প্রধানমন্ত্রীর এক ক্লিকেই ৩৯ হাজার কৃষকের হাতে ১২ কোটি টাকা

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৮ বার
প্রধানমন্ত্রীর এক ক্লিকেই ৩৯ হাজার কৃষকের হাতে ১২ কোটি টাকা

প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজশাহীতে জনসভায় যোগ দিয়ে আখচাষিদের জন্য সরকারি প্রণোদনা বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) বিকেলে নগরের ঐতিহাসিক মাদরাসা মাঠে আয়োজিত জনসভার মঞ্চে বসেই ল্যাপটপের একটি বোতামে চাপ দিয়ে প্রায় ৩৯ হাজার আখচাষির জন্য ১২ কোটি টাকার প্রণোদনা বিতরণ কার্যক্রমের সূচনা করেন তিনি। উদ্বোধনের পরপরই নির্ধারিত কৃষকদের ব্যাংক হিসাবে অর্থ জমা হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। অনেক কৃষক মুঠোফোনে খুদে বার্তার মাধ্যমে অর্থ পাওয়ার খবরও জানতে পারেন।

সরকারি সহায়তার এই অর্থ সরাসরি কৃষকের ব্যাংক হিসাবে পৌঁছানোর উদ্যোগকে কৃষকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সহায়তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে আখ চাষের সঙ্গে যুক্ত কৃষকদের উৎপাদন ব্যয়, শ্রমিকের মজুরি, সার-বীজ ও অন্যান্য কৃষি উপকরণের ব্যয় যখন তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে, তখন প্রণোদনার অর্থ তাদের চাষাবাদ চালিয়ে যেতে কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে। মাঠপর্যায়ের কৃষকদের কাছে সরকারি সহায়তা দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ডিজিটাল ব্যবস্থার ব্যবহারও এ কার্যক্রমে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

প্রণোদনা বিতরণ কার্যক্রমের প্রথম পর্বে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৩৮ হাজার ৯৭০ জন কৃষককে ১২ কোটি টাকা প্রণোদনা দেওয়া হলো। পরে দেশের ১৫টি চিনিকল এলাকার ১৫ জন আখচাষির হাতে প্রতীকী চেক তুলে দেওয়া হয়। প্রতীকী এই চেক হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে বৃহত্তর পরিসরে কৃষকদের কাছে সরকারি প্রণোদনা পৌঁছানোর কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়।

একটি কৃষি পরিবারের জন্য উৎপাদন মৌসুমে অর্থের প্রবাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জমি প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে চাষাবাদ, পরিচর্যা, শ্রমিক নিয়োগ, পরিবহন এবং ফসল বিক্রি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই কৃষককে অর্থ ব্যয় করতে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচের সঙ্গে বাজার পরিস্থিতির অনিশ্চয়তাও যুক্ত হয়। ফলে সময়মতো সরকারি সহায়তা পাওয়া গেলে কৃষকের ওপর থাকা আর্থিক চাপ কিছুটা কমতে পারে এবং পরবর্তী মৌসুমের প্রস্তুতিতেও তা ভূমিকা রাখতে পারে।

রাজশাহীতে প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবার দিনভর নগরজুড়ে ছিল ব্যস্ততা। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটাই ছিল তার প্রথম রাজশাহী সফর। বিকেল ৩টার দিকে তিনি রাজশাহীর শাহ মখদুম বিমানবন্দরে পৌঁছান। নির্ধারিত সময়ের তুলনায় কিছুটা দেরিতে পৌঁছানোর কারণে সফরসূচিতে পরিবর্তন আনা হয়। বিমানবন্দর থেকে সরাসরি তিনি নগরের ঐতিহাসিক মাদরাসা মাঠে আয়োজিত জনসভাস্থলের উদ্দেশে রওনা হন। বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে তিনি সেখানে পৌঁছান।

সফরসূচির পরিবর্তনের কারণে নগরীর গণকপাড়ায় রাজশাহী ধর্মসভা মন্দির পরিদর্শন এবং সার্কিট হাউসে মধ্যাহ্নবিরতির কর্মসূচি বাদ দেওয়া হয়। এরপর জনসভাস্থলে পৌঁছে কৃষকদের জন্য প্রণোদনা বিতরণ কার্যক্রম উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। প্রণোদনা কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর জনসভার দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয়। সেখানে বিএনপির সংসদ সদস্য এবং দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা বক্তব্য দেন। পরে প্রধান অতিথি হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য দেওয়ার কথা ছিল।

প্রধানমন্ত্রীর রাজশাহী সফরকে কেন্দ্র করে কয়েক দিন ধরেই নগরীতে ব্যাপক প্রস্তুতি চলছিল। বিমানবন্দর থেকে প্রধানমন্ত্রীর যাতায়াতের সম্ভাব্য পথসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে সংস্কার, পিচ ঢালাই ও রং করার কাজ করা হয়। বিভিন্ন স্থানে দেয়ালে চিত্র আঁকা হয়, ড্রেন সংস্কার ও পরিষ্কার করা হয়। ফুটপাত থেকে হকারদের সরিয়ে যাতায়াতের পথ পরিচ্ছন্ন রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়। জনসভাস্থল মাদরাসা মাঠেও নেওয়া হয় নানা প্রস্তুতি। মাঠের উঁচু-নিচু জায়গা সমান করা এবং বড় মঞ্চ তৈরির কাজ করা হয়।

জনসভাকে ঘিরে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যেও ছিল ব্যাপক প্রস্তুতি। গত কয়েক দিন ধরে দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা মাঠে উপস্থিত থেকে প্রস্তুতির কাজ তদারকি করেন। জনসভা বিকেলে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও সকাল থেকেই রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকা থেকে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। বিভিন্ন এলাকা থেকে মিছিল নিয়ে তারা জনসভাস্থলের দিকে আসতে থাকেন। দুপুরের আগেই নগরের বিভিন্ন সড়কে মানুষের উপস্থিতি চোখে পড়ে।

দুপুর আড়াইটার দিকে জনসভাস্থল নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে পূর্ণ হয়ে যায়। মঞ্চে তখন বিএনপির জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের নেতারা বক্তব্য দিচ্ছিলেন। জনসভাকে কেন্দ্র করে নগরীর রাজনৈতিক পরিবেশও ছিল সরব। দলের নেতাকে স্বাগত জানাতে বিভিন্ন স্থান থেকে আসা মানুষের উপস্থিতিতে মাদরাসা মাঠ ও আশপাশের এলাকায় তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।

শুধু জনসভাস্থলেই নয়, প্রধানমন্ত্রীর যাতায়াতের পথের বিভিন্ন জায়গাতেও মানুষের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়কের দুই পাশে সকাল থেকেই অনেকে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন। তাদের হাতে ছিল জাতীয় ও দলীয় পতাকা। অনেকেই দূর থেকে প্রধানমন্ত্রীকে একনজর দেখার আশায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেন। কেউ এসেছিলেন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে, কেউ আবার স্থানীয়ভাবে দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নিতে। প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর যাওয়ার সময় সড়কের দুই পাশে অপেক্ষমাণ মানুষের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা যায়।

রাজশাহী সফরের আগে মঙ্গলবার সকালে প্রধানমন্ত্রী রংপুরে রাধা গোবিন্দ মন্দির পরিদর্শন করেন। সেখানে আয়োজিত একটি পথসভাতেও তিনি বক্তব্য দেন। এরপর রাজশাহীর উদ্দেশে যাত্রা করেন তিনি। রাজশাহী সফর শেষে সামরিক বিমানে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা ছিল তার।

তবে রাজশিয়া সফরের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশগুলোর একটি হয়ে ওঠে আখচাষিদের প্রণোদনা বিতরণ কার্যক্রম। একটি আনুষ্ঠানিক বোতাম চাপার মাধ্যমে হাজার হাজার কৃষকের ব্যাংক হিসাবে সরকারি অর্থ পৌঁছানোর উদ্যোগ কৃষকদের সঙ্গে সরকারি সহায়তা ব্যবস্থার ডিজিটাল সংযোগের একটি দিক তুলে ধরে। এতে একদিকে যেমন সরাসরি অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে কৃষকের কাছে সহায়তা পৌঁছানোর প্রক্রিয়াও তুলনামূলকভাবে দ্রুত করার লক্ষ্য স্পষ্ট হয়েছে।

কৃষকদের জন্য ১২ কোটি টাকার এই প্রণোদনা কেবল একটি সরকারি অর্থ সহায়তার হিসাব নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য পরিবারের কৃষিনির্ভর জীবন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। আখ চাষের মাধ্যমে যেসব পরিবার তাদের জীবিকা নির্বাহ করে, তাদের কাছে উৎপাদনের প্রতিটি মৌসুমই নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসে। আবহাওয়া, উৎপাদন ব্যয়, শ্রমিক সংকট, বাজার পরিস্থিতি এবং পরিবহন ব্যয়ের মতো নানা বিষয় কৃষকের আয়-ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি সহায়তা কৃষকের চলতি ব্যয়ের চাপ সামলাতে এবং পরবর্তী উৎপাদন পরিকল্পনায় কিছুটা সহায়ক হতে পারে।

সরকারি প্রণোদনা বিতরণের এই উদ্যোগের মাধ্যমে একই সঙ্গে কৃষি খাতের প্রতি সরকারের গুরুত্ব এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থ বিতরণ ব্যবস্থার ব্যবহারও সামনে এসেছে। কৃষকের ব্যাংক হিসাবে সরাসরি অর্থ পৌঁছানোর ফলে মধ্যবর্তী ধাপ কমানো এবং দ্রুত সহায়তা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। মুঠোফোনে খুদে বার্তার মাধ্যমে অর্থ জমার তথ্য পাওয়ার বিষয়টি কৃষকের কাছে লেনদেনের খবর পৌঁছানোর ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ।

রাজশাহীর জনসভা, প্রধানমন্ত্রীর সফর এবং রাজনৈতিক কর্মসূচির ব্যস্ততার মধ্যেও কৃষকদের জন্য প্রণোদনা বিতরণ ছিল দিনের অন্যতম আলোচিত ঘটনা। একদিকে হাজারো মানুষ প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি দেখতে সড়কের পাশে অপেক্ষা করেছেন, অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন চিনিকল এলাকার হাজার হাজার আখচাষির ব্যাংক হিসাবে একই সময়ে সরকারি সহায়তার অর্থ পৌঁছানোর কার্যক্রম শুরু হয়েছে। রাজশাহীর এই কর্মসূচির মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক কর্মসূচির পাশাপাশি কৃষকদের জন্য আর্থিক সহায়তার বিষয়টিও দিনের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নেয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com