বাড়ছে গ্যাস সরবরাহ, কাটতে শুরু করেছে সংকট

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১০ বার
বাড়ছে গ্যাস সরবরাহ, কাটতে শুরু করেছে সংকট

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি হতে শুরু করেছে। আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহ বাড়ায় সাম্প্রতিক সময়ের তীব্র সংকট কিছুটা কমে এসেছে। গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, সিএনজি স্টেশন থেকে শুরু করে আবাসিক গ্রাহকদের মধ্যেও যে ভোগান্তি তৈরি হয়েছিল, সরবরাহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা কিছুটা স্বস্তির দিকে যাচ্ছে।

পেট্রোবাংলার সরবরাহসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ হয়েছে ২ হাজার ৬১০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে পাওয়া গেছে ১ হাজার ৬২০ মিলিয়ন ঘনফুট। আর আমদানি করা এলএনজি রিগ্যাসিফিকেশনের মাধ্যমে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে যুক্ত হয়েছে ৯৯০ মিলিয়ন ঘনফুট। এলএনজি সরবরাহ এই পর্যায়ে ওঠায় সামগ্রিক গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতিরও উন্নতি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় দেশে গ্যাসের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছিল। আমদানিনির্ভর এলএনজি সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হলে জাতীয় গ্যাস ব্যবস্থায় তার সরাসরি প্রভাব পড়ে। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন দিয়ে মোট চাহিদার পুরোটা পূরণ করা সম্ভব না হওয়ায় আমদানি করা এলএনজি বাংলাদেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে এলএনজি সরবরাহ কমে গেলে একই সঙ্গে বিভিন্ন খাতে গ্যাসের চাপও বাড়তে থাকে।

গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে। গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পর্যাপ্ত জ্বালানি না পেলে উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এর প্রভাব বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাতেও পড়তে পারে। অন্যদিকে গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হলে পণ্যের সরবরাহ, ব্যবসায়িক কার্যক্রম এবং কর্মসংস্থানের ওপরও পরোক্ষ চাপ তৈরি হয়।

বিশেষ করে উৎপাদননির্ভর কারখানাগুলোর জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গ্যাসের চাপ কমে গেলে উৎপাদন সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয় না। কোথাও উৎপাদন কমাতে হয়, আবার কোথাও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কার্যক্রম সীমিত করার প্রয়োজন পড়ে। এতে প্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি উৎপাদন পরিকল্পনাতেও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।

সিএনজি খাতেও গ্যাস সরবরাহের ঘাটতির প্রভাব দেখা যায়। গ্যাসের চাপ কমে গেলে অনেক সিএনজি স্টেশনে স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি যানবাহনকে জ্বালানি নিতে অপেক্ষা করতে হয়। এতে নগরাঞ্চলে যানবাহন পরিচালনায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতির ফলে এই খাতেও স্বস্তি ফেরার প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আবাসিক গ্রাহকদের জন্যও গ্যাস সরবরাহের স্বাভাবিকতা গুরুত্বপূর্ণ। রান্নার কাজে পাইপলাইনের গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোতে সরবরাহ কমে গেলে দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় সরাসরি প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে সকালে ও সন্ধ্যার ব্যস্ত সময়ে গ্যাসের চাপ কম থাকলে রান্নাবান্না থেকে শুরু করে পরিবারের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। তাই গ্যাস সরবরাহ বাড়ার খবর সাধারণ গ্রাহকদের জন্যও কিছুটা স্বস্তির।

তবে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হলেও সংকট পুরোপুরি কেটে গেছে—এমনটা বলার সুযোগ এখনো নেই। সংশ্লিষ্টদের মতে, গ্যাসের মোট চাহিদার তুলনায় সরবরাহ এখনও কম। ফলে সাময়িকভাবে এলএনজি সরবরাহ বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

বাংলাদেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় দেশীয় উৎপাদনের পাশাপাশি আমদানি করা এলএনজির গুরুত্ব গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া গ্যাসের পরিমাণ নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকায় অতিরিক্ত চাহিদা পূরণে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম, আমদানির সক্ষমতা, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বৈদেশিক মুদ্রার পরিস্থিতির মতো বিষয়গুলোও দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে পড়েছে।

এ অবস্থায় শুধু আমদানি বাড়িয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা কঠিন বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, একদিকে প্রয়োজনীয় পরিমাণ এলএনজি আমদানি নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর ওপরও জোর দিতে হবে। নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, বিদ্যমান ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং গ্যাস সঞ্চালন অবকাঠামোর উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমানে দুপুর ১২টার হিসাবে ২ হাজার ৬১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের মধ্যে ১ হাজার ৬২০ মিলিয়ন ঘনফুট দেশীয় উৎস থেকে এবং ৯৯০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি থেকে এসেছে। অর্থাৎ মোট সরবরাহের একটি উল্লেখযোগ্য অংশই এখন আমদানি করা গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। এলএনজি সরবরাহ আরও বাড়ানো গেলে স্বল্পমেয়াদে গ্যাসের ঘাটতি মোকাবিলা সহজ হতে পারে। তবে এর সঙ্গে আমদানির ব্যয় ও বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতির বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে।

গ্যাস সরবরাহের এই উন্নতি বিদ্যুৎ খাতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের বড় ভূমিকা রয়েছে। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন চালিয়ে যেতে পারে। এতে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখার সুযোগ বাড়ে। বিশেষ করে শিল্প ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম সচল রাখতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় গ্যাসের সরবরাহ পরিস্থিতির সঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

শিল্প খাতেও গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক হওয়া ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে গ্যাস সরবরাহে অনিশ্চয়তা থাকলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন পরিকল্পনা ঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে না। উৎপাদন ব্যাহত হলে শুধু উদ্যোক্তা নয়, শ্রমিক ও ভোক্তাদের ওপরও এর প্রভাব পড়ে। তাই গ্যাসের সরবরাহ পরিস্থিতির স্থিতিশীলতা অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

তবে বর্তমান উন্নতিকে স্থায়ী স্বাভাবিকতা হিসেবে দেখার আগে আরও কিছু সময় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। কারণ এলএনজি সরবরাহের ওপর নির্ভরশীলতা বেশি থাকলে যেকোনো কারণে আমদানিতে বিঘ্ন ঘটলে আবারও সংকট তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে গেলে ঘাটতি আরও বাড়তে পারে। তাই জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা নতুন করে সামনে এসেছে।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, গ্যাসের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন এবং নগরায়ণের সঙ্গে জ্বালানির প্রয়োজনও বাড়ছে। ভবিষ্যতের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে এখন থেকেই সরবরাহ ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। শুধু সংকট দেখা দিলে এলএনজি আমদানি বাড়ানোর পরিবর্তে চাহিদা ব্যবস্থাপনা, দেশীয় অনুসন্ধান এবং অবকাঠামো উন্নয়নের সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।

সামগ্রিকভাবে, এলএনজি সরবরাহ ৯৯০ মিলিয়ন ঘনফুটে ওঠায় দেশের গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতিতে আপাতত স্বস্তির আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এতে বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানা, সিএনজি স্টেশন ও আবাসিক গ্রাহকদের ওপর চাপ কিছুটা কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে গ্যাসের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ এখনও কম থাকায় সংকট পুরোপুরি দূর হয়েছে বলা যাচ্ছে না। স্বাভাবিক ও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে এলএনজি আমদানির পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ও অনুসন্ধান বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়াই হবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত