মাটির প্রতিমায় ফুটছে দেবীর রূপ, ব্যস্ত উল্লাপাড়ার শিল্পীরা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১২ বার
মাটির প্রতিমায় ফুটছে দেবীর রূপ, ব্যস্ত উল্লাপাড়ার শিল্পীরা

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

শারদীয় দুর্গোৎসব ঘনিয়ে আসায় সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার কুমারপল্লিগুলোতে এখন ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন মৃৎশিল্পীরা। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত মাটি, খড়, বাঁশ ও তুলির কাজে ডুবে আছেন তারা। কোনো প্রতিমার মাটির প্রলেপের কাজ শেষ হয়েছে, কোথাও চলছে শেষ মুহূর্তের সূক্ষ্ম কারুকাজ। মাটির কাঠামো ধীরে ধীরে ধারণ করছে দেবীর অবয়ব। কয়েক দিনের মধ্যেই সেই কাঁচা প্রতিমায় রঙের আঁচড় পড়বে, যুক্ত হবে পোশাক, অলংকার ও নানা সাজসজ্জা। এরপর মণ্ডপের বেদিতে স্থাপিত হয়ে পূজার মূল আকর্ষণে পরিণত হবে এসব প্রতিমা।

উল্লাপাড়া পৌরসভার ঘোষগাঁতী পালপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, শিল্পীদের কেউ প্রতিমার শরীরে শেষবারের মতো মাটির প্রলেপ দিচ্ছেন, কেউ শুকিয়ে যাওয়া অংশ পরীক্ষা করছেন, আবার কেউ পরবর্তী ধাপের কাজের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। দুর্গাপূজার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিমা তৈরি করে সরবরাহ করতে হবে, তাই হাতে সময় কম। ফলে দিন-রাতের হিসাব ভুলে একটানা কাজ করে চলেছেন কারুশিল্পীরা।

প্রবীণ কারুশিল্পী প্রদীপ পাল জানান, এ বছর তিনি ৪০টি প্রতিমা তৈরির বায়না পেয়েছেন। দুর্গাপূজার প্রায় দুই মাস আগে থেকেই তিনি ও তার সহযোগীরা প্রতিমা তৈরির প্রস্তুতি শুরু করেন। বর্তমানে তাঁর অর্ডারের প্রায় ৮৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। এখন প্রতিমাগুলো শুকিয়ে যাওয়ার অপেক্ষা। মাটি ভালোভাবে শুকিয়ে গেলে রঙের কাজ শুরু হবে। এরপর একে একে প্রতিমার সাজসজ্জা সম্পন্ন করে নির্ধারিত মণ্ডপে পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হবে।

একটি প্রতিমা তৈরির পেছনে যে শ্রম ও সময় প্রয়োজন, তা বাইরে থেকে দেখলে অনেক সময় বোঝা যায় না। প্রথমে বাঁশ ও খড় দিয়ে তৈরি করতে হয় কাঠামো। এরপর বিভিন্ন স্তরে মাটি প্রয়োগ করে ধীরে ধীরে গড়ে তোলা হয় দেবীর শরীর ও অন্যান্য অবয়ব। মাটির প্রলেপ শুকিয়ে গেলে শুরু হয় খুঁটিনাটি সংশোধনের কাজ। মুখমণ্ডলের অভিব্যক্তি, চোখ, হাতের আঙুল, অলংকারের নকশা কিংবা চুলের বিন্যাস—প্রতিটি অংশে শিল্পীর দক্ষতার প্রয়োজন হয়। সবশেষে রঙ ও সাজসজ্জার মাধ্যমে প্রতিমা পূর্ণতা পায়।

আরেক শিল্পী নিখিল পাল জানান, প্রতিমার আকার ও মানের ওপর ভিত্তি করে প্রতিটির দাম সাধারণত ২৫ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে। একটি প্রতিমা তৈরিতে কাঁচামালের পাশাপাশি শ্রম, সময় ও কারিগরি দক্ষতার প্রয়োজন হয়। প্রতিমার নকশা যত জটিল হয় এবং আকার যত বড় হয়, কাজের পরিমাণও তত বাড়ে।

উল্লাপাড়ার বারইয়ার কুমারপল্লিতেও একই ধরনের ব্যস্ততা দেখা গেছে। সেখানে শিল্পীরা একসঙ্গে একাধিক প্রতিমা তৈরির কাজ করছেন। শিল্পী সুচিত্রা সাহা জানান, তিনি তার ভাই প্রেম সাহার সহকারী হিসেবে প্রতিমা তৈরির কাজে যুক্ত রয়েছেন। এ বছর তারা ১৫টি প্রতিমা তৈরি করছেন। সময়মতো সব কাজ শেষ করতে তাদেরও এখন প্রতিদিন দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে হচ্ছে।

কুমারপল্লির এই কর্মব্যস্ততা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসবের প্রস্তুতির চিত্র নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু মৃৎশিল্পী পরিবারের জীবিকা। বছরের বিভিন্ন সময়ে মাটির তৈরি নানা সামগ্রী বানালেও দুর্গাপূজার মৌসুমে প্রতিমা তৈরির কাজ তাদের আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে ওঠে। কয়েক মাস ধরে পাওয়া অর্ডারের ওপর নির্ভর করে তাদের ব্যস্ততা ও আয় অনেকটাই বাড়ে। তাই উৎসবের আগে প্রতিটি প্রতিমা সময়মতো শেষ করে ক্রেতার হাতে তুলে দিতে পারা তাদের জন্য যেমন পেশাগত দায়িত্ব, তেমনি পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত।

শিল্পীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিমা তৈরির কাজ কেবল শারীরিক শ্রমের বিষয় নয়; এর সঙ্গে প্রয়োজন দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও সৃজনশীলতা। একই ধরনের কাঠামো অনুসরণ করলেও প্রতিটি প্রতিমার মুখাবয়ব ও সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলতে শিল্পীদের নিজস্ব দক্ষতা প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে দেবীর মুখের অভিব্যক্তি, চোখের দৃষ্টি ও শরীরের ভঙ্গিমায় সামান্য ভুলও পুরো প্রতিমার সৌন্দর্যে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে মাটির কাজ শেষ হওয়ার পর রঙের প্রতিটি তুলির আঁচড়ও শিল্পীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে উল্লাপাড়া উপজেলায় দুর্গাপূজার মণ্ডপ প্রস্তুতির কাজও এগিয়ে চলছে। উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি সুজিত কুমার ঘোষ জানিয়েছেন, এ বছর উপজেলায় মোট ৯৯টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে উল্লাপাড়া পৌর এলাকায় রয়েছে ৩১টি মণ্ডপ। এসব মণ্ডপে প্রতিমা স্থাপনের পাশাপাশি আলোকসজ্জা, প্যান্ডেল নির্মাণ, সাজসজ্জা ও অন্যান্য প্রস্তুতিও চলছে।

পূজামণ্ডপ ঘিরে নিরাপত্তার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পূজা উদযাপন পরিষদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রতিটি মণ্ডপে নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবকরা দায়িত্ব পালন করবেন। প্রতিটি মণ্ডপে ১৫ জন করে স্বেচ্ছাসেবক থাকার কথা রয়েছে। তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে সমন্বয় করে মণ্ডপের শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে সহযোগিতা করবেন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রায়হানুল ইসলাম জানিয়েছেন, দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। প্রতিটি মণ্ডপে স্থায়ীভাবে পুলিশ ও আনসার সদস্য মোতায়েন থাকবে। উৎসব শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি।

দুর্গাপূজা সামনে রেখে মণ্ডপগুলোতে প্রস্তুতি যত এগোচ্ছে, ততই কুমারপল্লিগুলোতে বাড়ছে ব্যস্ততা। শিল্পীদের হাতে তৈরি কাঁচা মাটির প্রতিমা ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে দেবীর পূর্ণাঙ্গ অবয়বে। মাটির গন্ধ, খড়ের কাঠামো আর শিল্পীর হাতের নিখুঁত কাজ মিলিয়ে কুমারপল্লিতে তৈরি হচ্ছে উৎসবের আবহ।

একজন শিল্পীর কাছে প্রতিটি প্রতিমা শুধু একটি মাটির কাঠামো নয়। দীর্ঘ সময় ধরে শ্রম দিয়ে, নিজের দক্ষতা ও সৃজনশীলতা ব্যবহার করে তিনি একটি অবয়বকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেন। সেই প্রতিমাই পরে কোনো মণ্ডপে হাজারো মানুষের শ্রদ্ধা ও উৎসবের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। তাই প্রতিমা তৈরির প্রতিটি ধাপে শিল্পীদের কাছে সময়ের গুরুত্ব যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে কাজের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা।

উল্লাপাড়ার কুমারপল্লির ব্যস্ততা এখন সেই অপেক্ষারই জানান দিচ্ছে। মাটির প্রলেপ শুকিয়ে গেলে শুরু হবে রঙের কাজ। এরপর চোখ আঁকা, অলংকার পরানো ও সাজসজ্জার মধ্য দিয়ে প্রতিমাগুলো পাবে পূর্ণাঙ্গ রূপ। মণ্ডপে প্রতিমা পৌঁছানোর পর শুরু হবে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। আর সেই সঙ্গে কুমারপল্লির নীরব পরিশ্রম ধীরে ধীরে রূপ নেবে শারদীয় উৎসবের দৃশ্যমান সৌন্দর্যে।

উৎসবের আনন্দের আড়ালে থাকা এই শিল্পীদের শ্রম তাই দুর্গাপূজার প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের হাতের নিপুণতায় মাটি হয়ে ওঠে শিল্প, আর সেই শিল্পই কয়েক দিনের জন্য পূজামণ্ডপে সৃষ্টি করে এক বিশেষ আবহ। উল্লাপাড়ার কুমারপল্লিগুলোতে এখন সেই রূপান্তরের শেষ ধাপ চলছে। সময় যত এগিয়ে আসছে, মাটির প্রতিমাগুলোও ততই জীবন্ত হয়ে উঠছে শিল্পীর স্পর্শে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত