যুক্তরাষ্ট্রে ৩ লাখের বেশি ভিসা বাতিল, বাড়ছে উদ্বেগ

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৬ বার
যুক্তরাষ্ট্রে ৩ লাখের বেশি ভিসা বাতিল, বাড়ছে উদ্বেগ

প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নীতিতে কঠোরতা আরও জোরদার করেছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে দেশটির সরকার তিন লাখের বেশি ভিসা বাতিল করেছে বলে জানিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। অভিবাসন আইন লঙ্ঘন, প্রতারণা এবং জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি মোকাবিলার যুক্তি সামনে রেখে এই পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে প্রশাসন। তবে ভিসা বাতিলের ব্যাপকতা, এর পেছনে ব্যবহৃত মানদণ্ড এবং রাজনৈতিক মতপ্রকাশের সঙ্গে এর সম্পর্ক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

মঙ্গলবার প্রকাশিত পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত তিন লাখের বেশি ভিসা বাতিল করা হয়েছে। এর আগে গত ১০ আগস্ট প্রকাশিত তথ্যে জানানো হয়েছিল, ওই সময় পর্যন্ত বাতিল হওয়া ভিসার সংখ্যা ছিল এক লাখ ৭৫ হাজারের বেশি। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে ভিসা বাতিলের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে কোন ধরনের ভিসা কতটি বাতিল হয়েছে, কোন কারণ সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে এবং কতজনের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল—এসব বিষয়ে বিস্তারিত পরিসংখ্যান প্রকাশিত তথ্যের মধ্যে স্পষ্ট নয়।

ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপ এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, অবৈধভাবে অবস্থানকারীদের শনাক্তকরণ এবং বহিষ্কার কার্যক্রম আরও জোরদার করা হচ্ছে। নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প অবৈধ অভিবাসন বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ক্ষমতায় ফেরার পর তাঁর প্রশাসন সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। তবে চলমান পদক্ষেপের প্রভাব শুধু অনিয়মিত অভিবাসীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বৈধ ভিসাধারী, শিক্ষার্থী, কর্মজীবী, ভ্রমণকারী এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত বিদেশিদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে দাবি করেছেন, ইতিহাসের যেকোনো প্রশাসনের তুলনায় ট্রাম্প প্রশাসন দ্রুতগতিতে বেশি ভিসা বাতিল করেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ভিসা নিয়ে অবস্থান করার সময় কোনো বিদেশি আইন ভাঙলে, প্রতারণায় জড়ালে কিংবা দেশটির জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করলে প্রশাসন তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দ্বিধা করবে না। সরকারের যুক্তি হলো, ভিসা কোনো নিঃশর্ত অধিকার নয়; বরং নির্ধারিত আইন ও শর্ত মেনে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ এবং অবস্থানের অনুমতি।

প্রশাসনের এই বক্তব্যের পেছনে অভিবাসন আইন প্রয়োগের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হলেও ভিসা বাতিলের ক্ষেত্রে কোন পরিস্থিতিতে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ভিসার ধরন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ, প্রমাণের মান এবং সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল বা পুনর্বিবেচনার সুযোগ—এসব বিষয় ভিসা বাতিলের প্রভাব বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যাঁরা শিক্ষা, চাকরি, গবেষণা, পারিবারিক পুনর্মিলন কিংবা অন্য বৈধ প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন, তাঁদের জন্য ভিসার বৈধতা হারানো ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।

অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, অভিবাসনবিরোধী অভিযানের ক্ষেত্রে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তাঁদের মতে, জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তি ব্যবহার করে কখনো কখনো সরকারের সমালোচক ও নির্দিষ্ট অভিবাসী জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে। বিশেষত জাতিগত সংখ্যালঘুদের মধ্যে আশঙ্কা বেড়েছে যে, তাঁদের পরিচয় কিংবা রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে অতিরিক্ত নজরদারি বা কঠোর পদক্ষেপের মুখে পড়তে হতে পারে। তবে এসব অভিযোগের সব ক্ষেত্রে একই ধরনের পরিস্থিতি রয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়নি।

ফিলিস্তিনের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভে অংশ নেওয়া বিদেশিদের ভিসা বাতিলের ঘটনাও এই বিতর্ককে তীব্র করেছে। অধিকারকর্মীরা এ ধরনের পদক্ষেপের সমালোচনা করে বলেছেন, রাজনৈতিক মতপ্রকাশের কারণে বিদেশিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে তা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং নাগরিক অধিকার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। তাঁদের উদ্বেগ, কোনো বিক্ষোভে অংশ নেওয়া বা সরকারের নীতির সমালোচনা করাকে যদি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিরাপত্তাঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে বৈধভাবে অবস্থানরত বিদেশিরা নিজেদের মতামত প্রকাশে ভীত হয়ে পড়তে পারেন।

এ ছাড়া প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ রক্ষণশীল ভাষ্যকার চার্লি কার্ক হত্যাকাণ্ড নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করার পর কিছু বিদেশির ভিসা বাতিলের ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। এসব ঘটনা ভিসা ব্যবস্থাপনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিদেশিদের অনলাইন কার্যক্রম যাচাই করা হলে কোন ধরনের বক্তব্য বা আচরণকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হবে, সেই মানদণ্ড কতটা স্বচ্ছ এবং সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ কতটা কার্যকর—এসব প্রশ্নের উত্তর অভিবাসন নীতির গ্রহণযোগ্যতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

ট্রাম্প প্রশাসন অভিবাসনপ্রত্যাশী ও ভিসা আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যক্রম আরও কঠোরভাবে যাচাই করছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারের দৃষ্টিতে, অনলাইন কার্যক্রম থেকে আবেদনকারীর পরিচয়, সম্ভাব্য আইন লঙ্ঘন কিংবা নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু সমালোচকদের আশঙ্কা, যাচাইয়ের প্রক্রিয়া যথেষ্ট স্পষ্ট না হলে ব্যক্তিগত মতামত, রাজনৈতিক অবস্থান কিংবা ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা কোনো পোস্টও আবেদনকারীর জন্য সমস্যার কারণ হতে পারে। এ ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ।

অভিবাসন নীতির কঠোরতা শুধু ভিসা বাতিলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ট্রাম্প প্রশাসন বৈধ অভিবাসনের কিছু পথও কঠিন করেছে। কর্মজীবীদের জন্য নির্দিষ্ট কিছু ভিসায় উচ্চ ফি আরোপের বিষয়টি এর একটি উদাহরণ। এসব পরিবর্তন বিদেশি কর্মী নিয়োগে আগ্রহী প্রতিষ্ঠান, দক্ষ পেশাজীবী এবং যুক্তরাষ্ট্রে কর্মজীবন গড়তে চাওয়া ব্যক্তিদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। উচ্চ ব্যয় ও কঠোর যাচাইয়ের কারণে কিছু আবেদনকারী বিকল্প দেশ বেছে নিতে পারেন, আবার নিয়োগদাতাদেরও কর্মী সংগ্রহের পরিকল্পনা নতুন করে সাজাতে হতে পারে।

অভিবাসন বিতর্কে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগও গুরুত্ব পাচ্ছে। অধিকারকর্মীদের দাবি, কিছু প্রতারণার ঘটনা সামনে এনে মিনেসোটার সোমালি-আমেরিকানদের মতো অভিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক নজরদারি বা চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। তবে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তিতে পুরো একটি জনগোষ্ঠীকে দায়ী করা উচিত নয়—এমন বক্তব্যও মানবাধিকারকেন্দ্রিক আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে। অপরাধ বা প্রতারণার অভিযোগের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত দায়, প্রমাণ এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা ন্যায়বিচারের মৌলিক শর্ত।

যুক্তরাষ্ট্রের এই নীতিগত পরিবর্তনের প্রভাব আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী, দক্ষ কর্মী এবং পরিবারসহ দেশটিতে যাওয়ার পরিকল্পনাকারীদের মধ্যেও পড়তে পারে। ভিসা পাওয়ার পরও তা বাতিল হওয়ার আশঙ্কা থাকলে ভ্রমণ, পড়াশোনা, চাকরি কিংবা পারিবারিক পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। বিশেষ করে যাঁরা শিক্ষা বা কর্মসংস্থানের জন্য বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেন, তাঁদের ক্ষেত্রে ভিসা বাতিলের সিদ্ধান্ত আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। একই সঙ্গে নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য সংস্থারও প্রশাসনিক জটিলতা বাড়তে পারে।

বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের যুক্তরাষ্ট্রগামী আবেদনকারীদের জন্যও পরিস্থিতিটি গুরুত্বপূর্ণ। তবে তিন লাখের বেশি ভিসা বাতিলের মোট সংখ্যার মধ্যে বাংলাদেশি নাগরিকদের সংখ্যা কত, কোন শ্রেণির ভিসা বেশি বাতিল হয়েছে কিংবা বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো নতুন নিয়ম কার্যকর হয়েছে কি না—প্রকাশিত তথ্যে তার নির্দিষ্ট হিসাব নেই। তাই সামগ্রিক পরিসংখ্যান দেখে সব আবেদনকারীর ভিসা ঝুঁকিতে রয়েছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। আবেদনকারীদের জন্য ভিসার ধরন, অনুমোদনের শর্ত এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রযোজ্য নিয়ম সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য জানা গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে, ট্রাম্প প্রশাসনের ভিসা বাতিলের এই ব্যাপকতা যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিতে কঠোরতার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রশাসন জাতীয় নিরাপত্তা ও আইন প্রয়োগকে প্রধান যুক্তি হিসেবে তুলে ধরছে; অন্যদিকে অধিকারকর্মীরা আইনি প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক মতপ্রকাশ এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানাচ্ছেন। এই দুই অবস্থানের মধ্যে ভারসাম্য নির্ধারণে স্বচ্ছতা, নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এবং কার্যকর আইনি প্রতিকার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভিসা বাতিলের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি সিদ্ধান্ত গ্রহণের মানদণ্ড কতটা পরিষ্কার, অভিযোগ যাচাইয়ের প্রক্রিয়া কতটা ন্যায়সংগত এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন কি না—এসব প্রশ্নই আগামী দিনে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতির মূল্যায়নে বড় ভূমিকা রাখবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com