প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আজ বুধবার, ১৪ অক্টোবর, বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে ৫৭তম বিশ্ব মান দিবস। পণ্য ও সেবার গুণগত মান, নিরাপত্তা, নির্ভরযোগ্যতা এবং উৎপাদন ও ব্যবহারে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের গুরুত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে প্রতিবছর দিবসটি পালন করা হয়। এবারের বিশ্ব মান দিবসে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ওপর। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘Shared vision for a better world—Affordable and Clean Energy’, যার ভাবার্থ ‘অভিন্ন লক্ষ্য উন্নত বিশ্ব—সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি’।
বিশ্ব মান দিবস কেবল পণ্যের গুণগত মান যাচাইয়ের একটি আনুষ্ঠানিক উপলক্ষ নয়। আধুনিক বিশ্বে মানুষের জীবনযাত্রা, শিল্প উৎপাদন, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, যোগাযোগ ও প্রযুক্তির প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রের সঙ্গে মানদণ্ড সরাসরি যুক্ত। একটি পণ্য কতটা নিরাপদ, একটি যন্ত্র কতটা কার্যকর, একটি সেবা কতটা নির্ভরযোগ্য কিংবা কোনো প্রযুক্তি পরিবেশের ওপর কতটা প্রভাব ফেলছে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় মান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এবারের প্রতিপাদ্য সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে।
বিশ্বের তিনটি প্রধান আন্তর্জাতিক মান সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন বা আইএসও, ইন্টারন্যাশনাল ইলেকট্রোটেকনিক্যাল কমিশন বা আইইসি এবং ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন বা আইটিইউ যৌথভাবে বিশ্ব মান দিবস পালন করছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি উদযাপন করা হচ্ছে।
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সপ্তম লক্ষ্য বা এসডিজি-৭ হলো সবার জন্য সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য, টেকসই ও আধুনিক জ্বালানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা। এবারের বিশ্ব মান দিবসের প্রতিপাদ্যে এই লক্ষ্যকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমান বিশ্বে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে জ্বালানির সম্পর্ক এতটাই গভীর যে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি ছাড়া শিল্প, কৃষি, যোগাযোগ, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা কিংবা ডিজিটাল অর্থনীতি—কোনোটিই টেকসইভাবে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।
তবে শুধু জ্বালানি উৎপাদন বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হয় না। জ্বালানি কীভাবে উৎপাদন করা হচ্ছে, কীভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে এবং কতটা দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করা হচ্ছে—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা পরিবেশ ও জলবায়ুর ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। এ কারণে সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুশক্তি, জলবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি এসব প্রযুক্তির মান নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এবং জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য পরিবেশবান্ধব জ্বালানির গুরুত্ব আরও বেশি। দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকায় সৌরবিদ্যুৎ মানুষের জীবনযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে। কিন্তু নিম্নমানের সোলার প্যানেল, ব্যাটারি বা অন্যান্য সরঞ্জাম ব্যবহার করলে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায় না। তাই সাশ্রয়ী জ্বালানির পাশাপাশি তার মান ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করাও অত্যন্ত জরুরি।
এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে বাংলাদেশের জাতীয় মান সংস্থা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন বা বিএসটিআই সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার বিভিন্ন উপকরণের মান নির্ধারণে কাজ করছে। সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, চার্জ কন্ট্রোলার ও ব্যাটারিসহ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার বিভিন্ন উপাদানের স্থায়িত্ব ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে বিএসটিআই ৭৯টি বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড প্রণয়ন করেছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এসব মান নিয়মিত হালনাগাদ করা হচ্ছে।
এ পর্যন্ত বিএসটিআই মোট ৪ হাজার ৬৩১টি বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড প্রণয়ন করেছে। এসব মান দেশের বিভিন্ন শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। একটি পণ্য নির্ধারিত মান পূরণ করছে কি না, তা পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করার ফলে ভোক্তারা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য পণ্য ব্যবহারের সুযোগ পান। একই সঙ্গে উৎপাদকদের জন্যও মানসম্মত পণ্য তৈরির একটি কাঠামো তৈরি হয়।
সৌরবিদ্যুৎ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে মান যাচাইয়ের জন্য বিএসটিআইয়ের প্রধান কার্যালয়ে রয়েছে বিশেষায়িত সোলার প্যানেল পরীক্ষাগার। সেখানে জার্মান প্রযুক্তির অত্যাধুনিক সান সিমুলেটরের সাহায্যে সর্বোচ্চ এক হাজার ওয়াট ক্ষমতার সোলার প্যানেল পরীক্ষা করা সম্ভব। আন্তর্জাতিক নির্দেশনা অনুসরণ করে উন্নত আলোক উৎস ও ক্যালিব্রেটেড যন্ত্রপাতির মাধ্যমে প্যানেলের কার্যক্ষমতা ও গুণগত মান যাচাই করা হয়।
এই পরীক্ষার গুরুত্ব সাধারণ ভোক্তার কাছে হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান নয়। কিন্তু একটি সোলার প্যানেল কতটা বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে, নির্ধারিত পরিস্থিতিতে তার কার্যক্ষমতা কতটা স্থিতিশীল এবং দীর্ঘমেয়াদে সেটি কতটা নির্ভরযোগ্য—এসব বিষয় যাচাই করা হলে ভোক্তা ও বিনিয়োগকারী উভয়ই উপকৃত হন। নিম্নমানের প্রযুক্তি ব্যবহার করে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করলে শুরুতে খরচ কম মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্ব মান দিবসের মূল বার্তাই হলো, মান কোনো বিলাসিতা নয়; এটি নিরাপদ ও টেকসই উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি। ভালো মানের পণ্য ও সেবা মানুষের অর্থ সাশ্রয় করতে পারে, দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে পারে এবং পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব কমাতে সহায়তা করতে পারে। অন্যদিকে নিম্নমানের পণ্য ব্যবহার করলে ভোক্তার অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও পরিবেশের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশে বিশ্ব মান দিবস উপলক্ষে বিএসটিআই বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। প্রধান কার্যালয়সহ বিভাগীয় ও আঞ্চলিক কার্যালয়ে আলোচনা সভা ও প্রচারমূলক কার্যক্রম আয়োজন করা হচ্ছে। বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারে বিশেষ সাক্ষাৎকারভিত্তিক আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। জনসচেতনতা বাড়াতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের মাধ্যমে বিভিন্ন মোবাইল ফোনে খুদে বার্তা পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থানে দিবসটির প্রতিপাদ্য ও সচেতনতামূলক বার্তা সম্বলিত ব্যানার, ফেস্টুন ও প্ল্যাকার্ডও স্থাপন করা হয়েছে।
দিবসটি উপলক্ষে বুধবার সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে ঢাকার অফিসার্স ক্লাবে বিএসটিআইয়ের উদ্যোগে একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে শিল্প, বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের। বিশেষ অতিথি হিসেবে থাকবেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিসি-বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. এস এম আব্দুল-আওয়াল। সভায় মুখ্য আলোচক হিসেবে থাকবেন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক। বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালক কাজী ইমদাদুল হক সভায় সভাপতিত্ব করবেন।
বিশ্ব মান দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য বাংলাদেশের জন্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। কারণ দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়ছে। শিল্পকারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, কৃষি, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন—সব ক্ষেত্রেই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের প্রয়োজন। একই সময়ে জ্বালানি ব্যয় কমানো এবং পরিবেশগত ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি নিশ্চিত করতে প্রযুক্তির মানোন্নয়ন অপরিহার্য। একটি সোলার প্যানেল যদি নির্ধারিত মান অনুযায়ী কাজ না করে, তাহলে শুধু একজন ভোক্তাই ক্ষতিগ্রস্ত হন না; নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রতি মানুষের আস্থাও কমতে পারে। তাই সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের মান যাচাই এবং আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখা দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার অংশ।
একই সঙ্গে ভোক্তাদের মধ্যেও মানসম্পন্ন পণ্য কেনার বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। শুধু কম দাম দেখেই কোনো পণ্য কেনা হলে ভবিষ্যতে অতিরিক্ত খরচ বা নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। উৎপাদক ও আমদানিকারকদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। মানদণ্ড মেনে পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করার পাশাপাশি সঠিক তথ্য ভোক্তার কাছে পৌঁছে দেওয়াও প্রয়োজন।
বিশ্ব মান দিবস তাই একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক মান সংস্থাগুলোর ভূমিকা স্মরণ করার দিন, অন্যদিকে এটি উৎপাদক, ব্যবসায়ী, সরকার ও ভোক্তাদের যৌথ দায়িত্বের কথাও মনে করিয়ে দেয়। উন্নত বিশ্ব গড়তে প্রযুক্তি ও জ্বালানি ব্যবস্থার সম্প্রসারণ যেমন দরকার, তেমনি সেই ব্যবস্থার নিরাপত্তা, দক্ষতা, সাশ্রয় এবং পরিবেশগত স্থায়িত্ব নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।
বাংলাদেশের সামনে জ্বালানি চাহিদা, জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের মতো একাধিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মানসম্মত প্রযুক্তি এবং সঠিক মানদণ্ড অনুসরণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সাশ্রয়ী ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার যত বাড়বে, ততই প্রয়োজন হবে নির্ভরযোগ্য প্রযুক্তি ও কার্যকর মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা।
বিশ্ব মান দিবসের এবারের বার্তা তাই শুধু একটি দিনের আনুষ্ঠানিক স্লোগান নয়। এটি এমন একটি উন্নয়ন দর্শনের কথা বলে, যেখানে জ্বালানি হবে সবার জন্য সহজলভ্য, ব্যয় হবে তুলনামূলক কম, প্রযুক্তি হবে নির্ভরযোগ্য এবং পরিবেশের ওপর চাপ থাকবে যতটা সম্ভব কম। সেই লক্ষ্য অর্জনে আন্তর্জাতিক মান ও জাতীয় মানব্যবস্থার কার্যকর প্রয়োগ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত