প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রমে অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও পেশাগত দক্ষতাকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর লক্ষ্যে উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের বিষয়ে আলোচনা করছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। প্রস্তাবিত এই পরিষদে সাবেক সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষাবিদ, ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ, কূটনীতি বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তি এবং বিভিন্ন পেশায় প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করার চিন্তা রয়েছে। এমনকি অন্য ধর্মাবলম্বী ও দলের শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্য থেকেও কাউকে কাউকে উপদেষ্টা হিসেবে যুক্ত করার প্রস্তাব আলোচনায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
দলটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, সরাসরি সাংগঠনিক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন, কিন্তু বিভিন্ন বিষয়ে জামায়াতকে পরামর্শ ও সহযোগিতা দিয়ে থাকেন—এমন ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করা হতে পারে। নীতিনির্ধারণী বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া, গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের মতামত নেওয়া এবং ভবিষ্যতে রাষ্ট্র পরিচালনার মতো দায়িত্বের জন্য জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার পরিধি বাড়ানো হতে পারে এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
তবে উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি জামায়াতে ইসলামী। পরিষদের কাঠামো কেমন হবে, কারা সদস্য হতে পারবেন, তাঁদের দায়িত্ব ও ক্ষমতার সীমা কী হবে এবং দলটির বিদ্যমান সাংগঠনিক কাঠামোর সঙ্গে পরিষদের সম্পর্ক কীভাবে নির্ধারিত হবে—এসব বিষয় নিয়ে আরও আলোচনা করতে চায় দলটি। সংশ্লিষ্ট নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রস্তাবটির উদ্দেশ্য ও কার্যকারিতা নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হবে।
দলীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর জামায়াতের মধ্যে উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের আলোচনা শুরু হয়। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা আরও গতি পায়। গত জুনে দলের সর্বশেষ মজলিশে শুরার বৈঠকেও এ বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। সেখানে এমন একটি পরিষদ গঠনের প্রয়োজনীয়তা, সম্ভাব্য কার্যক্রম এবং সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে মতবিনিময় হয়। তবে ওই বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম জানিয়েছেন, উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে, তবে বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। আগামী মজলিশে শুরার বৈঠকে এ নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে। তাঁর বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, উদ্যোগটি এখনো আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে এবং এর বাস্তবায়নের জন্য দলীয় সিদ্ধান্ত ও সাংগঠনিক অনুমোদন প্রয়োজন।
পরবর্তী মজলিশে শুরার বৈঠকে উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের বিষয়টি আনুষ্ঠানিক আলোচ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার দলের আমির শফিকুর রহমানের। তিনি বিষয়টি আলোচনার জন্য উত্থাপন করলে শুরার সদস্যরা প্রস্তাবটির বিভিন্ন দিক নিয়ে মতামত দিতে পারবেন। এরপর সদস্যদের মতামত ও দলীয় পর্যালোচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে গঠনতন্ত্রে পৃথক ধারা বা উপধারা যুক্ত করে পরিষদের সাংগঠনিক ভিত্তি নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের এক নেতার ভাষ্য অনুযায়ী, উপদেষ্টা পরিষদের কাঠামো, সম্ভাব্য সদস্য এবং দায়িত্ব সম্পর্কে পরবর্তী নির্বাহী পরিষদ ও মজলিশে শুরার বৈঠকে আলোচনা হতে পারে। সব দিক বিবেচনা করে পরে দলের আমির সিদ্ধান্ত নেবেন। অর্থাৎ, পরিষদ গঠনের উদ্যোগ থাকলেও এর সদস্যসংখ্যা, সদস্য বাছাইয়ের পদ্ধতি কিংবা কার্যক্রমের পরিধি এখনো নির্ধারিত হয়নি।
জামায়াতের বিদ্যমান সাংগঠনিক কাঠামোর সঙ্গে প্রস্তাবিত উপদেষ্টা পরিষদের পার্থক্যও এই উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ দিক। দলটির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, আনুষ্ঠানিকভাবে সাংগঠনিক রাজনীতিতে যুক্ত হতে হলে রুকন বা শপথধারী কর্মী হওয়ার নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। এরপর সাংগঠনিক নিয়ম ও দায়িত্বের ধারাবাহিকতায় নেতৃত্বে আসার সুযোগ তৈরি হয়। ফলে কোনো ব্যক্তি জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থানকে সমর্থন করলেও কিংবা বিভিন্ন বিষয়ে দলটিকে সহযোগিতা করলেও তিনি সরাসরি সাংগঠনিক দায়িত্বে যুক্ত হতে পারেন না।
দলীয় নেতাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই সীমাবদ্ধতার বাইরে থাকা অভিজ্ঞ ও পেশাগতভাবে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের জ্ঞান কাজে লাগানোর একটি উপায় হতে পারে উপদেষ্টা পরিষদ। এতে তাঁদের নিয়মিত সাংগঠনিক দায়িত্ব নিতে হবে না; বরং নির্দিষ্ট নীতি, রাজনৈতিক কৌশল, অর্থনীতি, প্রশাসন, কূটনীতি কিংবা রাষ্ট্র পরিচালনার মতো বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এসব দায়িত্ব কীভাবে নির্ধারিত হবে, তা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পরই স্পষ্ট হবে।
প্রস্তাবিত পরিষদে তুলনামূলক বয়োজ্যেষ্ঠ এবং নিজ নিজ ক্ষেত্রে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়ার চিন্তা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। সাবেক আমলাদের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, শিক্ষাবিদদের গবেষণা ও জ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণ, ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণা এবং অর্থনীতিবিদদের নীতিগত পরামর্শ দলটির সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক হতে পারে—এমন বিবেচনা থেকে বিভিন্ন পেশার মানুষকে যুক্ত করার কথা ভাবা হচ্ছে।
এ ছাড়া কূটনৈতিক বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদেরও পরিষদে রাখার প্রস্তাব রয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বৈদেশিক নীতি, বাণিজ্য ও বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে তাঁদের অভিজ্ঞতা রাজনৈতিক দলটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। একই সঙ্গে দলের শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্য থেকে সদস্য অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে। অন্য ধর্মাবলম্বীদের কাউকে উপদেষ্টা হিসেবে রাখার প্রস্তাবের বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন দলসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। তবে এসব প্রস্তাব এখনো চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি এবং সম্ভাব্য সদস্যদের নামও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের এক নেতার বক্তব্য অনুযায়ী, বিভিন্ন ক্ষেত্রে এমন অনেক প্রাজ্ঞ ব্যক্তি রয়েছেন, যাঁরা বিদ্যমান সাংগঠনিক পদ্ধতির কারণে সরাসরি দলের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন না। তাঁদের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ কাজে লাগানোর জন্য উপদেষ্টা পরিষদ একটি সুযোগ তৈরি করতে পারে। দলটি ভবিষ্যতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে নীতিনির্ধারণী ও প্রশাসনিক বিষয়ে এসব ব্যক্তির অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সম্ভাবনাও বিবেচনায় রয়েছে বলে তিনি জানান।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে জামায়াতের নীতিনির্ধারণী কার্যক্রমে পেশাগত বৈচিত্র্য বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে শুধু বিভিন্ন ক্ষেত্রের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করলেই একটি পরামর্শক কাঠামো কার্যকর হবে না। তাঁদের মতামত গ্রহণের পদ্ধতি, পরামর্শের বাস্তব প্রয়োগ, সিদ্ধান্ত গ্রহণে পরিষদের ভূমিকা এবং জবাবদিহির কাঠামো কীভাবে নির্ধারিত হবে, তার ওপরও উদ্যোগটির কার্যকারিতা নির্ভর করবে। এসব বিষয় দলীয় আলোচনায় কতটা গুরুত্ব পায়, তা পরিষদ গঠনের পর এর প্রকৃত ভূমিকা বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হবে।
উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের আলোচনা জামায়াতের বৃহত্তর সাংগঠনিক সংস্কারের উদ্যোগের সঙ্গেও সম্পর্কিত। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলটি নিজেদের সাংগঠনিক কাঠামো আরও কার্যকর করার লক্ষ্যে গঠনতন্ত্রে বিভিন্ন সংশোধনী আনার প্রক্রিয়া চালাচ্ছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। সর্বশেষ মজলিশে শুরার বৈঠকে উপদেষ্টা পরিষদের পাশাপাশি আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানো এবং সাংগঠনিক বিধানের কিছু অংশ পরিমার্জনের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
দলীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গঠনতন্ত্র সংশোধনের প্রস্তাবগুলো নির্ধারিত সাংগঠনিক প্রক্রিয়ায় পর্যালোচনা করা হচ্ছে। প্রথমে সংশোধনী কমিটি, এরপর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ এবং সবশেষে মজলিশে শুরায় এসব প্রস্তাব বিবেচনার জন্য নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে পর্যালোচনা ও চূড়ান্ত অনুমোদন সম্পন্ন হলে সংশোধিত বিধানগুলো দলীয় ওয়েবসাইটে প্রকাশ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া না করার বিষয়ে দলটির অবস্থান স্পষ্ট। সদস্য নির্বাচন থেকে শুরু করে দায়িত্বের পরিধি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে পরিষদের সম্পর্ক—সবকিছু নির্ধারণে আরও সময় নিতে চায় জামায়াত। শেষ পর্যন্ত প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে তা দলটির সাংগঠনিক কাঠামোয় নতুন একটি সংযোজন হবে। আর প্রস্তাবটি কীভাবে বাস্তবায়িত হয়, কারা এতে যুক্ত হন এবং তাঁদের পরামর্শ দলীয় নীতিনির্ধারণে কতটা প্রভাব ফেলে, তার ওপরই এই উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করবে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত