সৌদিগামী ফ্লাইট বাতিলে বিপাকে হাজারো প্রবাসী

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৩ বার
সৌদিগামী ফ্লাইট বাতিলে বিপাকে হাজারো প্রবাসী

প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির প্রভাবে সৌদি আরবগামী একের পর এক ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন হাজারো প্রবাসী বাংলাদেশি। দেশে ছুটি কাটিয়ে কর্মস্থলে ফেরার অপেক্ষায় থাকা শ্রমিকদের অনেকেই সময়মতো সৌদি আরবে পৌঁছাতে না পেরে চাকরি হারানো, ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়া এবং নিয়োগকর্তার চাপের আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। অন্যদিকে বিকল্প ফ্লাইটে যাত্রা নিশ্চিত করতে গিয়ে বাড়তি টিকিটের খরচ, ঢাকায় হোটেলে থাকা-খাওয়া এবং যাতায়াত ব্যয় মেটাতে গিয়ে অনেকের সঞ্চয় ফুরিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে যাত্রীদের দুর্ভোগের পাশাপাশি আর্থিক চাপে পড়েছে দেশের বিমান পরিবহন খাতও।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের বিমানবন্দরে হামলার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি ও ট্রানজিট রুটে চলাচলকারী মোট ১০৩টি ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত হয়েছে। এসব ফ্লাইটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ১৫ হাজার ৭৭৯ জন যাত্রী ভোগান্তিতে পড়েছেন। বাতিল হওয়া ফ্লাইটের মধ্যে ৪২টি সরাসরি এবং ৬১টি ট্রানজিট ফ্লাইট। ফলে শুধু সৌদি আরবগামী যাত্রী নয়, মধ্যপ্রাচ্য হয়ে অন্য গন্তব্যে যাওয়ার পরিকল্পনা করা যাত্রীরাও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। বিমান সংস্থাগুলো নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বিভিন্ন রুটে ফ্লাইট স্থগিত রাখায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে যাত্রীদের।

এই অনিশ্চয়তার বাস্তব চিত্র দেখা যাচ্ছে প্রবাসীদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায়। নোয়াখালীর সেনবাগের বাসিন্দা নূরুল ইসলাম প্রায় ২০ বছর ধরে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে বসবাস করছেন। সাধারণত দুই বছর পরপর এক মাসের ছুটিতে দেশে আসেন তিনি। এবারও গত ১২ সেপ্টেম্বর দেশে এসে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটানোর পর বৃহস্পতিবার সৌদি আরবে ফেরার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু নির্ধারিত ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় বিকল্প যাত্রার ব্যবস্থা করতে ঢাকায় আসেন তিনি। রিয়াদগামী ফ্লাইটের নিশ্চয়তা না পেয়ে দাম্মাম বা জেদ্দা হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও খোঁজ করেন। শেষ পর্যন্ত দুদিন পর মদিনাগামী একটি ফ্লাইটে টিকিট পরিবর্তন করতে বাধ্য হন।

এতে তাঁর অতিরিক্ত টিকিট খরচ হয়েছে প্রায় ১৬ হাজার টাকা। স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় আরও দুদিন অবস্থান করার কারণে হোটেল ও খাবারের জন্য গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটিয়ে কর্মস্থলে ফেরার যে পরিকল্পনা ছিল, তা এখন বাড়তি ব্যয় ও অনিশ্চয়তায় রূপ নিয়েছে। নূরুল ইসলামের মতো কিছু প্রবাসীর পক্ষে এই ব্যয় বহন করা সম্ভব হলেও অনেক শ্রমজীবী মানুষের জন্য এমন অতিরিক্ত খরচ বড় আর্থিক সংকট তৈরি করতে পারে।

চাঁদপুরের আবু তালেবের উদ্বেগ আরও গভীর। তাঁর ভিসার মেয়াদ ২০ অক্টোবর শেষ হওয়ার কথা। এর মধ্যে সৌদি আরবে প্রবেশ করতে না পারলে কর্মস্থলে ফেরার সুযোগ হারানোর আশঙ্কা করছেন তিনি। সে কারণে বাড়তি অর্থ ব্যয় করেও বিকল্প পথে সৌদি আরবে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। প্রবাসী কর্মীদের ক্ষেত্রে ভিসার মেয়াদ, ইকামা, ছুটির সময়সীমা এবং নিয়োগকর্তার অনুমতির মতো বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে ফিরতে না পারলে তাঁদের চাকরি, আয় এবং পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। অনেকের কাছে এই যাত্রা কেবল বিদেশে ফেরার বিষয় নয়; বরং পরিবারের নিয়মিত খরচ, ঋণ পরিশোধ এবং দেশে থাকা স্বজনদের জীবনযাত্রা সচল রাখার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

বেবিচকের তথ্যমতে, বাতিল বা স্থগিত হওয়া সরাসরি ফ্লাইটগুলোর মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ১৭টি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের ১০টি, সৌদিয়া এয়ারলাইনসের আটটি এবং রিয়াদ এয়ারের সাতটি ফ্লাইট রয়েছে। ট্রানজিট ফ্লাইটের তালিকায় ইন্ডিগোর ২২টি, এমিরেটসের ১৪টি, কাতার এয়ারওয়েজের আটটি, সালাম এয়ারের সাতটি, ফ্লাইদুবাইয়ের ছয়টি, এয়ার ইন্ডিয়ার তিনটি এবং ইজিপ্ট এয়ারের একটি ফ্লাইট রয়েছে। এসব ফ্লাইট বাতিলের ফলে যাত্রীদের যাত্রাপথ পরিবর্তন, টিকিট পুনর্নির্ধারণ এবং অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়েছে।

নিরাপত্তার উদ্বেগের কারণে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা থেকে রিয়াদ ও দাম্মামগামী সব ফ্লাইট স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। অন্যদিকে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস ২১ অক্টোবর পর্যন্ত রিয়াদগামী সব ফ্লাইট বাতিল করেছে। পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এসব সিদ্ধান্তে সংশোধন আসতে পারে। তাই যাত্রীদের জন্য ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। তবে ফ্লাইট বাতিলের খবর যথাসময়ে না পাওয়া বা বিকল্প যাত্রার বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকলে বিমানবন্দরে এসে আরও বিপাকে পড়তে পারেন তাঁরা।

একই সঙ্গে ফ্লাইট বাতিলের আর্থিক প্রভাব পড়ছে বিমান পরিবহন সংস্থাগুলোর ওপর। খাতসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে শুরু হওয়া ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ঘিরে সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে আগে থেকেই চাপ তৈরি হয়েছিল। মধ্যপ্রাচ্যের রুটের ওপর বাংলাদেশি বিমান সংস্থাগুলোর উল্লেখযোগ্য নির্ভরতা থাকায় ওই অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি তাদের ব্যবসায় সরাসরি প্রভাব ফেলছে। একের পর এক ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় টিকিট বিক্রি, যাত্রী পরিবহন এবং আয় সংগ্রহে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। পাশাপাশি যাত্রীদের বিকল্প ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করা, টিকিটের তারিখ পরিবর্তন এবং পরিচালনাগত পরিকল্পনা নতুন করে সাজানোর প্রয়োজন দেখা দিচ্ছে।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ফ্লাইট বাতিলের কারণে সংস্থাটি আর্থিক চাপে পড়েছে। কিছু ক্ষেত্রে বিকল্প পথে যাত্রী পাঠানোর ব্যবস্থা করা হলেও তাতে ক্ষতি পুরোপুরি এড়ানো যাচ্ছে না। ফলে এই সংকটের প্রভাব শুধু যাত্রীদের ওপর সীমাবদ্ধ থাকছে না; বিমান সংস্থার পরিচালনাগত কার্যক্রম ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের ওপরও চাপ বাড়ছে।

যাত্রীদের দুর্ভোগ কমাতে বেবিচক বিমান সংস্থাগুলোকে যোগাযোগ ও তথ্য সরবরাহের বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো ফ্লাইট বাতিল, বিলম্বিত বা সময়সূচি পরিবর্তিত হলে এসএমএস, ফোনকল, ই-মেইল, ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে দ্রুত যাত্রীদের জানাতে হবে। টিকিটের নতুন তারিখ, সময় পরিবর্তন, অর্থ ফেরত এবং বিকল্প যাত্রার নিয়ম সম্পর্কে পরিষ্কার তথ্য দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। ফ্লাইট নিশ্চিত না হলে যাত্রীদের বিমানবন্দরে আসতে না বলার নির্দেশনাও রয়েছে। যেসব প্রবাসীর ভিসা বা অভিবাসনসংক্রান্ত কাগজপত্রের মেয়াদ বাড়ানো প্রয়োজন, তাঁদের সৌদি কর্তৃপক্ষ, ঢাকায় অবস্থিত সৌদি দূতাবাস ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগে সহায়তা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। তবে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বাস্তবে প্রয়োজনীয় তথ্য ও সহায়তা সব ক্ষেত্রে পাওয়া যাচ্ছে না।

এদিকে দেশের বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও উন্নত করার জন্য সরকার আট সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে। কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে। কমিটিতে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী, বিমানবাহিনী প্রধান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং পুলিশ মহাপরিদর্শক সদস্য হিসেবে থাকছেন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব সদস্য-সচিবের দায়িত্ব পালন করবেন। কমিটি প্রয়োজন অনুযায়ী সভা করতে পারবে এবং প্রয়োজন হলে নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করা যাবে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় কমিটিকে সাচিবিক সহায়তা দেবে। আগামী দুই মাসের মধ্যে সরকারের কাছে সুপারিশ জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিমানবন্দরগুলোর বর্তমান নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় উন্নয়নের সুপারিশ প্রণয়ন করাই কমিটির মূল দায়িত্ব।

সৌদি আরবগামী ফ্লাইট সংকটের পেছনে ইয়েমেনের সংঘাতও নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। দেশটিতে হুথি যোদ্ধা ও সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর মধ্যে লড়াই তীব্র হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের তাইজ শহরে সংঘর্ষ, গোলাবর্ষণ এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়ক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। খাদ্য, পানি, জ্বালানি ও ওষুধের সরবরাহে সংকট বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে শহরটির প্রায় ছয় লাখ বাসিন্দার মধ্যে আনুমানিক ৮০ হাজার মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সংঘাতের দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে হতাহত ও নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকার তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন।

সরকারি বাহিনী হুথিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছে বলে জানা গেছে। বাব আল-মানদেব প্রণালির আশপাশের সংঘর্ষও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহন নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। লোহিত সাগর ও আশপাশের নৌপথ বৈশ্বিক পণ্য পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় সেখানে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে তার প্রভাব আঞ্চলিক অর্থনীতির বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং বিমান চলাচলের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। তবে সংঘাতের বিভিন্ন পক্ষের দাবি ও হামলার তথ্য যাচাই ছাড়া নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়।

সব মিলিয়ে ফ্লাইট বাতিলের সংকট বাংলাদেশের প্রবাসী কর্মী, তাঁদের পরিবার এবং বিমান পরিবহন খাত—তিন ক্ষেত্রেই চাপ তৈরি করেছে। যাত্রীদের জন্য দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য, টিকিট পরিবর্তন বা অর্থ ফেরতের স্বচ্ছ ব্যবস্থা এবং ভিসার মেয়াদসংক্রান্ত সমস্যায় কার্যকর সহায়তা এখন সবচেয়ে জরুরি। একই সঙ্গে বিমান সংস্থাগুলোর আর্থিক ক্ষতি কমানো এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় দায়িত্বশীলভাবে ফ্লাইট পরিচালনা করাও গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত যাত্রীদের ভোগান্তি কতটা দীর্ঘ হবে, তা অনিশ্চিত। এই অবস্থায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও বিমান সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগই প্রবাসীদের অনিশ্চয়তা ও বাড়তি আর্থিক ক্ষতি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com