শাকিল হত্যা: এমপির ছেলের ফের রিমান্ড চায় ডিবি

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৫ বার
শাকিল হত্যা: এমপির ছেলের ফের রিমান্ড চায় ডিবি

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নাটোরে ছাত্রদল নেতা শাকিল ইসলাম হত্যা মামলাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ও আইনগত অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। মামলার অন্যতম আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল আজিজের বড় ছেলে নূরুজ্জামানকে আবারও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেছে জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। আগের তিন দিনের রিমান্ড শেষে শুক্রবার সন্ধ্যায় তাঁকে আদালতে হাজির করে নতুন করে সাত দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়। তবে আদালত তাৎক্ষণিকভাবে আবেদনটির শুনানি না করে নিয়মিত আদালতে শুনানির নির্দেশ দিয়েছেন এবং নূরুজ্জামানকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন।

ঘটনাটি শুধু একটি হত্যা মামলার তদন্তেই সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধ, একই পরিবারের দুই ছেলের অনুসারীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব এবং জেলা বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থান নিয়েও নানা প্রশ্ন সামনে এসেছে। শাকিলের মৃত্যুর পর এলাকায় যে উত্তেজনা ও আলোচনা তৈরি হয়েছে, নূরুজ্জামানের পুনরায় রিমান্ড আবেদন এবং জেলা বিএনপির বিশেষ সভার মধ্য দিয়ে তা আরও গুরুত্ব পেয়েছে।

ডিবি সূত্রে জানা গেছে, আগের তিন দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের সময় নূরুজ্জামান পুলিশকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন বলে তদন্তকারীদের দাবি। তবে এসব তথ্যের সত্যতা যাচাই এবং মামলার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে তাঁকে আবারও জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এ কারণেই নতুন করে সাত দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছে। ডিবির ওসি নজরুল ইসলাম এবং মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক শফিকুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সাদ্দাম হোসেনের আমলি আদালত রিমান্ড আবেদনের বিষয়ে নিয়মিত আদালতে শুনানির নির্দেশ দিয়েছেন। তদন্তকারীদের ধারণা, পরবর্তী কার্যদিবসে আবেদনটির শুনানি হতে পারে। তবে আদালতের শুনানি ও পরবর্তী আদেশের আগে নূরুজ্জামানের নতুন রিমান্ড নিশ্চিত হয়েছে বলে মনে করার সুযোগ নেই। তদন্তের স্বার্থে পুলিশ যে আবেদন করেছে, সেটির বিষয়ে আদালত আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত দেবেন।

নূরুজ্জামান নাটোর-৪ (গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রাম) আসনের সংসদ সদস্য আবদুল আজিজের বড় ছেলে। গত ২৬ অক্টোবর তাঁকে শাকিল হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এর আগে ১৪ অক্টোবর রাতে দুর্বৃত্তদের হামলায় গুরুতর আহত হন গুরুদাসপুর পৌর ছাত্রদলের সদস্যসচিব শাকিল ইসলাম। হামলার পর তাঁকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়। দীর্ঘ ১২ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ২৬ অক্টোবর রাতে রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। একজন রাজনৈতিক কর্মীর ওপর হামলা, দীর্ঘ চিকিৎসার পর মৃত্যু এবং এরপর হত্যা মামলায় সংসদ সদস্যের ছেলের গ্রেপ্তারের ঘটনা স্থানীয় রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

শাকিলের বাবা রবিউল করিম হামলার পরপরই একটি মামলা করেছিলেন। ছেলের মৃত্যুর পর মামলাটি হত্যা মামলায় রূপ নেয়। তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নূরুজ্জামানকে আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে মামলার অভিযোগ, আসামির সংশ্লিষ্টতা এবং ঘটনার পেছনের কারণ আদালতে প্রমাণের বিষয়। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কাউকে দোষী হিসেবে চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করা আইনগতভাবে সমীচীন নয়। এ কারণে মামলার প্রতিটি তথ্য, সাক্ষ্য ও প্রমাণ নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি।

শাকিল ইসলাম গুরুদাসপুর পৌর ছাত্রদলের সদস্যসচিব ছিলেন। স্থানীয় ছাত্রদলের একাধিক সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি সংসদ সদস্য আবদুল আজিজের ছোট ছেলে মাহমুদুজ্জামানের অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। অন্যদিকে সংসদ সদস্যের বড় ছেলে নূরুজ্জামানেরও আলাদা সমর্থকগোষ্ঠী রয়েছে। দুই ভাইয়ের অনুসারীদের মধ্যে আগে থেকেই বিরোধ ও দ্বন্দ্ব ছিল বলে ছাত্রদলের কয়েকজন নেতা দাবি করেছেন। এই বিরোধের সঙ্গে শাকিলের ওপর হামলার কোনো যোগসূত্র আছে কি না, সেটি তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। তবে অনুসারীদের মধ্যে দ্বন্দ্বের কথা উঠে এলেও সেটিকে হত্যাকাণ্ডের নিশ্চিত কারণ হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না। ঘটনার প্রকৃত পটভূমি জানতে তদন্তে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য এবং অন্যান্য আলামত যাচাই প্রয়োজন।

এদিকে নূরুজ্জামানকে গ্রেপ্তারের পর সংসদ সদস্য আবদুল আজিজকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি নিয়ে আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হলে বিষয়টি জেলা বিএনপির নেতাদের মধ্যেও গুরুত্ব পায়। এ পরিস্থিতিতে শুক্রবার সন্ধ্যার পর নাটোর জেলা বিএনপি একটি বিশেষ সভা করে। জেলা পরিষদ কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় জেলা বিএনপির আহ্বায়ক রহিম নেওয়াজ, সদস্যসচিব আসাদুজ্জামানসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা অংশ নেন। সভায় শাকিল হত্যাকাণ্ড, সংসদ সদস্য আবদুল আজিজকে ঘিরে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও এবং দলের সাংগঠনিক অবস্থান নিয়ে আলোচনা হয়।

সভা শেষে জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আসাদুজ্জামান সাংবাদিকদের জানান, শহীদ শাকিল ইসলামের মৃত্যুতে সভায় গভীর শোক প্রকাশ করা হয়েছে এবং তাঁর পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানো হয়েছে। বিস্তারিত আলোচনার পর নেতারা মনে করেছেন, সংসদ সদস্য আবদুল আজিজ জেলা বিএনপির একজন যুগ্ম আহ্বায়ক হওয়ায় তাঁকে বহিষ্কার বা পদ থেকে সরানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার জেলা কমিটির নেই। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কেন্দ্রীয় কমিটির রয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে ছড়িয়ে পড়া অশ্লীল ভিডিওসংক্রান্ত যেসব তথ্য-প্রমাণ জেলা নেতাদের কাছে এসেছে, সেগুলো কেন্দ্রীয় কমিটিতে পাঠানো হবে বলেও জানান তিনি।

আসাদুজ্জামান আরও বলেন, সংসদ সদস্যের ছেলের বিরুদ্ধে ওঠা অপরাধের অভিযোগ তদন্তকারী সংস্থার বিষয়। আইন অনুযায়ী তদন্তের মাধ্যমে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসা উচিত। অর্থাৎ, জেলা বিএনপি একদিকে শাকিলের মৃত্যুতে শোক ও সমবেদনা জানিয়েছে, অন্যদিকে সংসদ সদস্যের সাংগঠনিক অবস্থান এবং তাঁর ছেলের বিরুদ্ধে থাকা মামলাকে পৃথকভাবে বিবেচনার কথা জানিয়েছে। এতে স্পষ্ট হয়েছে, ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যেও সতর্ক অবস্থান রয়েছে।

শাকিলের মৃত্যুর পর এলাকায় উত্তেজনার আরেকটি দিক সামনে আসে তাঁর জানাজা-পরবর্তী হামলা ও লুটপাটের অভিযোগে। এর আগে ২৮ অক্টোবর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, শাকিলের জানাজা শেষে এমপির ছেলের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত এক প্রবাসীর শপিংমলে হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার কারণে হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবির পাশাপাশি এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একটি হত্যাকাণ্ডের পর প্রতিশোধমূলক হামলা বা সম্পদে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটলে তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট সব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষ তদন্ত ও দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

শাকিল হত্যা মামলার তদন্তে আরও দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে ডিবি। গত বৃহস্পতিবার মো. আলামিন (২৫) ও আনিছুর রহমান (২৬) নামের ওই দুই ব্যক্তিকে আটক করা হয় বলে জানা গেছে। তাঁদের সঙ্গে ঘটনার কী ধরনের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তদন্তকারীরা তাঁদের বক্তব্য ও অন্যান্য তথ্য যাচাই করে দেখছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। মামলার তদন্ত এগিয়ে নিতে প্রত্যেকের ভূমিকা আলাদাভাবে পরীক্ষা করা জরুরি, যাতে প্রকৃত অপরাধী শনাক্ত হয় এবং নিরপরাধ কেউ হয়রানির শিকার না হন।

নাটোরের এই হত্যাকাণ্ড এখন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে। শাকিলের ওপর হামলার পেছনে প্রকৃত কারণ কী ছিল, হামলায় কারা সরাসরি অংশ নিয়েছিল, স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধের সঙ্গে ঘটনার কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না এবং মামলার তদন্তে পাওয়া তথ্য কতটা নির্ভরযোগ্য—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই স্পষ্ট হতে পারে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও বা নানা অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে সেগুলোকে চূড়ান্ত তথ্য হিসেবে প্রচার করাও দায়িত্বশীল আচরণ নয়।

শাকিলের পরিবারের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তাঁর মৃত্যুর সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা। দীর্ঘ ১২ দিন চিকিৎসার পর একজন তরুণ রাজনৈতিক কর্মীর মৃত্যু তাঁর স্বজনদের জন্য গভীর শোকের ঘটনা। এই শোক যেন কোনো ধরনের প্রতিহিংসা, সহিংসতা কিংবা রাজনৈতিক সংঘাতে রূপ না নেয়, সে দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদেরও উচিত উত্তেজনা প্রশমনে ভূমিকা রাখা এবং তদন্তে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা থেকে বিরত থাকা।

অন্যদিকে তদন্তকারী সংস্থার দায়িত্ব হলো প্রভাবশালী বা সাধারণ—সব আসামির ক্ষেত্রে একই আইনগত মানদণ্ড অনুসরণ করা। রিমান্ড আবেদন, জিজ্ঞাসাবাদ, সাক্ষ্য সংগ্রহ এবং আলামত বিশ্লেষণের প্রতিটি ধাপ হতে হবে স্বচ্ছ ও আইনসম্মত। নূরুজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিচার আদালতে হবে, আর শাকিল হত্যার প্রকৃত রহস্য উদ্‌ঘাটনে তদন্তকে এগিয়ে নিতে হবে নিরপেক্ষভাবে। নাটোরবাসীর প্রত্যাশা, রাজনৈতিক পরিচয় বা পারিবারিক প্রভাব যেন বিচারপ্রক্রিয়ায় কোনো বাধা হয়ে না দাঁড়ায় এবং শাকিলের পরিবার ন্যায়বিচার পায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com