প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চাঁদাবাজি প্রতিরোধে বিদ্যমান ফৌজদারি আইন সংশোধন অথবা পৃথক নতুন আইন প্রণয়নের চিন্তাভাবনা করছে সরকার। চাঁদাবাজির শিকার ব্যক্তি ভয়ে মামলা করতে না চাইলেও পুলিশ যাতে নিজ উদ্যোগে মামলা করে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে, নতুন আইনি কাঠামোয় সেই সুযোগ রাখার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে চাঁদাবাজদের পেছনে থাকা গডফাদারদের শনাক্ত করতে বডি ক্যামেরার ব্যবহার, অপরাধের প্রমাণ হিসেবে অডিও-ভিডিও রেকর্ড সংরক্ষণ এবং পুনরাবৃত্ত অপরাধ ঠেকাতে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার বিষয়েও ভাবছে সরকার।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির গত ১৩ আগস্টের বৈঠকে সরকারের এই পরিকল্পনার কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দীন আহমদ। ওই বৈঠকের কার্যবিবরণীতে বিষয়গুলো উঠে আসে। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে আগের বৈঠকের কার্যবিবরণী উপস্থাপন করা হলে চাঁদাবাজি প্রতিরোধে সম্ভাব্য আইনি সংস্কারের বিষয়টি আবার সামনে আসে।
চাঁদাবাজি দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন, নির্মাণকাজ এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগের কারণ। অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসায়ী, দোকানমালিক, পরিবহনশ্রমিক কিংবা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা চাঁদার দাবির মুখে পড়লেও প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে চান না। ভয়ভীতি, প্রতিশোধের আশঙ্কা, ব্যবসায়িক ক্ষতি এবং স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী অপরাধীদের চাপ তাঁদের নীরব থাকতে বাধ্য করতে পারে। ফলে অপরাধের ঘটনা ঘটলেও সব ক্ষেত্রে তা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ বা মামলার মাধ্যমে পুলিশের নজরে আসে না। সরকার নতুন আইনি ব্যবস্থা বিবেচনা করছে মূলত এই ধরনের বাধা দূর করার লক্ষ্যেই।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, বিদ্যমান পেনাল কোড বা দণ্ডবিধির আইনি দুর্বলতা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধন অথবা নতুন আইন প্রণয়নের বিষয়ে চিন্তা করা হচ্ছে। এর ফলে ভুক্তভোগী সরাসরি মামলা করতে অনিচ্ছুক হলেও পুলিশ নিজে বাদী হয়ে অপরাধের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে পারবে—এমন ব্যবস্থা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত আইন প্রণয়ন, সংশোধনের সুনির্দিষ্ট ধারা কিংবা বাস্তবায়নের সময়সীমা সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টিকে আপাতত সরকারের পরিকল্পনা ও বিবেচনাধীন উদ্যোগ হিসেবেই দেখতে হবে।
চাঁদাবাজি দমনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বডি ক্যামেরা ব্যবহারের কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। চাঁদা আদায়কারী ব্যক্তি এবং তাঁদের পেছনে থাকা প্রভাবশালী সহযোগীদের শনাক্ত করতে এই প্রযুক্তি সহায়ক হতে পারে বলে মনে করছে সরকার। অভিযান বা দায়িত্ব পালনের সময় ধারণ করা অডিও-ভিডিও রেকর্ডের মাধ্যমে ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কথোপকথন এবং অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের ভূমিকা সম্পর্কে প্রমাণ সংগ্রহ করা সম্ভব হতে পারে।
এই রেকর্ড আদালতে গ্রহণযোগ্য সাক্ষ্য হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে। তবে অডিও-ভিডিও ফুটেজ আদালতে গ্রহণযোগ্য হবে কি না, তা নির্ভর করবে প্রযোজ্য আইন, প্রমাণের সত্যতা, রেকর্ডের অখণ্ডতা এবং আদালতের বিচারিক বিবেচনার ওপর। প্রযুক্তির ব্যবহার কার্যকর করতে হলে রেকর্ড সংরক্ষণ, অপব্যবহার প্রতিরোধ, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা এবং প্রমাণের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
শুধু চাঁদা আদায়কারী ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করেই অপরাধের পুরো চক্র ভাঙা সম্ভব নয়—এমন বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে তাঁদের পেছনে থাকা গডফাদারদের শনাক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ে চাঁদা সংগ্রহকারীরা অন্য কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নির্দেশে কাজ করে বলে অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের সত্যতা অনুসন্ধান করে অর্থের উৎস, নির্দেশদাতা, সহযোগী এবং অপরাধ থেকে লাভবান ব্যক্তিদের শনাক্ত করা গেলে অপরাধের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া সহজ হতে পারে। তবে এসব পদক্ষেপ কার্যকর করতে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং যথাযথ প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
চাঁদাবাজির পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে শাস্তির কাঠামো নিয়েও ভাবছে সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে সামান্য শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী কঠোর সাজা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আইনি সংস্কারের চিন্তাভাবনা রয়েছে। অপরাধীরা যেন অল্প শাস্তি পেয়ে বা জামিনে মুক্ত হয়ে আবার একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়তে না পারে, সেটিও সরকারের বিবেচনায় রয়েছে। তবে জামিন পাওয়া নিজেই অপরাধের প্রমাণ নয়; আইনি প্রক্রিয়ায় অভিযুক্তের অধিকার এবং অপরাধের পুনরাবৃত্তি প্রতিরোধ—দুই বিষয়েই ভারসাম্য বজায় রাখা প্রয়োজন।
বৃহস্পতিবারের সংসদীয় কমিটির বৈঠকে শুধু চাঁদাবাজি নয়, সারা দেশে ছিনতাই, কিশোর গ্যাং, মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও সংঘবদ্ধ অপরাধ প্রতিরোধে সরকারের কার্যক্রম নিয়েও আলোচনা হয়। বৈঠকে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে বিতর্কিত ভূমিকার অভিযোগে পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া বিভাগীয় ব্যবস্থার তথ্যও উপস্থাপন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পলায়নের অভিযোগে বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের ৬২ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৩১ জনের বিরুদ্ধে গুরুদণ্ড দেওয়া হয়েছে বা চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। বাকি ৩১ জনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
গণ-অভ্যুত্থানকেন্দ্রিক বিভিন্ন ঘটনায় পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার বা এএসপি থেকে তদূর্ধ্ব পদমর্যাদার ১৪৭ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পুলিশ পরিদর্শক পদমর্যাদার ৭৩ কর্মকর্তাকে জনস্বার্থে অবসর দেওয়া হয়েছে। অন্যান্য পুলিশ পরিদর্শকের বিষয়ে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) মামলার রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে এএসপি থেকে ঊর্ধ্বতন পদমর্যাদার ১৩ কর্মকর্তার মধ্যে পাঁচজনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। বাকি আটজনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চলছে। এ ছাড়া গণ-অভ্যুত্থানকেন্দ্রিক বিভিন্ন ফৌজদারি, সিআর ও আইসিটি মামলায় গ্রেপ্তার ২৯ পুলিশ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তারের তারিখ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ডিআইজি পদমর্যাদার দুজনকে জনস্বার্থে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠকে অপরাধের পরিসংখ্যানও তুলে ধরা হয়। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে দায়ের হওয়া বিভিন্ন অপরাধের মামলার সঙ্গে গত বছরের একই সময়ের তুলনা করা হয়েছে। উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ধর্ষণ, মাদকদ্রব্য-সংক্রান্ত অপরাধ, সিঁধেল চুরি ও সাধারণ চুরির ঘটনায় মামলা বেড়েছে। অন্যদিকে খুন, ডাকাতি, দস্যুতা এবং নারী নির্যাতনের অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলার সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় কমেছে। পুলিশ আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাও কিছুটা কমেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে মামলা বাড়া বা কমার পরিসংখ্যান দিয়ে এককভাবে অপরাধের প্রকৃত প্রবণতা নির্ধারণ করা যায় না। অভিযোগ জানানোর হার, মামলা গ্রহণের প্রক্রিয়া, তদন্তের অগ্রগতি এবং অপরাধের ধরনও সামগ্রিক পরিস্থিতি মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ। সংসদ সচিবালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে অবশ্য বৈঠকে উপস্থাপিত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতির কথা জানানো হয়েছে। কমিটির সদস্যরাও এ বিষয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ রয়েছে।
বৈঠকে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, সাইবার অপরাধ দমনে পৃথক সাইবার পুলিশ ইউনিট গঠন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়েও আলোচনা হয়। সংসদীয় কমিটি অপরাধ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহারের সুপারিশ করেছে। রাজধানীর সাম্প্রতিক অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ে কমিটির সদস্য মো. নূরুল ইসলাম পদক্ষেপের অগ্রগতি জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রম তুলে ধরেন।
এদিকে ১৩ আগস্টের বৈঠকের কার্যবিবরণী অনুযায়ী, মাদকাসক্তি প্রতিরোধ নিয়েও আলোচনা হয়েছিল। পুলিশের মহাপরিদর্শক মো. আলী হোসেন ফকির সেখানে বেকারত্বকে যুবসমাজের মাদকাসক্তির অন্যতম ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করেন। মেডিকেল ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে রাত জেগে পড়াশোনার প্রলোভন দেখিয়ে শিক্ষার্থীদের ইয়াবায় অভ্যস্ত করার অভিযোগও তিনি তুলে ধরেন। এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই করে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। মাদক প্রতিরোধে সচেতনতামূলক ও উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত বৃহস্পতিবারের বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন। বৈঠকে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ এবং কমিটির সদস্য মনোয়ার হোসেন, শিরীন সুলতানা, মো. নূরুল ইসলাম ও মো. আব্দুল বাতেনসহ সংশ্লিষ্টরা অংশ নেন।
চাঁদাবাজি প্রতিরোধে নতুন আইন বা বিদ্যমান আইনের সংশোধন বাস্তবায়িত হলে অভিযোগ করতে ভয় পাওয়া ভুক্তভোগীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে আইন প্রণয়নের পাশাপাশি নিরপেক্ষ তদন্ত, দ্রুত বিচার, সাক্ষীর নিরাপত্তা, অপরাধের প্রমাণ সংরক্ষণ এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সমানভাবে আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করাও জরুরি। কারণ চাঁদাবাজি বন্ধের সাফল্য শুধু গ্রেপ্তার বা শাস্তির সংখ্যায় নয়, বরং সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদে ব্যবসা করতে পারছেন, ভুক্তভোগীরা কতটা নির্ভয়ে অভিযোগ জানাতে পারছেন এবং অপরাধের পুনরাবৃত্তি কতটা কমছে—তার ওপরই নির্ভর করবে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত