দুর্নীতি-অনিয়মে কঠোর সরকার, নজরদারিতে জনগণ

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৪ বার
দুর্নীতি-অনিয়মে কঠোর সরকার, নজরদারিতে জনগণ

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দুর্নীতি, অনিয়ম ও সরকারি অর্থের অপব্যবহারের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেছেন, উন্নয়নকাজে কোনো ধরনের কমিশন বাণিজ্যের সুযোগ দেওয়া হবে না। জনগণের করের অর্থে যে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়, সেই অর্থের প্রতিটি অংশ যথাযথভাবে ব্যয় হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা সরকারের পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদেরও দায়িত্ব।

শুক্রবার রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশে (আইইবি) ঢাকাস্থ শৈলকূপা উপজেলার ৩ নম্বর দিগনগর ইউনিয়ন কল্যাণ সংস্থার বার্ষিক সাধারণ সভা-২০২৬ অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন আইনমন্ত্রী। অনুষ্ঠানে তিনি উন্নয়নকাজের গুণগত মান, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, মাদক ও অপরাধ দমন এবং স্থানীয় পর্যায়ে নাগরিকদের দায়িত্বশীল ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

আইনমন্ত্রী বলেন, একটি এলাকার উন্নয়নের জন্য সরকার বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করে এবং এসব প্রকল্পে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই অর্থ জনগণের কর থেকে আসে। ফলে সরকারি অর্থে বাস্তবায়িত কোনো প্রকল্পে অনিয়ম, দুর্নীতি বা নিম্নমানের কাজ হলে তা শুধু সরকারের সম্পদের ক্ষতি নয়, একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের অধিকার ও প্রত্যাশারও ক্ষতি।

তিনি উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ যথাযথভাবে হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে স্থানীয় জনগণকে নজরদারি করার আহ্বান জানান। কোথাও অনিয়ম বা দুর্নীতির ঘটনা চোখে পড়লে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তার মতে, জনপ্রতিনিধি বা প্রশাসনের একার পক্ষে একটি এলাকার প্রতিটি উন্নয়নকাজের মান ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে সচেতন নাগরিক, সামাজিক সংগঠন এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, কোনো সড়ক, সেতু কিংবা অবকাঠামো নির্মাণে নিম্নমানের কাজ হলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে হবে। জনগণের অর্থে নির্মিত অবকাঠামোর স্থায়িত্ব ও গুণগত মান নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। উন্নয়ন প্রকল্প শেষ হওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যে যদি সড়ক ভেঙে যায়, স্থাপনায় ত্রুটি দেখা দেয় কিংবা নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার ধরা পড়ে, তাহলে এর পেছনে থাকা অনিয়মের জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলেও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

বর্তমান সময়ে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বিস্তারের সঙ্গে সরকারি ব্যয়ের পরিমাণও বাড়ছে। সড়ক, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতে নেওয়া প্রকল্প মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই এসব প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে উন্নয়নের সুফল কাঙ্ক্ষিত মানুষের কাছে পুরোপুরি পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে এ বিষয়টিরই গুরুত্ব উঠে আসে।

তিনি প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা এবং অনিয়মের সুযোগ কমাতে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন। এর অংশ হিসেবে ঢাকা শহরে সাব-রেজিস্ট্রার বদলির ক্ষেত্রে লটারি পদ্ধতি চালু করার কথা উল্লেখ করেন তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বদলি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং এ বিষয়ে মানুষের মধ্যে বিদ্যমান নেতিবাচক ধারণা দূর করাই এই পদ্ধতি চালুর অন্যতম উদ্দেশ্য।

প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার বিষয়টি সাধারণ মানুষের আস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। কোনো সরকারি কর্মকর্তা কোথায় দায়িত্ব পালন করবেন, কীভাবে বদলি হবেন কিংবা প্রশাসনিক সুযোগ-সুবিধা কীভাবে বণ্টিত হবে—এসব প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে পুরো ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে এ ধরনের প্রক্রিয়ায় নিয়ম ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান নিয়েও কথা বলেন আইনমন্ত্রী। তিনি জানান, শৈলকূপায় মাদকের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। অপরাধের ক্ষেত্রে ব্যক্তির দলীয় পরিচয়, সামাজিক প্রভাব কিংবা অন্য কোনো পরিচয় বিবেচনায় না নিয়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি।

আইনমন্ত্রী বলেন, মাদকসংক্রান্ত অপরাধ কিংবা অন্য কোনো অপরাধে জড়িত ব্যক্তির পক্ষে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে তদবির করা গ্রহণযোগ্য নয়। অপরাধী যে পরিচয়েরই হোক না কেন, আইনের আওতায় তাকে জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে। অপরাধ দমনে আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে সমাজে অপরাধপ্রবণতা কমানোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থাও বাড়বে।

তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট এবং সংঘবদ্ধভাবে মানুষকে হেনস্তা করার মতো কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধেও অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান। তার বক্তব্যে একই সঙ্গে অন্যায়ের শিকার মানুষের সুরক্ষা এবং অপরাধ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থানের বিষয়টি উঠে আসে।

আইনমন্ত্রী বলেন, কেউ যেন অন্যায়ের শিকার না হন, সেটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্র ও সমাজের সবার। একই সঙ্গে কোনো ধরনের অপরাধ বা দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। অন্যায়কারীর রাজনৈতিক, সামাজিক কিংবা ব্যক্তিগত প্রভাবের কারণে যদি আইনের প্রয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে ন্যায়বিচার ও সুশাসনের লক্ষ্য ব্যাহত হতে পারে। এ কারণে অপরাধের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ও আইনভিত্তিক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।

শৈলকূপার উন্নয়ন প্রসঙ্গেও অনুষ্ঠানে বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন আইনমন্ত্রী। তিনি জানান, উপজেলার দিগনগর ইউনিয়নসহ বিভিন্ন এলাকায় সড়ক উন্নয়নকাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) সড়ক তালিকায় সম্প্রতি শৈলকূপার আরও প্রায় ৩৯৫টি সড়ক অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এসব সড়কের উন্নয়ন কার্যক্রম ধাপে ধাপে এগিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরে উপজেলার সড়ক যোগাযোগব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।

গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন একটি এলাকার অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ভালো সড়ক থাকলে কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারে পৌঁছানো সহজ হয়, শিক্ষার্থী ও রোগীদের যাতায়াতের সময় কমে এবং স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগও বাড়ে। ফলে নতুন সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের পাশাপাশি সেগুলোর গুণগত মান নিশ্চিত করার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে উন্নয়ন এবং জবাবদিহির এই দুই দিকই গুরুত্ব পেয়েছে।

স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়নকাজের তদারকিতে জনগণের অংশগ্রহণের আহ্বানও এ কারণে তাৎপর্যপূর্ণ। সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি প্রকল্প এলাকার বাসিন্দারাই নির্মাণকাজের বাস্তব চিত্র সবচেয়ে কাছ থেকে দেখতে পারেন। কোনো প্রকল্পে কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন থাকলে কিংবা বরাদ্দ অনুযায়ী কাজ না হলে স্থানীয় জনগণের পক্ষ থেকে অভিযোগ ও তথ্য তুলে ধরা হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য বিষয়টি যাচাই করা সহজ হতে পারে।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ঢাকায় শৈলকূপা উপজেলার ৩ নম্বর দিগনগর ইউনিয়ন কল্যাণ সংস্থার সভাপতি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা জেড এ ওয়াহেদ। অনুষ্ঠানে সাবেক সচিব খন্দকার শহিদুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও অতিথিরা বক্তব্য দেন।

আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে উন্নয়ন, সুশাসন, দুর্নীতি দমন ও আইনের শাসনের বিষয়গুলো একই সূত্রে উঠে এসেছে। সরকারি প্রকল্পে কমিশন বাণিজ্য বন্ধ করা থেকে শুরু করে নিম্নমানের কাজের বিরুদ্ধে অভিযোগ, প্রশাসনিক বদলি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং অপরাধে রাজনৈতিক প্রভাবের ব্যবহার বন্ধ—সব ক্ষেত্রেই জবাবদিহিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়; এর সঙ্গে প্রয়োজন প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, নিয়মিত নজরদারি, তথ্যের সহজপ্রাপ্যতা এবং নাগরিক অংশগ্রহণ। সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হলে উন্নয়ন প্রকল্পের সুফল দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থাও বাড়ে।

সবশেষে আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে যে বিষয়টি বিশেষভাবে সামনে এসেছে তা হলো—উন্নয়ন ও সুশাসন নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু সরকারের একার নয়। সরকারি প্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ নাগরিক—প্রত্যেকের দায়িত্বশীল ভূমিকা থাকলে দুর্নীতি ও অনিয়মের সুযোগ কমানো সম্ভব। জনগণের অর্থে পরিচালিত উন্নয়নকাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার এই সম্মিলিত প্রচেষ্টাই একটি কার্যকর ও জনবান্ধব প্রশাসনিক ব্যবস্থার ভিত্তি শক্তিশালী করতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com