প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কুমিল্লার লাকসামে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনার পর দীর্ঘ ২৪ ঘণ্টার নিবিড় প্রচেষ্টা ও উদ্ধারকাজ শেষে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের আপলাইনে ট্রেন চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়েছে। রেলপথের ওপর দুর্ঘটনাকবলিত ট্রেনের ক্ষতিগ্রস্ত ইঞ্জিন ও ছিটকে পড়া বগিগুলো সরিয়ে নিয়ে লাইন চলাচলের উপযোগী করায় রাজধানী ঢাকার সাথে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সরাসরি রেল যোগাযোগ পুনরায় চালু হয়। টানা একদিন ধরে উদ্ধার অভিযান চালানো এবং রেললাইন সংস্কার ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ক্ষতিগ্রস্ত সেকশন দিয়ে ট্রেন চলাচল আবার শুরু হয়েছে। ব্যস্ততম এই রেলপথে দীর্ঘ সময় পর লাইন সচল হওয়ায় স্বস্তি ফিরে এসেছে হাজারো সাধারণ যাত্রীর মাঝে, যারা ভয়াবহ সূচিসূচির কারণে মধ্যবর্তী স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সময় ধরে চরম ভোগান্তির মুখোমুখি হয়েছিলেন।
রেলওয়ে জংশন সূত্র এবং স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, গত বুধবার ২১ অক্টোবর দুপুর আনুমানিক সাড়ে ১২টার দিকে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী লোকাল ও কমিউটার সার্ভিস ‘কর্ণফুলী এক্সপ্রেস’ ট্রেনটি কুমিল্লার নাঙ্গলকোটের নাউটি স্টেশন এবং লাকসামের আজগরা বাজারের মধ্যবর্তী নির্জন এলাকায় পৌঁছালে আকস্মিকভাবে বিকট শব্দে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। ট্রেনটির গতি স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও হঠাৎ করেই চাকা বিকল হয়ে ট্রেনের ভারী ইঞ্জিনসহ চারটি বগি লাইনচ্যুত হয়ে যায় এবং একটি বগি কাঁচা মাটির ওপর কাত হয়ে পড়ে। ট্রেন আচমকা ঝঁকুনি দিয়ে থমকে দাঁড়ালে ট্রেনের ভেতরে থাকা শত শত যাত্রীর মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। জীবন বাঁচাতে হুড়োহুড়ি করে নিচে নামতে গিয়ে এবং ট্রেনের জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়তে গিয়ে অন্তত ১০ জন যাত্রী শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত পান এবং আহত হন। আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে স্থানীয় প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পাঠানো হলে তারা সেখানে প্রাথমিক সেবা গ্রহণ শেষে গন্তব্যে রওনা দেন।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের বিলম্বিত প্রশাসনিক তৎপরতার মধ্যে দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার প্রায় ৫ ঘণ্টা পর বুধবার সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ চট্টগ্রাম স্টেশন থেকে একটি বিশেষায়িত উদ্ধারকারী রিলিফ ট্রেন দুর্ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছায়। রিলিফ ট্রেনের ভারী ক্রেন ও উদ্ধারকারী প্রকৌশলী দলের সদস্যরা সারারাতব্যাপী নিরবচ্ছিন্ন অভিযান পরিচালনা করে আজ বৃহস্পতিবার ২২ অক্টোবর ভোর ৪টার দিকে লাইনচ্যুত ইঞ্জিন ও বগিগুলোকে মূল লাইন থেকে মুক্ত ও উত্তোলন করতে সক্ষম হন। এরপর সকাল থেকে শুরু হয় তছনছ হয়ে যাওয়া রেললাইনের পাত, স্লিপার ও সিগন্যালিং ব্যবস্থার জরুরি সংস্কার কাজ। লাইন মেরামতের সার্বিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার পর দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে ক্ষয়ক্ষতি হওয়া বগি ও ইঞ্জিনগুলোকে টেনে লাকসাম রেলওয়ে জংশনের ইয়ার্ডে সরিয়ে নিয়ে আসা হয়। লাকসাম রেলওয়ে জংশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত স্টেশন মাস্টার মো. ওমর ফারুক ভূঁইয়া ঘটনাটি নিশ্চিত করে জানান যে আপলাইন সম্পূর্ণ নিরাপদ ঘোষণা করায় এখন উভয় পথেই স্বাভাবিক গতিতে ট্রেন চলাচল করছে।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে জানা যায়, গত বুধবার ২১ অক্টোবর দুপুর আনুমানিক সাড়ে ১২টার দিকে চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী জনপ্রিয় ‘কর্ণফুলী এক্সপ্রেস’ ট্রেনটি কুমিল্লার নাঙ্গলকোট ও লাকসামের মধ্যবর্তী আজগরা সংলগ্ন এলাকায় পৌঁছালে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। হঠাৎ করেই বিকট শব্দে ট্রেনের ইঞ্জিনসহ চারটি বগির চাকা মূল রেললাইন থেকে সম্পূর্ণ ছিটকে যায়। যাত্রীদের ভাষ্যমতে, ট্রেনটি প্রচণ্ড ঝঁকুনি দিয়ে থামার মুহূর্তটিতে ভেতরের যাত্রীদের মাঝে চরম আতঙ্ক ও প্রাণভয়ের সৃষ্টি হয়। বগি লাইনচ্যুত হয়ে কাত হয়ে পড়লে জীবন বাঁচানোর তাগিদে ভেতরে থাকা শত শত পুরুষ, নারী ও শিশু হুড়োহুড়ি করে দরজার কাছে ভিড় জমান এবং অনেক যাত্রী জানালা দিয়ে লাফিয়ে নিচে পড়ার চেষ্টা করেন। ভয়াবহ এই হুড়োহুড়ি ও হুড়মুড়িয়ে নামার ঘটনায় অন্তত ১০ জন সাধারণ যাত্রী আঘাত পেয়ে গুরুতর আহত হন। পরবর্তীতে আকস্মিক আহত এই যাত্রীদের উদ্ধার করে স্থানীয় পার্শ্ববর্তী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত করার পর তাঁরা ব্যক্তিগত ব্যবস্থাপনায় নিজ নিজ গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা দেন।
দুর্ঘটনার প্রাথমিক ধাক্কা সামলে ওঠার পর উদ্ধারকাজে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের চরম ধীরগতি ও বিলম্ব নিয়ে স্থানীয় জনগণ এবং আটকে থাকা যাত্রীদের মাঝে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়। দুর্ঘটনার দীর্ঘ প্রায় ৫ ঘণ্টা পর বুধবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে চট্টগ্রাম থেকে রওনা হওয়া একটি বিশেষায়িত রিলিফ বা উদ্ধারকারী ট্রেন ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছায়। উদ্ধারকারী প্রকৌশলী ও কারিগরি দলের সদস্যরা সারারাতব্যাপি অমানুষিক পরিশ্রম করে অন্ধকার ও প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেই উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রাখেন। অবশেষ দীর্ঘ চেষ্টার পর বৃহস্পতিবার ভোর ৪টার দিকে ট্রেনের লাইনচ্যুত ভারী ইঞ্জিন ও ক্ষতিগ্রস্ত চারটি বগিকে মূল লাইন থেকে সরাতে সক্ষম হন উদ্ধারকর্মীরা। উদ্ধারকাজের পর সকাল থেকে রেলওয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের কর্মীরা লাইন পুনঃস্থাপনের কাজে নামেন। তাঁরা দুর্ঘটনাস্থলে উপড়ে যাওয়া রেলের পাত, ক্ষতিগ্রস্ত কাঠ ও কংক্রিটের স্লিপার এবং সিগন্যালিং তারগুলো মেরামত করেন। সার্বিক লাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পর অবশেষে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আপলাইনে ট্রেন চলাচল আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাভাবিক করা হয়। লাকসাম রেলওয়ে জংশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত স্টেশন মাস্টার মো. ওমর ফারুক ভূঁইয়া সাংবাদিকদের কাছে উদ্ধার অভিযান শেষ হওয়া ও লাইন পুনরায় চালুর সংবাদটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে দুর্ঘটনার সার্বিক কারণ পর্যালোচনায় শুরুতেই দায়িত্বপ্রাপ্ত দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা, অবহেলা ও গাফিলতির প্রমাণ মিলতে শুরু করেছে। রেলওয়ের প্রাথমিক অনুসন্ধানে লাইনে কাজ চলার সময় আগাম সিগন্যাল বা সতর্কতা না দেওয়ার প্রাথমিক তথ্য মেলায় ইতিমধ্যেই প্রশাসনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। দায়িত্বে চরম অবহেলার দায়ে রেলওয়ের ফেনীর জ্যেষ্ঠ উপসহকারী প্রকৌশলী মো. গোলাম সারোয়ারকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত বা সাসপেন্ড করা হয়েছে। একই সাথে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করা, কারিগরি ত্রুটি খতিয়ে দেখা এবং ভবিষ্যৎ দুর্ঘটনা রোধে সুপারিশমালা প্রদানের জন্য রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা ফারহান মাহমুদকে প্রধান ও প্রধান আহ্বায়ক করে চার সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই বিশেষ কমিটির অন্য দায়িত্বশীল সদস্যরা হলেন বিভাগীয় প্রকৌশলী আবু ইমতিয়াজ রাফি, বিভাগীয় যান্ত্রিক প্রকৌশলী আবদুল্লাহ আল মাসুদ এবং বিভাগীয় সিগন্যাল ও টেলিযোগাযোগ প্রকৌশলী আশিকুর রহমান।
উচ্চপর্যায়ের এই তদন্ত কমিটির প্রধান ও রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা ফারহান মাহমুদ দুর্ঘটনার বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বলেন যে, কি কারণে বা কার ভুলের দরুন এমন এক ব্যস্ততম লাইনে ইঞ্জিন ও চার বগি ছিটকে গেল, তার প্রকৃত সত্য অনুসন্ধানে গভীর তদন্ত পরিচালনা করা হচ্ছে। কোনো প্রকার কারিগরি ক্রুটি, লাইনের রক্ষণাবেক্ষণের অভাব নাকি কোনো প্রশাসনিক গাফিলতি ছিল—তা প্রতিটি সম্ভাব্য দিক খতিয়ে দেখে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে। তিনি দৃঢ়তার সাথে আশ্বস্ত করে আরও জানান যে, এই লাইনচ্যুত হওয়ার নেপথ্যে যে বা যাঁদের বিন্দুমাত্র দায় বা গাফিলতি খুঁজে পাওয়া যাবে, তাঁদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ রেলওয়ের কঠোর আইন অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে, যেন ভবিষ্যতে এমন ভয়াবহ দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
এই ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনার প্রাথমিক তদন্তে সংশ্লিষ্টদের চরম অবহেলা ও গাফিলতির তথ্য উঠে আসায় ইতিমধ্যেই প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। লাইনে কাজ চলাকালীন ট্রেন চালককে সংকেত না দেওয়া কিংবা সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে না জানানোর অভিযোগে ফেনী অঞ্চলের রেলওয়ের জ্যেষ্ঠ উপসহকারী প্রকৌশলী মো. গোলাম সারোয়ারকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ অনুসন্ধান, কারিগরি ত্রুটি খতিয়ে দেখা ও দায়ীদের চিহ্নিত করার জন্য রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা ফারহান মাহমুদকে আহ্বায়ক করে একটি উচ্চপর্যায়ের চার সদস্যের বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রধান ফারহান মাহমুদ নিশ্চিত করেছেন যে তাঁদের তদন্ত কাজ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে শুরু হয়েছে এবং পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর অপরাধপ্রবণতা ও অবহেলা প্রমাণিত হলে রেলওয়ের বিদ্যমান কঠোর আইন অনুযায়ী তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত