প্রচলিত পদ্ধতিতেই তেল মিলছে, ডিপিএম বন্ধ বিপিসির

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৪ বার
প্রচলিত পদ্ধতিতেই তেল মিলছে, ডিপিএম বন্ধ বিপিসির

প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকায় সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি বা ডিপিএমের মাধ্যমে জ্বালানি তেল কেনার প্রস্তাব গ্রহণ বন্ধ করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই পদ্ধতিতে জ্বালানি তেল সরবরাহের কোনো প্রস্তাব না দিতে সংশ্লিষ্ট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনুরোধ করেছে রাষ্ট্রীয় এই সংস্থা। সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সরবরাহব্যবস্থায় সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় যে বিশেষ ক্রয়পদ্ধতি চালু রাখা হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতে তার প্রয়োজনীয়তা কমে আসায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বিপিসির সংশ্লিষ্ট বিভাগের দেওয়া বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, গত ২৭ সেপ্টেম্বর ডিপিএম পদ্ধতিতে জ্বালানি তেল কেনার বিষয়ে নতুন নির্দেশনা জারি করা হয়। বিপিসির মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্য ও অপারেশন) মোহাম্মদ জাহিদ হোসাইন স্বাক্ষরিত ওই বিজ্ঞপ্তিতে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ডিপিএমের আওতায় জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রস্তাব দাখিল না করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

জ্বালানি তেল একটি দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। পরিবহনব্যবস্থা থেকে শুরু করে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন, কৃষি এবং পণ্য পরিবহন—বিভিন্ন খাতে জ্বালানি তেলের সরবরাহের ওপর নির্ভরশীলতা রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা কিংবা সরবরাহব্যবস্থায় কোনো ধরনের বিঘ্ন দেখা দিলে তার প্রভাব দ্রুতই দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে পড়তে পারে। এই বাস্তবতায় সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখার বিষয়টি বিপিসির জন্য বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি তেল সরবরাহব্যবস্থায় সম্ভাব্য বিরূপ প্রভাব মোকাবিলার উদ্দেশ্যে বিপিসি ডিপিএম পদ্ধতিতে বিভিন্ন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রস্তাব গ্রহণ করে আসছিল। অর্থাৎ প্রচলিত ক্রয় প্রক্রিয়ার পাশাপাশি বিশেষ পরিস্থিতিতে দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য সরাসরি ক্রয়ের সুযোগ ব্যবহার করা হচ্ছিল।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে জ্বালানি তেলের বাজারে সরবরাহ, পরিবহন ও মূল্য—তিন ক্ষেত্রেই অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো একটি অঞ্চলে সংঘাত তৈরি হলে জাহাজ চলাচল, বীমা ব্যয়, পরিবহন সময় এবং আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে। এ ধরনের সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় রেখে বিপিসি ডিপিএমের মাধ্যমে অতিরিক্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল।

তবে বিপিসির বর্তমান মূল্যায়নে পরিস্থিতিতে পরিবর্তন এসেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, বর্তমানে জ্বালানি তেল সরবরাহ পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রচলিত ক্রয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই দেশে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে। ফলে বিশেষ পরিস্থিতিতে ব্যবহারের জন্য চালু রাখা ডিপিএম পদ্ধতিতে নতুন করে সরবরাহ প্রস্তাব গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা আপাতত কমে গেছে।

এ সিদ্ধান্তের ফলে জ্বালানি তেল আমদানির পুরো প্রক্রিয়া বন্ধ হচ্ছে না। বরং বন্ধ করা হয়েছে নির্দিষ্ট একটি ক্রয়পদ্ধতির মাধ্যমে সরবরাহের প্রস্তাব গ্রহণ। বিপিসির প্রচলিত ক্রয় প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে এবং সেই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই দেশের প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা।

বিপিসির এই সিদ্ধান্তের আরেকটি দিক হলো, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন নির্দেশনা। যেসব প্রতিষ্ঠান আগে ডিপিএম পদ্ধতিতে জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রস্তাব দেওয়ার সুযোগ পেত, তাদের এখন পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ওই পদ্ধতিতে কোনো প্রস্তাব জমা না দিতে বলা হয়েছে। ফলে সরবরাহকারীদের সঙ্গে বিপিসির ক্রয়সংক্রান্ত কার্যক্রমের একটি নির্দিষ্ট অংশ আপাতত স্থগিত থাকছে।

ডিপিএম পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা সাধারণত জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ক্রয় এবং সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রয়োজনের সঙ্গে সম্পর্কিত। স্বাভাবিক ক্রয় প্রক্রিয়ার তুলনায় কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে সরাসরি ক্রয়ের মাধ্যমে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ ধরনের পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা পরিস্থিতিনির্ভর। যখন প্রচলিত ক্রয় ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়, তখন অতিরিক্ত বা বিশেষ ক্রয়পদ্ধতির ব্যবহার কমিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হয়।

বিপিসির বর্তমান সিদ্ধান্তকে সেই পরিস্থিতিরই প্রতিফলন হিসেবে দেখা যায়। সংস্থাটি বলছে, এখন প্রচলিত ব্যবস্থার মাধ্যমেই জ্বালানি তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রয়েছে। ফলে বৈশ্বিক পরিস্থিতির সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় যে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, বর্তমান বাস্তবতায় তা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

তবে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে বদলাতে পারে। কারণ বিপিসির বিজ্ঞপ্তিতে ডিপিএম পদ্ধতি স্থায়ীভাবে বাতিল করার কথা বলা হয়নি। বরং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এ পদ্ধতিতে সরবরাহের প্রস্তাব না দিতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে জ্বালানি তেল সরবরাহ পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন হলে কিংবা নতুন কোনো ঝুঁকি দেখা দিলে বিপিসি আবারও ডিপিএম পদ্ধতির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সরবরাহের ধারাবাহিকতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা, যুদ্ধ পরিস্থিতি কিংবা পরিবহনব্যবস্থায় সংকট দেখা দিলে আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশকেও বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হয়। এ কারণে জ্বালানি তেলের মজুত, আমদানি, পরিবহন এবং বিতরণ—প্রতিটি ধাপের ওপর নজর রাখা প্রয়োজন। বিপিসির সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তও সেই বৃহত্তর সরবরাহ ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে সামনে এসেছে।

বর্তমানে প্রচলিত ক্রয় প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল পাওয়া যাচ্ছে—বিপিসির এমন মূল্যায়নই ডিপিএমের প্রস্তাব গ্রহণ বন্ধের মূল কারণ। এতে একদিকে বিশেষ ক্রয়পদ্ধতির ওপর নির্ভরতা কমছে, অন্যদিকে নিয়মিত ক্রয় ব্যবস্থার সক্ষমতার ওপর আস্থা প্রকাশ পাচ্ছে। তবে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজার বা সরবরাহ পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন হলে সংস্থাটিকে আবারও নতুন করে সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, বিপিসির ডিপিএম পদ্ধতিতে জ্বালানি তেল কেনা বন্ধের সিদ্ধান্ত মূলত বর্তমান সরবরাহ পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নেওয়া একটি প্রশাসনিক ও ক্রয়সংক্রান্ত পদক্ষেপ। দেশের জ্বালানি তেলের সরবরাহ যাতে কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়, সেটিই এর কেন্দ্রীয় বিষয়। এখন নজর থাকবে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার পরিবর্তনের দিকে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে প্রচলিত ক্রয় প্রক্রিয়াতেই সরবরাহ অব্যাহত রাখবে বিপিসি; আর পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে বিশেষ ক্রয়পদ্ধতি পুনরায় চালুর প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত