প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুতেই সরকারের ব্যাংকনির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই ও আগস্টে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে সরকার ১৬ হাজার ৬০১ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সরকারের নেওয়া ঋণের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ২৫৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রথম দুই মাসে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়া বেড়েছে প্রায় ৪১০ শতাংশ।
রাজস্ব আদায় প্রত্যাশা অনুযায়ী না হওয়া এবং সরকারের পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয়ের চাপ বাড়ার মধ্যেই ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার এই প্রবণতা সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একদিকে সরকারের ব্যয়ের প্রয়োজন বাড়ছে, অন্যদিকে রাজস্ব আয়ে কাঙ্ক্ষিত গতি নেই। ফলে বাজেট ঘাটতি সামাল দিতে ব্যাংক খাতের ওপর সরকারের নির্ভরতা বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-আগস্ট সময়ে সরকার বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ১৬ হাজার ৬০১ কোটি টাকা ঋণ নিলেও একই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ৩ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। ফলে পুরো ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা। এর বিপরীতে গত অর্থবছরের একই সময়ে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নিট ঋণ ছিল ঋণাত্মক ৭ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরের শুরুতেই সরকারি ঋণের চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে সরকার মোট ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। সেই হিসাবে অর্থবছরের মাত্র দুই মাসেই নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ১১ দশমিক ৪৯ শতাংশ ঋণ নেওয়া হয়ে গেছে। বছরের বাকি ১০ মাসে সরকারের ঋণের চাহিদা কীভাবে পরিবর্তিত হয়, সেটি এখন অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরকার সাধারণত রাজস্ব আয় ও অন্যান্য উৎস থেকে পাওয়া অর্থের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ঋণ নিয়ে বাজেটের ঘাটতি পূরণ করে। পরিচালন ব্যয়ের মধ্যে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, বিভিন্ন প্রশাসনিক ব্যয় এবং রাষ্ট্রের নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনার খরচ রয়েছে। একই সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও বিভিন্ন অবকাঠামো খাতেও সরকারের বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হয়। রাজস্ব আয় প্রত্যাশার তুলনায় কম হলে এসব ব্যয় মেটাতে সরকারের অতিরিক্ত অর্থায়নের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।
এবার অর্থবছরের শুরুতেই রাজস্ব আদায়ে ঘাটতির বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে রাজস্ব আদায় প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে। ফলে বাজেটে নির্ধারিত ব্যয় মেটাতে সরকারের ওপর অর্থায়নের চাপ তৈরি হয়েছে। বেসরকারি খাতের দুর্বলতা, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের সংকট এবং ব্যবসা ও শিল্প খাতের নানা চ্যালেঞ্জ রাজস্ব আহরণেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ থাকলে তার প্রভাব একাধিকভাবে অর্থনীতিতে পড়তে পারে। উৎপাদন কমলে ব্যবসায়িক কার্যক্রম থেকে সরকারের রাজস্বও কমতে পারে। আবার কোনো প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের ওপরও প্রভাব পড়ে। ফলে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানোর পাশাপাশি অর্থনীতির উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ড সচল রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মনে করেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের জন্য প্রায় সাত লাখ কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বাস্তবায়ন করা কঠিন। তাঁর মতে, অতীতের কোনো সময়েই এনবিআর এ ধরনের লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি যেতে পারেনি। ফলে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ও বাস্তব সক্ষমতার মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
জাহিদ হোসেনের বিশ্লেষণে, সামনে সরকারের ব্যয়ের চাপ আরও বাড়তে পারে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির কারণে আগামী দুই বছরের মধ্যে সরকারের পরিচালন ব্যয়ে অন্তত ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত যোগ হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। এর প্রভাব রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন-ভাতার ব্যয়ের ওপরও পড়তে পারে।
সরকারের উন্নয়ন ব্যয়ের ক্ষেত্রেও অর্থের প্রয়োজন রয়েছে। বড় অবকাঠামো প্রকল্পে আন্তর্জাতিক সহায়তা থাকলেও এসব প্রকল্পে সরকারের নিজস্ব অর্থের অংশগ্রহণ প্রয়োজন হয়। পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম বাড়লে ভর্তুকি বাবদ সরকারের ব্যয়ও বাড়তে পারে। ফলে সরকারের সামগ্রিক ব্যয়ের কাঠামোতে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সরকার যদি একদিকে রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে না পারে এবং অন্যদিকে পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয় ক্রমাগত বাড়তে থাকে, তাহলে বাজেট ঘাটতি বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। আর ঘাটতি অর্থায়নের জন্য ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়া হলে সরকারি ঋণের পরিমাণ বাড়তে থাকে। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংক খাতের ঋণযোগ্য অর্থের একটি বড় অংশ সরকারের দিকে চলে যাওয়ার সম্ভাবনাও অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণের বর্তমান স্থিতিও এ প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ৩০ আগস্ট শেষে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সরকারের মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৮ হাজার ২৫ কোটি টাকা। গত জুন শেষে এই ঋণের স্থিতি ছিল ৫ লাখ ৯১ হাজার ৪২৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ দুই মাসের ব্যবধানে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণের স্থিতি বেড়েছে ১৬ হাজার ৬০১ কোটি টাকা।
অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরকারের নেওয়া ঋণের স্থিতি কিছুটা কমেছে। আগস্টের শেষে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৯০ হাজার ৩২২ কোটি টাকা। গত জুন শেষে এর পরিমাণ ছিল ৯৪ হাজার ৫১ কোটি টাকা। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ দুই মাসে ৩ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা কমেছে।
এই চিত্র থেকে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের শুরুতে সরকারের ব্যাংকঋণের প্রধান উৎস হিসেবে বাণিজ্যিক ব্যাংকের ভূমিকা বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ কিছুটা কমলেও বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ বৃদ্ধির কারণে পুরো ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নিট ঋণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
সরকারের জন্য ব্যাংকঋণ একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থায়ন উৎস হলেও অতিরিক্ত ব্যাংকঋণের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। বেসরকারি খাত যখন বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর করে, তখন একই সময়ে সরকারের ঋণের চাহিদা বাড়লে ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। এতে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রাপ্তি ও বিনিয়োগের গতিতেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।
বিশেষ করে এমন সময়ে যখন শিল্প ও ব্যবসা খাত ইতোমধ্যে গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ, উৎপাদন ব্যয়, বাজার পরিস্থিতি ও বিনিয়োগের নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে, তখন ব্যাংকিং ব্যবস্থার অর্থায়ন কতটা বেসরকারি খাতে পৌঁছাচ্ছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অর্থনীতিতে নতুন বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়াতে বেসরকারি খাতের অর্থায়ন প্রয়োজন।
তবে সরকারের ব্যাংকঋণের পরিমাণ বাড়ার অর্থ এই নয় যে অর্থনীতির ওপর তাৎক্ষণিকভাবে একই ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে ঋণের ব্যবহার, অর্থনীতির সামগ্রিক তারল্য পরিস্থিতি, বেসরকারি খাতের ঋণচাহিদা, সুদের হার এবং সরকারের রাজস্ব ও ব্যয়ের গতিপ্রকৃতির ওপর। তাই বছরের প্রথম দুই মাসের তথ্যকে পুরো অর্থবছরের চূড়ান্ত চিত্র হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তারপরও অর্থবছরের শুরুতেই নির্ধারিত বার্ষিক ব্যাংকঋণের লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ১১ দশমিক ৪৯ শতাংশ ব্যবহার হওয়া সরকারের অর্থায়ন ব্যবস্থাপনার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। সামনে রাজস্ব আদায় কতটা বাড়ে এবং সরকারের ব্যয়ের চাপ কোন পর্যায়ে থাকে, তার ওপর নির্ভর করবে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা কতটা অব্যাহত থাকে।
অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য রাজস্ব আয় বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি ব্যয়ের অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং ঋণ ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য যতটা কার্যকরভাবে বজায় রাখা যাবে, ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার প্রয়োজনও ততটা নিয়ন্ত্রিত রাখা সম্ভব হবে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসের ঋণের তথ্য তাই শুধু সরকারি অর্থায়নের চিত্র নয়, বরং দেশের রাজস্ব আহরণ, সরকারি ব্যয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার সামনে থাকা চ্যালেঞ্জগুলোরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন।