প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের সড়কে মোটরসাইকেল চলাচলের ক্ষেত্রে নতুন নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। এতদিন মোটরসাইকেলের পেছনে অনুমোদিত আরএফআইডি ট্যাগযুক্ত রেট্রো-রিফ্লেক্টিভ নম্বরপ্লেট থাকলেও এখন থেকে সামনের দিকেও ম্যানুয়াল নম্বরপ্লেট প্রদর্শন করতে হবে। এ জন্য মোটরসাইকেল মালিকদের নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে সংস্থাটি। আগামী ১৫ নভেম্বরের মধ্যে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় নির্ধারিত মাপ ও নকশা অনুসরণ করে সামনের নম্বরপ্লেট সংযোজন করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্দেশনা বাস্তবায়ন না করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে বিআরটিএ।
বিআরটিএর নতুন এই নির্দেশনা এমন সময়ে এসেছে, যখন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় মোটরসাইকেলের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে এবং সড়কে যানবাহন শনাক্তকরণ ও ট্রাফিক আইন প্রয়োগের বিষয়টি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে সামনের দিক থেকে চলন্ত মোটরসাইকেল শনাক্ত করার ক্ষেত্রে নম্বর দৃশ্যমান না থাকায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে নানা ধরনের সমস্যায় পড়তে হয়। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে মোটরসাইকেলকে সামনে ও পেছন—দুই দিক থেকেই শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ অনুযায়ী মোটরযানে রেজিস্ট্রেশন নম্বরপ্লেট সংযোজন ও প্রদর্শনের বিধান রয়েছে। একইভাবে সড়ক পরিবহন বিধিমালা, ২০২২-এর আওতায় মোটরযানে নির্ধারিত নম্বরপ্লেট ব্যবহারের ব্যবস্থা রয়েছে। বিআরটিএর প্রচলিত ব্যবস্থায় মোটরসাইকেলের পেছনে আরএফআইডি ট্যাগসহ রেট্রো-রিফ্লেক্টিভ নম্বরপ্লেট ব্যবহারের বিধান রয়েছে। এবার এর পাশাপাশি সামনে ম্যানুয়াল নম্বরপ্লেট প্রদর্শনের নির্দেশনা যুক্ত হলো। আইনেও মোটরযানের রেজিস্ট্রেশন নম্বরপ্লেট সংযোজন ও প্রদর্শনের বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, মোটরসাইকেলের সামনের নম্বরপ্লেট মোটরসাইকেল মালিকদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় তৈরি ও সংযোজন করতে হবে। তবে ইচ্ছেমতো আকার, রং বা নকশায় প্লেট তৈরি করার সুযোগ থাকছে না। বিআরটিএ নির্ধারিত মাপ, উপাদান, রং এবং অক্ষর-সংখ্যার ধরন অনুসরণ করেই নম্বরপ্লেট তৈরি করতে হবে।
স্কুটারের জন্য সামনের ম্যানুয়াল নম্বরপ্লেটের দৈর্ঘ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২০০ মিলিমিটার এবং প্রস্থ ১০০ মিলিমিটার। অন্যদিকে স্কুটার ছাড়া অন্যান্য মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে নম্বরপ্লেটের দৈর্ঘ্য হতে হবে ২৮৫ মিলিমিটার এবং প্রস্থ ৫০ মিলিমিটার। অর্থাৎ মোটরসাইকেলের ধরন অনুযায়ী প্লেটের আকৃতিতেও পার্থক্য থাকবে।
নম্বরপ্লেট তৈরির উপাদান নিয়েও নির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। সামনের ম্যানুয়াল নম্বরপ্লেট স্টেইনলেস স্টিল অথবা অ্যালুমিনিয়াম দিয়ে তৈরি করতে হবে। এর পটভূমি হবে সাদা এবং তার ওপর কালো রঙে বাংলা অক্ষর ও সংখ্যা লিখতে হবে। অক্ষর ও সংখ্যার ফন্টের উচ্চতা কমপক্ষে ২০ মিলিমিটার হতে হবে। ফলে দূর থেকে নম্বর সহজে শনাক্ত করা যায়—এমনভাবে প্লেটটি তৈরি ও স্থাপন করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া নম্বরপ্লেটে কোনো ধরনের অতিরিক্ত শোভাবর্ধন, নকশা বা অলংকার যোগ করা যাবে না। অনেক মোটরসাইকেলে মালিকেরা ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী বিভিন্ন স্টিকার, ডিজাইন, রঙিন অক্ষর বা আলংকারিক উপাদান ব্যবহার করেন। নতুন নির্দেশনার ক্ষেত্রে এ ধরনের পরিবর্তনের সুযোগ রাখা হয়নি। মূল উদ্দেশ্য হলো নম্বরকে স্পষ্ট, অভিন্ন এবং সহজে শনাক্তযোগ্য রাখা।
স্কুটার ছাড়া অন্যান্য মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশন নম্বর একটি আনুভূমিক রেখায় প্রদর্শনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ পুরো নিবন্ধন নম্বর একই লাইনে লেখা যাবে। উদাহরণ হিসেবে ‘ঢাকা মেট্রো-ল-১১-১২২৯’-এর মতো বিন্যাস ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে চলন্ত মোটরসাইকেলের সামনে থাকা নম্বর ক্যামেরা বা মানুষের চোখে তুলনামূলক সহজে ধরা পড়বে।
বিআরটিএর এ সিদ্ধান্তের পেছনে সড়ক নিরাপত্তা ও যানবাহন শনাক্তকরণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। এর আগে চলতি বছরের আগস্টে সামনে নম্বরপ্লেট বসানোর উদ্যোগের কথা প্রকাশ্যে আসে। তখন সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ক্যামেরার মাধ্যমে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারী মোটরসাইকেল শনাক্ত করার ক্ষেত্রে সামনের নম্বর দৃশ্যমান থাকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
বিশেষ করে কোনো মোটরসাইকেল ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করে সামনে দিয়ে চলে গেলে কিংবা সড়কে কোনো ধরনের আইন লঙ্ঘন করলে শুধু পেছনের নম্বরপ্লেটের ওপর নির্ভর করে সেটিকে শনাক্ত করা অনেক ক্ষেত্রে কঠিন হতে পারে। সামনের নম্বরপ্লেট থাকলে বিভিন্ন ক্যামেরা, বিশেষ করে স্বয়ংক্রিয় নম্বর শনাক্তকরণ প্রযুক্তির মাধ্যমে মোটরসাইকেল শনাক্ত করার সুযোগ বাড়তে পারে। এর ফলে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার আরও কার্যকর করার পথ তৈরি হতে পারে।
তবে নতুন নির্দেশনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মোটরসাইকেল মালিকদের জন্য কিছু বাস্তব সমস্যার বিষয়ও সামনে আসতে পারে। দেশের অনেক পুরোনো ও নতুন মোটরসাইকেলের সামনের অংশে কারখানাগতভাবে নম্বরপ্লেট বসানোর জন্য নির্দিষ্ট জায়গা রাখা হয়নি। ফলে মালিকদের নিজেদের ব্যবস্থাপনায় প্লেট বসানোর সময় সেটি কোথায় এবং কীভাবে স্থাপন করা হবে, তা নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ ভুল জায়গায় প্লেট বসালে হেডলাইট, স্টিয়ারিং, রেডিয়েটর বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অংশের কার্যকারিতায় প্রভাব পড়তে পারে—এমন আশঙ্কার কথাও এর আগে খাতসংশ্লিষ্টদের আলোচনায় এসেছে।
এ কারণে নির্ধারিত মাপের পাশাপাশি নিরাপদভাবে নম্বরপ্লেট সংযোজন করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মোটরসাইকেলের চালকের দৃষ্টিসীমা, স্টিয়ারিংয়ের চলাচল, হেডলাইটের আলো এবং ইঞ্জিনের প্রয়োজনীয় বাতাস চলাচলে যেন কোনো বাধা সৃষ্টি না হয়, সেদিকেও মালিকদের নজর দিতে হবে। একই সঙ্গে প্লেট এমনভাবে বসাতে হবে, যাতে সেটি সহজে খুলে ফেলা বা বাঁকিয়ে ফেলা না যায় এবং দূর থেকেও নম্বর পরিষ্কার দেখা যায়।
বিআরটিএর সার্ভিস পোর্টালে বর্তমানে মোটরযানের নম্বরপ্লেটসংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা ও তথ্যের ব্যবস্থা রয়েছে। অনুমোদিত নম্বরপ্লেট ব্যবস্থায় রেজিস্ট্রেশনসংক্রান্ত কাগজপত্র, ফি এবং নির্ধারিত প্রক্রিয়ার বিষয়গুলোও উল্লেখ করা আছে। তবে নতুন সামনের ম্যানুয়াল নম্বরপ্লেটের ক্ষেত্রে মালিকদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় নির্ধারিত মাপ ও শর্ত অনুসরণ করে প্লেট সংযোজনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নতুন এই সিদ্ধান্ত সাধারণ মোটরসাইকেল মালিকদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই কিছু প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে সামনের প্লেট কোথায় তৈরি করা যাবে, নির্ধারিত মাপ কীভাবে নিশ্চিত করা হবে এবং কোন ধরনের উপায়ে এটি মোটরসাইকেলে সংযোজন করা সবচেয়ে নিরাপদ—এসব বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি। নির্দেশনায় নির্ধারিত মাপ ও উপাদান স্পষ্ট করে দেওয়ায় মালিকদের এখন থেকে অননুমোদিত বা অতিরিক্ত নকশাযুক্ত প্লেট ব্যবহার না করে নির্ধারিত কাঠামো অনুসরণ করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সময়সীমা। আগামী ১৫ নভেম্বরের মধ্যে সংশ্লিষ্ট মোটরসাইকেলগুলোতে সামনের ম্যানুয়াল নম্বরপ্লেট সংযোজন করতে হবে। অর্থাৎ মালিকদের হাতে এখন সীমিত সময় রয়েছে। শেষ মুহূর্তে চাপ এড়াতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি আগেই সম্পন্ন করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পর যেসব মোটরসাইকেলে নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী নম্বরপ্লেট পাওয়া যাবে না, সেসব ক্ষেত্রে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে বিআরটিএ।
সড়কে মোটরসাইকেলের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার পাশাপাশি যানবাহন শনাক্তকরণ, ট্রাফিক আইন প্রয়োগ এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি কার্যকর করার ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্ত কতটা ফলপ্রসূ হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। একই সঙ্গে বাস্তবায়নের সময় মোটরসাইকেল মালিকদের নিরাপত্তা, যানটির কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য এবং প্লেট সংযোজনের বাস্তব সুবিধা-অসুবিধাগুলোও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন। নিয়ম মানার পাশাপাশি যেন নতুন কোনো নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি না হয়, সেটিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও মোটরসাইকেল মালিক—উভয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত