প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য রাশিয়া থেকে আনা ইউরেনিয়ামের চতুর্থ চালান প্রকল্প এলাকায় পৌঁছেছে। শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকাল ৭টা ১৭ মিনিটে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যে ইউরেনিয়ামবাহী তিনটি বিশেষায়িত লরি প্রকল্প এলাকায় প্রবেশ করে। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানের পাশাপাশি অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পুরো পরিবহন কার্যক্রমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন।
ঈশ্বরদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসাদুর রহমান ইউরেনিয়ামের চালান প্রকল্প এলাকায় পৌঁছানোর তথ্য নিশ্চিত করেছেন। অত্যন্ত সংবেদনশীল এই পারমাণবিক জ্বালানি পরিবহনের কারণে পুরো প্রক্রিয়ায় বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। নির্ধারিত রুট অনুসরণ করে লরিগুলো প্রকল্প এলাকায় পৌঁছানোর পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে পরবর্তী কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়।
রূপপুর প্রকল্পে ইউরেনিয়াম জ্বালানি পৌঁছানোর ধারাবাহিকতায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে প্রকল্পের প্রথম ইউনিটের জন্য অতিরিক্ত ইউরেনিয়ামের একটি চালান এবং দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য তিনটি চালান প্রকল্প এলাকায় পৌঁছেছে। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত প্রথম ও দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য মোট চারটি চালান রূপপুর প্রকল্প এলাকায় পৌঁছেছে।
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের পরিকল্পনা অনুযায়ী, দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য মোট সাতটি কার্গো বিমানে ১৬৩টি ইউরেনিয়াম অ্যাসেম্বলি বাংলাদেশে আনার কথা রয়েছে। পাশাপাশি প্রথম ইউনিটে ভবিষ্যৎ পুনরায় জ্বালানি সরবরাহের জন্য আরও দুটি কার্গোতে অতিরিক্ত ৪৮টি ইউরেনিয়াম অ্যাসেম্বলি আনার পরিকল্পনা রয়েছে। সব মিলিয়ে নয়টি চালানে এসব পারমাণবিক জ্বালানি বাংলাদেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন অবকাঠামোয় একটি বড় পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত প্রকল্প। রাশিয়ার প্রযুক্তি ও সহযোগিতায় নির্মিত এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে ভিভিইআর-১২০০ মডেলের দুটি ইউনিট রয়েছে। প্রতিটি ইউনিটে পারমাণবিক জ্বালানি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নির্ধারিত প্রযুক্তি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে।
বর্তমানে প্রকল্পের প্রথম ইউনিটের কার্যক্রম ধাপে ধাপে পরীক্ষামূলক পর্যায়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রথম ইউনিটে ‘পাওয়ার স্টার্টআপ স্টেজ-সি’ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এই পর্যায়টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের কমিশনিং প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এতে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা ধীরে ধীরে বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাই করা হয়।
স্টেজ-সি কার্যক্রমে শুধু রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা বাড়ানোই নয়, কেন্দ্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থার সমন্বিত কার্যকারিতাও পরীক্ষা করা হয়। টারবাইন-জেনারেটর, পরিচালনব্যবস্থা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা নির্ধারিত মান অনুযায়ী কাজ করছে কি না, তা পর্যায়ক্রমে যাচাই করা হবে। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে এই ধরনের পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যাওয়ার আগে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করছে কি না তা নিশ্চিত করতে হয়।
এর আগে বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রথম ইউনিটে স্টেজ-সি কার্যক্রম শুরুর অনুমোদন দেন। নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের পরই এই গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ফলে রূপপুর প্রকল্প এখন নির্মাণ ও জ্বালানি সরবরাহের পাশাপাশি বাস্তব বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতির আরও কাছাকাছি পৌঁছেছে।
স্টেজ-সি পর্যায়ে নির্ধারিত পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হলে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হবে জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন গ্রিডের সঙ্গে প্রথম ইউনিটের জেনারেটরের সংযোগ স্থাপন। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাষায় এই প্রক্রিয়াকে ‘সিনক্রোনাইজেশন’ বলা হয়। এই পর্যায়ে কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সমন্বিতভাবে সরবরাহের সক্ষমতা পরীক্ষা করা হয়।
সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে নভেম্বর মাসে রূপপুরের প্রথম ইউনিট থেকে পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে। তবে এই কার্যক্রম কেবল প্রকল্পের নিজস্ব পরিকল্পনার ওপর নির্ভর করছে না। নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত শর্ত, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট অনুমোদন সম্পন্ন হওয়ার পরই গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
রূপপুরে ইউরেনিয়ামের ধারাবাহিক চালান পৌঁছানোর বিষয়টি তাই শুধু পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহের একটি ঘটনা নয়; এটি বিদ্যুৎকেন্দ্রটির কমিশনিং প্রক্রিয়ায় অগ্রগতিরও একটি অংশ। একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পর সেটিকে বাণিজ্যিকভাবে পরিচালনায় নিতে দীর্ঘ ও বহুস্তরীয় পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। জ্বালানি গ্রহণ, জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, রিঅ্যাক্টর পরিচালনা, বিভিন্ন যন্ত্রপাতির পরীক্ষা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা যাচাই—সবগুলো ধাপ নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সম্পন্ন করতে হয়।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ইউরেনিয়াম পরিবহনের সময় বিশেষায়িত যানবাহন ব্যবহার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা সেই ব্যবস্থারই অংশ। একইভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্রের অভ্যন্তরেও পারমাণবিক নিরাপত্তা, বিকিরণ নিয়ন্ত্রণ এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা কার্যকর রাখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ভবিষ্যতে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় এর প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে বড় পরিমাণে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি হলে শিল্প, বাণিজ্য ও অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে এর সুফল পাওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে। একই সঙ্গে দেশের জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য বাড়ানোর ক্ষেত্রেও পারমাণবিক বিদ্যুৎ নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা করবে।
তবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যাওয়ার আগে প্রতিটি ধাপ যথাযথভাবে সম্পন্ন করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার শর্ত পূরণ করা জরুরি। কারণ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে দ্রুততার চেয়ে নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিতভাবে প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন করাই অগ্রাধিকার পায়।
শনিবার সকালে দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য ইউরেনিয়ামের চতুর্থ চালান রূপপুরে পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে প্রকল্পের জ্বালানি সরবরাহ কার্যক্রম আরও এক ধাপ এগিয়েছে। সামনে আরও কয়েকটি চালান দেশে আসার কথা রয়েছে। একই সময়ে প্রথম ইউনিটের স্টেজ-সি কার্যক্রম এবং সম্ভাব্য গ্রিড সংযোগের প্রস্তুতিও চলছে। ফলে দেশের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পটি এখন নির্মাণপর্ব পেরিয়ে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে প্রবেশ করছে।
রূপপুরের এই অগ্রগতির দিকে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের পাশাপাশি সাধারণ মানুষেরও নজর রয়েছে। প্রকল্পের প্রতিটি ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন হলে বাংলাদেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের যুগে আরও দৃঢ়ভাবে প্রবেশ করবে। তবে সেই অগ্রযাত্রার মূল ভিত্তি হবে নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, দক্ষ জনবল এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত পরিচালনা। এসব বিষয় নিশ্চিত করেই রূপপুরের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার অপেক্ষা এখন আরও ঘনিয়ে এসেছে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত