সাইবার ঝুঁকিতে তৃতীয় দিনেও বন্ধ বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৬ বার
সাইবার ঝুঁকিতে তৃতীয় দিনেও বন্ধ বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্বজুড়ে সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগের মধ্যে টানা তৃতীয় দিনের মতো বন্ধ রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট। সম্ভাব্য সাইবার হামলার ঝুঁকি বিবেচনায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে গত বৃহস্পতিবার ওয়েবসাইটটি অফলাইনে নেওয়ার পর এখনো তা সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য চালু করা হয়নি। তবে ওয়েবসাইট বন্ধ থাকলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সংযোগ ও প্রয়োজনীয় ব্যাংকিং কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট বন্ধ থাকার বিষয়টি সাধারণ ব্যবহারকারীদের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগ তৈরি করলেও এখন পর্যন্ত ওয়েবসাইটে সাইবার হামলা হয়েছে—এমন কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। বরং সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে আগেভাগেই ওয়েবসাইটের নিরাপত্তা পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়ার অংশ হিসেবে এটি বন্ধ রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পরই ওয়েবসাইটটি আবার চালু করা হবে।

গত বৃহস্পতিবার দুপুরের দিকে বৈশ্বিক সাইবার নিরাপত্তা সতর্কতার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে প্রবেশ বন্ধ হয়ে যায়। ওয়েবসাইটে প্রবেশের চেষ্টা করলে রক্ষণাবেক্ষণসংক্রান্ত একটি বার্তা দেখা যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, তাদের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, নিরাপত্তা পরিস্থিতি পুরোপুরি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ওয়েবসাইটটি চালু করা হবে না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ওয়েবসাইট বন্ধ থাকলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সংযোগ স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে। ফলে ব্যাংকগুলোর সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রয়োজনীয় যোগাযোগ ও কার্যক্রমে কোনো বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হয়নি।

ওয়েবসাইটটি কবে নাগাদ চালু হবে, সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানানো হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ নিরাপত্তা ঝুঁকি যাচাইয়ের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দ্রুত ওয়েবসাইট চালু করার চেয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এই মুহূর্তে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বজুড়ে নতুন সাইবার নিরাপত্তা সতর্কতার পেছনে রয়েছে বহুল ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং ভাষা পিএইচপিতে শনাক্ত হওয়া গুরুতর নিরাপত্তা দুর্বলতা। সাইবার নিরাপত্তা গবেষকেরা এমন কিছু ত্রুটি শনাক্ত করেছেন, যেগুলো কাজে লাগিয়ে দুর্বল সার্ভারে দূর থেকে অননুমোদিত কমান্ড চালানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে ওয়েবসাইটের ফাইল, ডেটাবেজ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ঝুঁকিতে পড়তে পারে। পরিস্থিতি বিবেচনায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নিজেদের ওয়েবসাইট ও সার্ভারের নিরাপত্তা পরীক্ষা শুরু করেছে।

বাংলাদেশেও এ নিয়ে সতর্কতা জারি করেছে সরকারের সংশ্লিষ্ট সাইবার নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের সার্ভারে পিএইচপির কোন সংস্করণ ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটি পরীক্ষা করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা হালনাগাদ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যেসব সিস্টেমে তাৎক্ষণিকভাবে নিরাপত্তা হালনাগাদ করা সম্ভব নয়, সেগুলোর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো সফটওয়্যার বা প্রোগ্রামিং ভাষায় নিরাপত্তা দুর্বলতা শনাক্ত হওয়া মানেই সংশ্লিষ্ট সব ওয়েবসাইটে হামলা হয়েছে—এমনটি নয়। ঝুঁকি নির্ভর করে কোন সংস্করণ ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটি কতটা হালনাগাদ, সার্ভারে কী ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান কীভাবে তাদের অবকাঠামো পরিচালনা করছে তার ওপর। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তকে সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় একটি সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে

বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো একটি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট শুধু সাধারণ তথ্য প্রকাশের মাধ্যম নয়; কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন নির্দেশনা, নীতিমালা, সার্কুলার, পরিসংখ্যান, বৈদেশিক মুদ্রা-সংক্রান্ত তথ্যসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের জন্য এটি একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম। ফলে দীর্ঘ সময় ওয়েবসাইট বন্ধ থাকলে তথ্য খোঁজা ও প্রকাশের ক্ষেত্রে কিছুটা অসুবিধা তৈরি হতে পারে। তবে ব্যাংকিং খাতের মূল আন্তঃসংযোগ ব্যবস্থা সচল থাকায় সাধারণ ব্যাংকিং কার্যক্রমে বড় ধরনের প্রভাব পড়েনি বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

এ ধরনের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য একেবারে নতুন নয়। এর আগে ২০২৩ সালেও সম্ভাব্য সাইবার হামলার ঝুঁকি বিবেচনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কিছু অভ্যন্তরীণ ওয়েবভিত্তিক সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছিল। সেই সময়ও মূল লক্ষ্য ছিল সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলা করা এবং গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামো সুরক্ষিত রাখা।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের সবচেয়ে বড় কারণ এর অতীত অভিজ্ঞতা। ২০১৬ সালে বিশ্বের অন্যতম আলোচিত সাইবার চুরির ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে থাকা হিসাব থেকে হ্যাকাররা প্রায় ১০ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার সরিয়ে নেয়। ওই ঘটনার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাইবার নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও ডিজিটাল অবকাঠামো নিয়ে দেশে-বিদেশে ব্যাপক আলোচনা হয়। ওই ঘটনার পর তৎকালীন গভর্নর আতিউর রহমান পদত্যাগ করেন।

সেই অভিজ্ঞতার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে সতর্কতা স্বাভাবিকভাবেই আরও বেড়েছে। বিশেষ করে আর্থিক খাতের তথ্য ও অবকাঠামো লক্ষ্য করে বিশ্বজুড়ে সাইবার অপরাধীদের তৎপরতা বাড়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য ওয়েবসাইট, সার্ভার, আন্তঃব্যাংক যোগাযোগব্যবস্থা ও তথ্যভাণ্ডারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সাম্প্রতিক বৈশ্বিক পরিস্থিতিও এই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়েছে। পিএইচপির নিরাপত্তা দুর্বলতা প্রকাশ্যে আসার পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারি ওয়েবসাইট ও অনলাইন সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। নিরাপত্তা গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, কোনো দুর্বলতা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে চলে এলে অপরাধীরা তা কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে পারে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুত নিজেদের ব্যবহৃত সফটওয়্যার ও সার্ভার পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এখন মূল প্রশ্ন হচ্ছে, এই নিরাপত্তা সতর্কতা কত দ্রুত মোকাবিলা করা সম্ভব হবে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট কবে নিরাপদভাবে চালু করা যাবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্দিষ্ট সময় না জানালেও তাদের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ কাজ করছে বলে জানিয়েছে। তাই ওয়েবসাইট বন্ধ থাকার সময় যতটা সম্ভব নিরাপত্তা যাচাই, দুর্বলতা শনাক্তকরণ ও সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করাই কর্তৃপক্ষের অগ্রাধিকার বলে মনে হচ্ছে।

সাইবার হামলার ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হওয়ায় শুধু একটি ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ করাই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। নিয়মিত নিরাপত্তা পরীক্ষা, সফটওয়্যার হালনাগাদ, সার্ভার পর্যবেক্ষণ, গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ব্যাকআপ এবং সম্ভাব্য হামলার ক্ষেত্রে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেওয়ার সক্ষমতা নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ডিজিটাল নিরাপত্তার কোনো দুর্বলতা শুধু একটি ওয়েবসাইটের সমস্যা হিসেবে দেখা যায় না; এর সঙ্গে দেশের সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থার আস্থার বিষয়টিও জড়িয়ে থাকে।

এ মুহূর্তে অবশ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সঙ্গে সংযোগ স্বাভাবিক থাকার বিষয়টি সাধারণ মানুষ ও ব্যাংকিং খাতের জন্য স্বস্তির খবর। ওয়েবসাইট বন্ধ থাকার কারণে সাধারণ ব্যাংকিং লেনদেন বন্ধ হয়ে যায়নি। কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা যাচাই শেষ হওয়ার পর ওয়েবসাইটটি আবার চালু হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে কবে নাগাদ তা সম্ভব হবে, সেটি এখনো নিশ্চিত নয়।

বিশ্বব্যাপী সাইবার ঝুঁকি যখন ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে, তখন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে এই সতর্কতামূলক পদক্ষেপ একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও দিচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক ব্যবস্থায় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সামান্য দুর্বলতাও বড় ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে। তাই ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার কারণে কিছুটা অসুবিধা হলেও দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল সেবা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com