এআইয়ের উত্থান সামলাতে প্রস্তুত নয় বিশ্ব : বিল গেটস

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৬ বার
এআইয়ের উত্থান সামলাতে প্রস্তুত নয় বিশ্ব : বিল গেটস

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত বিকাশ বিশ্ব অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে। কিন্তু এই পরিবর্তনের সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় বিশ্বের সরকারগুলো এখনো যথেষ্ট প্রস্তুত নয় বলে সতর্ক করেছেন মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস। তার মতে, এআইয়ের সুবিধা যেমন বিপুল, তেমনি সঠিকভাবে পরিচালনা করা না গেলে এর প্রভাব সমাজ ও অর্থনীতিতে নতুন ধরনের বৈষম্য ও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

এআই নিয়ে দেওয়া এক সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে গেটস বলেন, প্রযুক্তিটির দ্রুত অগ্রগতির তুলনায় সরকারি প্রস্তুতি অনেক পিছিয়ে রয়েছে। তার ভাষায়, বিশ্বের কোনো সরকারই এআইয়ের সম্ভাব্য পরিবর্তন নিয়ে যতটা গভীরভাবে কাজ করা প্রয়োজন, ততটা করছে না। ফলে প্রযুক্তিটির সুফল নিশ্চিত করার পাশাপাশি এর অপব্যবহার ও নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় এখনই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

দীর্ঘদিন ধরেই এআইয়ের সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী বিল গেটস। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কৃষি ও বৈজ্ঞানিক গবেষণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের কাজকে আরও দ্রুত ও কার্যকর করতে পারে বলে তিনি মনে করেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তার বক্তব্যে এআইয়ের ঝুঁকির বিষয়টিও ক্রমশ গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে চাকরির বাজারে বড় পরিবর্তন, প্রযুক্তির অপব্যবহার করে হামলা চালানোর আশঙ্কা এবং মানুষের জীবনে এআইভিত্তিক ভার্চুয়াল সঙ্গীর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন তিনি।

গেটসের মতে, এআইকে কেবল প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি এমন একটি শক্তিশালী প্রযুক্তি, যার প্রভাব সমাজের প্রায় প্রতিটি স্তরে পড়তে পারে। ফলে সরকারকে আইন, নীতিমালা, শিক্ষা ও অবকাঠামোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টিও গুরুত্ব দিতে হবে।

বিশেষ করে ধনী ও দরিদ্র মানুষের মধ্যে প্রযুক্তিগত বৈষম্য নিয়ে উদ্বিগ্ন গেটস। তার মতে, এআই যদি কেবল উন্নত দেশ ও ধনী মানুষের নাগালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে বিশ্বে বিদ্যমান বৈষম্য আরও বাড়তে পারে। বিপরীতে সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে এই প্রযুক্তিই দরিদ্র মানুষের জীবনমান উন্নয়নের অন্যতম কার্যকর হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

এ লক্ষ্যেই বিল গেটসের প্রতিষ্ঠিত ফাউন্ডেশন আগামী দুই বছরে এআই ব্যবহারের সুযোগ বাড়াতে অন্তত ১০০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা করেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কৃষি খাতে কাজ করা বিভিন্ন অংশীদার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই অর্থ ব্যয় করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে এআই ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো তৈরিতেও গুরুত্ব দেওয়া হবে।

ফাউন্ডেশনের পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভাষাগত বৈচিত্র্যের বিষয়টি। বিশ্বের বড় একটি জনগোষ্ঠী এমন ভাষায় কথা বলে, যেগুলো এখনো অনেক এআই মডেলে পর্যাপ্তভাবে সমর্থিত নয়। ফলে প্রযুক্তির সুবিধা সবার কাছে পৌঁছে দিতে হলে বিভিন্ন ভাষায় কার্যকরভাবে কাজ করতে সক্ষম এআই ব্যবস্থা তৈরি করা প্রয়োজন। গেটসের ফাউন্ডেশন এ ধরনের প্রযুক্তিগত ভিত্তি তৈরিতেও কাজ করতে চায়।

স্বাস্থ্য খাতকে এআইয়ের সম্ভাব্য সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী ক্ষেত্রগুলোর একটি হিসেবে দেখছেন গেটস। তার মতে, এই প্রযুক্তি স্বাস্থ্যসেবায় যে ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে, তার সম্ভাবনা বোঝাতে গেলেও অনেক সময় তা কম করে বলা হয়। বিশেষ করে দরিদ্র দেশগুলোতে যেখানে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি রয়েছে, সেখানে এআই প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রাথমিক পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের রোগ শনাক্তকরণ, তথ্য বিশ্লেষণ ও রোগীদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ার ক্ষেত্রে এআই সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে নতুন ওষুধ ও টিকা আবিষ্কারের গবেষণায় বিপুল পরিমাণ তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ করেও সময় কমানো সম্ভব হতে পারে। ফলে উন্নত প্রযুক্তি শুধু ধনী দেশগুলোর স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার পরিবর্তে উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশগুলোর স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ঘাটতি পূরণেও ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

এআইয়ের দ্রুত বিস্তারকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে গেটস হলিউডের বিজ্ঞান কল্পকাহিনিনির্ভর চলচ্চিত্রের উদাহরণ দিয়েছেন। এসব চলচ্চিত্রে প্রায়ই দেখা যায়, ভিনগ্রহের কোনো বুদ্ধিমান প্রাণী পৃথিবীতে এসে মানবজাতির জন্য হুমকি তৈরি করেছে। তখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নিজেদের বিরোধ ভুলে একসঙ্গে সেই সংকট মোকাবিলায় কাজ করে। গেটসের মতে, এআইকে অনেকটা সেই ভিনগ্রহের বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। তবে বড় পার্থক্য হলো, এআই ভবিষ্যতে আসবে এমন কোনো সম্ভাবনা নয়; এটি ইতিমধ্যেই মানুষের জীবনের অংশ হয়ে গেছে।

এই কারণে এআইয়ের ঝুঁকি মোকাবিলায় বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা আরও বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তার মতে, একেক দেশ যদি সম্পূর্ণ আলাদা নীতিতে এআই পরিচালনা করে, তাহলে প্রযুক্তিটির বৈশ্বিক ঝুঁকি মোকাবিলা করা কঠিন হবে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ বিশ্বের বড় প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক শক্তিগুলোকে নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করতে হবে।

এআই নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গেও আলোচনা করেছেন বলে জানিয়েছেন গেটস। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলার কথা জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সঙ্গেও এ বছরের শেষ দিকে দেখা করার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেছেন। এর মধ্য দিয়ে এআই নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনার প্রয়োজনীয়তাই সামনে এসেছে।

এদিকে এআইয়ের সম্ভাব্য চাকরি সংকট নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। প্রযুক্তির সক্ষমতা যত বাড়ছে, তত বেশি কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এতে কিছু ক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা বাড়লেও অনেক প্রচলিত কাজের ধরন বদলে যেতে পারে। নতুন দক্ষতার প্রয়োজন তৈরি হওয়ার পাশাপাশি কিছু পেশায় কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। তাই শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে দ্রুত পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা।

সাক্ষাৎকারে নিজের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি নিয়েও কথা বলেছেন গেটস। প্রয়াত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে তার অতীত যোগাযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে আলোচনা রয়েছে, সে প্রসঙ্গও উঠে আসে। গেটস জানিয়েছেন, তিনি অতীতে এপস্টেইনের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তবে তার বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের অভিযোগ নেই। তার ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে স্বাধীন পর্যালোচনা করা হয়েছিল বলে জানানো হয়েছে।

গেটসের বক্তব্য অনুযায়ী, এপস্টেইনের সঙ্গে যোগাযোগের কারণে তার ফাউন্ডেশনের স্বাস্থ্য ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের প্রতি আগ্রহ কমেনি। শিশু মৃত্যুহার কমানো, ম্যালেরিয়া প্রতিরোধ এবং বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে কাজ করার ক্ষেত্রেও তার প্রতিষ্ঠান আগের মতোই সক্রিয় রয়েছে বলে তিনি জানান।

তবে সব বিতর্কের বাইরে এআই নিয়ে গেটসের মূল বার্তা হলো—প্রযুক্তিকে ভয় না পেয়ে দায়িত্বশীলভাবে পরিচালনা করতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানবজীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে, কিন্তু সেই পরিবর্তনের সুফল যেন কেবল কিছু দেশ বা মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ব যখন এআইয়ের অভূতপূর্ব অগ্রগতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন সরকারের প্রস্তুতি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সাধারণ মানুষের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা—এই তিনটি বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন গেটস। তার মতে, এখনই কার্যকর নীতি ও সহযোগিতার কাঠামো তৈরি করা না গেলে ভবিষ্যতে এআইয়ের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব সামলানো আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। আর সঠিক পরিকল্পনা ও দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে একই প্রযুক্তি বিশ্বের দরিদ্র মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার শক্তিশালী হাতিয়ারও হয়ে উঠতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত