প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার ভাঙচুর ও গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাকে নজিরবিহীন বলে মন্তব্য করেছেন আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ। তাঁর দাবি, বাংলাদেশে এর আগে রাতের আঁধারে কোনো জনকল্যাণমূলক স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেনি। তাঁর মতে, একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করার মধ্য দিয়ে শুধু একটি স্থাপনার ক্ষতি হয়নি, এর সঙ্গে সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা পাওয়ার অধিকারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সোমবার রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার এবং ইসিবি চত্বরে ভাঙচুরের শিকার সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন আসাদুজ্জামান ফুয়াদ। এ সময় তিনি সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা তুলে ধরে রাজধানীতে নাগরিক নিরাপত্তা, সম্পদ রক্ষা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, দেশে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তপনা, চাঁদাবাজি, জমি ও বাড়ি দখলের মতো ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু একটি জনকল্যাণমূলক স্বাস্থ্যকেন্দ্র রাতের আঁধারে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাঁর ভাষায়, স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি ধ্বংস করার মধ্য দিয়ে জনস্বাস্থ্যের ওপরও আঘাত করা হয়েছে। তিনি মনে করেন, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরোধের বিষয় হওয়ার কথা নয়; এমন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবন ও প্রয়োজন জড়িয়ে থাকে।
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দীর্ঘদিনের কার্যক্রমের কথাও তুলে ধরেন এবি পার্টির এই নেতা। তিনি বলেন, ১৯৭৪ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে চিকিৎসা ও টিকাদান সেবা দিয়ে আসছে। বিদেশি দাতা সংস্থার সহযোগিতায় পরিচালিত এই স্বাস্থ্যকেন্দ্র দীর্ঘ সময় ধরে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করে এসেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে তার প্রভাব শুধু ভবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না—এমন বিষয়ও তুলে ধরেন ফুয়াদ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নিয়মিত চিকিৎসা, টিকাদানসহ বিভিন্ন সেবা নিতে যে মানুষগুলো দীর্ঘদিন ধরে এই কেন্দ্রে আসতেন, স্থাপনাটি ধ্বংস হওয়ার ঘটনায় তাঁদের জন্যও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সহজলভ্য ও তুলনামূলক কম খরচের চিকিৎসাসেবা বন্ধ হয়ে যাওয়া একটি বড় সমস্যা হয়ে উঠতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী যখন জাতিসংঘ সফরে ছিলেন, তখন রাজধানীর একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তাঁর মতে, এমন ঘটনা দেশের ভাবমূর্তির জন্যও নেতিবাচক বার্তা তৈরি করতে পারে। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বলেও তিনি দাবি করেন।
তবে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি দখলের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতা-কর্মী এবং একজন নারী সংসদ সদস্যের সম্পৃক্ততার যে অভিযোগ গণমাধ্যমে এসেছে, সে বিষয়ে সরাসরি কাউকে দায়ী না করার কথাও বলেন ফুয়াদ। তিনি বলেন, কারও বিরুদ্ধে আগাম রায় দেওয়া উচিত নয়। তবে গণমাধ্যমে প্রকাশিত অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বের করে আনা এবং হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটে যারা জড়িত, তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
এই বক্তব্যে একই সঙ্গে অভিযোগ ও তদন্তের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক। তাঁর মতে, রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনায় না নিয়ে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক ব্যক্তির ভূমিকা তদন্তের আওতায় আনা দরকার। এতে প্রকৃত ঘটনা যেমন স্পষ্ট হবে, তেমনি ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধেও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা আরও কার্যকর হতে পারে।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুরের সময় পুলিশ কাছাকাছি অবস্থান করলেও লুটপাট ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি—এমন অভিযোগও করেন ফুয়াদ। তাঁর মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলের আশপাশে থাকলে তাঁদের ভূমিকা কী ছিল, সেটিও তদন্তের অংশ হওয়া উচিত। কেন একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুর ঠেকানো গেল না এবং ঘটনাটি কীভাবে এত বড় পরিসরে ঘটল—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেখা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
সাম্প্রতিক আরও কয়েকটি ঘটনার প্রসঙ্গও টানেন আসাদুজ্জামান ফুয়াদ। তিনি বলেন, রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ঘটনার দুই দিনের মধ্যে ইসিবি চত্বরে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি আদাবরে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ, মুগদায় জমি দখলের অভিযোগ এবং আশুলিয়ার একটি মাদ্রাসায় চাঁদার দাবিতে ভাঙচুরের ঘটনাও তিনি উল্লেখ করেন।
এসব ঘটনার মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র আছে কি না, তা নির্ধারণের দায়িত্ব তদন্তকারী সংস্থার। তবে ফুয়াদের বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল নাগরিক নিরাপত্তা ও আইনের শাসন। তিনি মনে করেন, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সম্পত্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। কোনো ঘটনায় অপরাধীরা দ্রুত আইনের আওতায় না এলে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি বাড়তে পারে।
তিনি বলেন, রাষ্ট্র যদি নাগরিকের জানমাল, সম্পদ এবং প্রতিষ্ঠান রক্ষায় ব্যর্থ হয়, তাহলে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও অনাস্থা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে হামলার মতো ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে। কারণ স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানান ফুয়াদ। পাশাপাশি তিনি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, শুধু কয়েকজনকে আটক বা গ্রেপ্তার করলেই বিষয়টির পূর্ণ সমাধান হবে না; ঘটনার পেছনে কারা ছিল, কী উদ্দেশ্যে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়েছে এবং লুটপাটের সঙ্গে কারা জড়িত ছিল—এসব বিষয়ও তদন্তে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
একই সঙ্গে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি দ্রুত পুনর্নির্মাণ করে সেখানে আগের মতো জনসাধারণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, একটি ভবন ধ্বংস হয়ে গেলে সেটি পুনর্নির্মাণ করা সম্ভব হলেও দীর্ঘদিন ধরে ওই কেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল মানুষের স্বাস্থ্যসেবা যাতে বন্ধ না থাকে, সেটিই হওয়া উচিত প্রধান অগ্রাধিকার।
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে ঘিরে এই ঘটনা রাজধানীর জনস্বাস্থ্য, সম্পত্তির নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান কীভাবে হামলা ও ভাঙচুরের শিকার হলো, সেখানে লুটপাটের অভিযোগ কীভাবে উঠল এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সামনে আসার প্রত্যাশা রয়েছে।
সোমবার স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও পরিদর্শনের সময় আসাদুজ্জামান ফুয়াদের সঙ্গে এবি পার্টির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল ওহাব মিনার, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার যোবায়ের আহমেদ ভূইয়া ও আলতাফ হোসাইন, জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার আব্বাস ইসলাম খান নোমানসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণ, দায়ীদের শনাক্ত করা এবং স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম স্বাভাবিক করা। তদন্তের ফলাফল ও আইনগত পদক্ষেপের মধ্য দিয়েই স্পষ্ট হবে কারা এই ঘটনার জন্য দায়ী এবং কীভাবে এমন একটি জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের মুখে পড়ল। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত স্বাস্থ্যসেবা দ্রুত পুনরুদ্ধার করা গেলে স্থানীয় সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের চিকিৎসা ও টিকাদান সেবাও স্বাভাবিক ধারায় ফিরতে পারে।