১৩ সিটিতে ই-রিকশা নিবন্ধন শুরু, ফি কত

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬
  • ২৪ বার
১৩ সিটিতে ই-রিকশা নিবন্ধন শুরু, ফি কত

প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলাচল করা ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যানবাহনকে একটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশনে আজ থেকে শুরু হচ্ছে ই-রিকশা নিবন্ধন কার্যক্রম। নতুন বিধিমালার আওতায় প্রথম ধাপে যানবাহনগুলোকে নিবন্ধনের মাধ্যমে আইনি কাঠামোর মধ্যে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে এসব যানবাহনের চালকদের জন্য ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হবে।

শহরের অলিগলি থেকে প্রধান সড়ক—স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতের জন্য ব্যাটারিচালিত রিকশা এখন অনেক মানুষের নিত্যদিনের ভরসা। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের কাছে কম খরচে দ্রুত এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পৌঁছানোর সহজ মাধ্যম হিসেবে ই-রিকশার ব্যবহার বেড়েছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে নিবন্ধন, নির্দিষ্ট নকশা, চালকের প্রশিক্ষণ, গতি নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থার বাইরে এসব যান চলাচল করায় সড়ক ব্যবস্থাপনা ও জননিরাপত্তা নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। নতুন নিবন্ধন কার্যক্রমের মাধ্যমে সেই অনিয়ম কমানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী, দুই যাত্রী ধারণক্ষমতার একটি ব্যাটারিচালিত রিকশার নিবন্ধন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ হাজার টাকা। নিবন্ধনের এক বছর পর এটি নবায়ন করতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে নবায়ন ফি হবে ৪ হাজার টাকা। অন্যদিকে চার যাত্রী ধারণক্ষমতার রিকশার নিবন্ধন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ হাজার টাকা। এসব যানবাহনের নিবন্ধন ও নবায়নের পাশাপাশি নির্ধারিত কাগজপত্র এবং ফিটনেসসংক্রান্ত শর্তও পূরণ করতে হবে।

নিবন্ধনের সঙ্গে কিউআর কোডযুক্ত ফিটনেস সনদের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এ সনদের জন্য অতিরিক্ত ১ হাজার টাকা দিতে হবে। এর ফলে একটি নিবন্ধিত ই-রিকশার পরিচয়, ফিটনেসের অবস্থা ও প্রয়োজনীয় তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে যাচাই করা সহজ হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। একই সঙ্গে সড়কে চলাচলকারী অনুমোদিত যান এবং অনিবন্ধিত যান আলাদা করে শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে।

নতুন ব্যবস্থায় একটি ব্যাটারিচালিত রিকশার সর্বোচ্চ চলাচলের মেয়াদ ১২ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ নিবন্ধনের পর নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত যানটি সড়কে চলাচল করতে পারবে। নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হলে সেটি আর বৈধভাবে চলাচলের সুযোগ পাবে না। পুরোনো ই-রিকশার ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট নিয়ম প্রযোজ্য হবে। ফলে বছরের পর বছর ব্যবহার করা ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিরাপদ যানবাহন ধীরে ধীরে সড়ক থেকে সরিয়ে নেওয়ার একটি কাঠামো তৈরি হতে পারে।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলাচল করা ই-রিকশাগুলোকে নিবন্ধনের মাধ্যমে শৃঙ্খলার মধ্যে আনার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নিবন্ধনের পাশাপাশি যানবাহনের নকশা ও কারিগরি মানের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ব্যাটারিচালিত রিকশা তৈরিতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অনুমোদিত নকশা অনুসরণ করতে হবে। এ বিষয়ে সাত সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। কমিটি ই-রিকশার কাঠামো ও নিরাপত্তার বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করবে। ইতোমধ্যে যেসব পুরোনো ই-রিকশা রাস্তায় চলছে, সেগুলোকেও অনুমোদিত নকশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এই সিদ্ধান্তের ফলে ই-রিকশা মালিকদের জন্য নতুন কিছু খরচ তৈরি হলেও সরকারের দৃষ্টিতে এর মাধ্যমে যানবাহনের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। বর্তমানে অনেক ই-রিকশার কাঠামো, ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক সংযোগ ও ব্রেকিং ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অননুমোদিত যন্ত্রাংশ ব্যবহার এবং অতিরিক্ত পরিবর্তনের কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। অনুমোদিত নকশা বাধ্যতামূলক হলে এসব ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

নতুন বিধিমালায় শুধু নিবন্ধন নয়, সড়কে ই-রিকশা চালানোর ক্ষেত্রে বেশ কিছু আচরণকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নিবন্ধন ছাড়া যান চালানো, অনুমোদিত সীমার চেয়ে বেশি যাত্রী বহন, নির্ধারিত গতিসীমা অতিক্রম, অননুমোদিত ব্যাটারি ব্যবহার এবং ট্রাফিক সংকেত অমান্য করার মতো কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। এর ফলে ই-রিকশা চালকদেরও ট্রাফিক আইন ও নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলতে হবে।

চালকদের জন্য ড্রাইভিং লাইসেন্স চালুর পরিকল্পনাটিও এই ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এতদিন অনেক চালক কোনো আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ বা লাইসেন্স ছাড়াই ই-রিকশা চালিয়েছেন। ফলে ট্রাফিক আইন, সড়কের নিরাপত্তা, পথচারীর অধিকার এবং দুর্ঘটনা এড়ানোর কৌশল সম্পর্কে চালকদের দক্ষতার ঘাটতি থাকার অভিযোগ রয়েছে। লাইসেন্সের ব্যবস্থা চালু হলে চালকদের নির্দিষ্ট যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণের আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হবে।

ঢাকার ক্ষেত্রে ই-রিকশা চলাচলকে আরও নিয়ন্ত্রিত করতে আটটি জোন করার পরিকল্পনাও রয়েছে। ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় চারটি করে জোন নির্ধারণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। কোন সড়কে কী ধরনের যান চলবে এবং কোন এলাকায় ই-রিকশার চলাচল সীমিত বা নিয়ন্ত্রিত থাকবে—এ ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর যানজট ও সড়ক ব্যবস্থাপনায় এর প্রভাব পড়তে পারে।

তবে নতুন নিবন্ধন ব্যবস্থার সফলতা অনেকটাই নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। শুধু নিবন্ধন ফি নির্ধারণ বা বিধিমালা জারি করলেই ই-রিকশা খাতে শৃঙ্খলা ফিরবে না। নিবন্ধনের পর যানবাহনের প্রকৃত অবস্থা যাচাই, নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষা, চালকদের প্রশিক্ষণ, নির্ধারিত রুট ও গতিসীমা কার্যকর করা এবং আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ব্যবস্থা নিতে হবে।

অন্যদিকে ই-রিকশার ওপর নির্ভরশীল নিম্নআয়ের মানুষদের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। অনেক পরিবারের জীবিকা সরাসরি এই যানবাহনের সঙ্গে যুক্ত। কেউ মালিক হিসেবে ই-রিকশা চালান, আবার কেউ দৈনিক বা সাপ্তাহিক ভাড়ায় যান নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। অতিরিক্ত নিবন্ধন ব্যয় বা নতুন নিয়মের কারণে তাদের ওপর হঠাৎ করে বড় আর্থিক চাপ তৈরি হলে সেটিও সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার কারণ হতে পারে। তাই নিবন্ধন প্রক্রিয়াটি সহজ, স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত রাখা জরুরি।

একই সঙ্গে যাত্রীদের নিরাপত্তাও এই উদ্যোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা প্রয়োজন। একটি ই-রিকশায় অনুমোদিত সংখ্যার বেশি যাত্রী তোলা, অতিরিক্ত ভার বহন বা ঝুঁকিপূর্ণ গতিতে চলাচল করলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক মানুষ ও শারীরিকভাবে দুর্বল যাত্রীদের জন্য নিরাপদ যানবাহন নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন বিধিমালা বাস্তবায়নের মাধ্যমে যদি এসব ঝুঁকি কমানো যায়, তাহলে সাধারণ যাত্রীরাই সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন।

ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ ব্যবহার, ব্যাটারি চার্জিং, পুরোনো ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত ঝুঁকির বিষয়টিও সামনে এসেছে। ভবিষ্যতে নিবন্ধন ব্যবস্থার পাশাপাশি ব্যাটারির মান, চার্জিং নিরাপত্তা এবং ব্যবহৃত ব্যাটারি পুনর্ব্যবহার বা নিষ্পত্তির বিষয়েও কার্যকর নীতিমালা প্রয়োজন হতে পারে।

সব মিলিয়ে দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশনে আজ থেকে ই-রিকশা নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু হওয়া এই খাতকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাকে শৃঙ্খলায় আনতে নিবন্ধন, অনুমোদিত নকশা, ফিটনেস সনদ, চালকের লাইসেন্স এবং নির্দিষ্ট চলাচলব্যবস্থা—সবকিছুকে সমন্বিতভাবে কার্যকর করতে হবে। এতে একদিকে যেমন যাত্রী ও পথচারীর নিরাপত্তা বাড়তে পারে, অন্যদিকে ই-রিকশার সঙ্গে যুক্ত লাখো মানুষের জীবিকাও একটি নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে আসার সুযোগ পাবে।

তবে নতুন নিয়ম বাস্তবায়নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে ভারসাম্য। জননিরাপত্তা ও সড়কশৃঙ্খলা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ই-রিকশার ওপর নির্ভরশীল মানুষের অর্থনৈতিক বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে। কঠোরতা ও সহায়তার সমন্বিত প্রয়োগের মাধ্যমেই ব্যাটারিচালিত রিকশাকে নিরাপদ, নিয়ন্ত্রিত ও জনবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com