানান, হাসিনা সরকারের রেখে যাওয়া ২০৫ কোটি ডলারের ঋণ সরকার পরিশোধ করেছে। পাশাপাশি দেশে ১৬ লাখ টন সার মজুত রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। বিদ্যুৎ ও গ্যাস সমস্যা সমাধানে সরকারের সদিচ্ছার কোনো ঘাটতি নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

সংসদীয় কার্যক্রম নিয়েও সংবাদ সম্মেলনে তথ্য তুলে ধরেন চিফ হুইপ। তিনি জানান, জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন নয় কার্যদিবস ধরে চলে। এই অধিবেশনে ছয়টি বিল উত্থাপন ও পাস হয়েছে। বিভিন্ন বিধির আওতায় সংসদ সদস্যদের ১ হাজার ৬৭৮টি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী নিজে ১৫টি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। সংসদীয় কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পরপর অধিবেশন বসে এবং আগামী অধিবেশনও একই নিয়মে অনুষ্ঠিত হবে বলে জানান তিনি।

সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব নিয়েও বক্তব্য দেন নুরুল ইসলাম মনি। তিনি জানান, মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত ৩৯টি স্থায়ী কমিটির মধ্যে ২৪টিতে বিরোধী দলের সদস্য রাখা হয়েছে। ২২টি কমিটিতে বিরোধী দলের তিনজন করে সদস্য রয়েছেন এবং অন্য কয়েকটি কমিটিতে দুজন করে সদস্য রাখা হয়েছে। সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতি হিসেবে সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরকে রাখার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে আগামী দিনে চুক্তি পর্যালোচনার ফলাফল বিশেষ গুরুত্ব বহন করতে পারে। কারণ দুই দেশের সম্পর্ক শুধু কূটনৈতিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়; দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, আমদানি-রপ্তানি, সীমান্তবর্তী মানুষের জীবনযাত্রা, পরিবহনব্যবস্থা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের ওপরও এর সরাসরি প্রভাব রয়েছে।

বিশেষ করে ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের জন্য দুই দেশের বাণিজ্যিক চুক্তি ও যোগাযোগব্যবস্থার স্থিতিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে সীমান্তবর্তী অঞ্চলের মানুষের জন্য সীমান্ত বাণিজ্য, যাতায়াত ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর দুই দেশের সম্পর্কের প্রভাব রয়েছে। ফলে কোনো চুক্তি সংশোধন বা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কেবল রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ নয়, অর্থনৈতিক ও জনজীবনের বাস্তব প্রভাবও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, চুক্তিগুলোর পর্যালোচনার ফলাফল শিগগিরই প্রকাশ করা হবে। সেই ফলাফল সামনে এলে বোঝা যাবে কোন চুক্তি নিয়ে সরকারের আপত্তি রয়েছে, কোনগুলো সংশোধনের প্রয়োজন মনে করা হচ্ছে এবং কোন সহযোগিতা আগের কাঠামোতেই চালু রাখা হবে। একই সঙ্গে ভারত সরকারের সঙ্গে এ বিষয়ে কী ধরনের কূটনৈতিক আলোচনা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সব মিলিয়ে ১০১টি চুক্তি পর্যালোচনার ঘোষণা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সরকার একদিকে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার কথা বলছে, অন্যদিকে দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অবস্থানও স্পষ্ট করছে। এখন নজর থাকবে পর্যালোচনা শেষে সরকারের সিদ্ধান্তের দিকে। সেই সিদ্ধান্তই আগামী দিনে দুই দেশের সম্পর্কের অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও কৌশলগত কাঠামোয় কতটা পরিবর্তন আসে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হয়ে উঠতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত