প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর বনানীতে গ্যাসের চুলার লিকেজ থেকে সৃষ্ট আগুনে গুরুতর দগ্ধ হয়ে চিকিৎসাধীন ফিলিপাইনের নাগরিক ক্রিস্টিন ভার (৩৩) আর বেঁচে ফিরতে পারলেন না। চার দিন ধরে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার পর রোববার দিবাগত রাত সাড়ে ৩টার দিকে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। আগুনে তার শরীরের ৬৩ শতাংশ পুড়ে গিয়েছিল বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন।
গত ২৮ অক্টোবর বনানীর ৭ নম্বর সড়কের একটি বাসায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। রান্নার জন্য গ্যাসের চুলা জ্বালাতে গেলে জমে থাকা গ্যাসে আগুন ধরে যায় বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ায় ক্রিস্টিন গুরুতর দগ্ধ হন। দুর্ঘটনার পর তাকে দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলেও শরীরের বড় অংশ পুড়ে যাওয়ায় তার অবস্থা শুরু থেকেই আশঙ্কাজনক ছিল।
বাসাটির ম্যানেজার মোহাম্মদ আল আমিনের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় রান্নার জন্য চুলা জ্বালানোর চেষ্টা করছিলেন ক্রিস্টিন। এ সময় হঠাৎ গ্যাস লিকেজ থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। দগ্ধ অবস্থায় তাকে প্রথমে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে স্থানান্তর করা হয়।
বিশেষায়িত বার্ন হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর চিকিৎসকেরা দেখতে পান, আগুনে তার শরীরের ৬৩ শতাংশ পুড়ে গেছে। গুরুতর দগ্ধ রোগীদের ক্ষেত্রে শরীরের ব্যাপক অংশে পোড়া ক্ষত তৈরি হলে চিকিৎসা অত্যন্ত জটিল হয়ে ওঠে। ক্রিস্টিনকেও তাই নিবিড় পর্যবেক্ষণের মধ্যে রাখা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টার পরও তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আবাসিক চিকিৎসক ডা. সুলতান মাহমুদ শিকদার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ওই ফিলিপাইনি নারী ৬৩ শতাংশ দগ্ধ অবস্থায় আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন। রোববার দিবাগত রাত সাড়ে ৩টার দিকে তার মৃত্যু হয়।
ক্রিস্টিনের বাংলাদেশে আসার ঘটনাটিও ছিল সাম্প্রতিক। বিভিন্ন প্রতিবেদনে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি গত ১৫ অক্টোবর পর্যটক ভিসায় বাংলাদেশে আসেন। এরপর বনানীর ৭ নম্বর সড়কের একটি বাসায় অবস্থান করছিলেন। তার সঙ্গে জাপানের নাগরিক নাকাসিমা ফুমিয়াকি ছিলেন। নাকাসিমা জানিয়েছেন, ক্রিস্টিন তার বান্ধবী ছিলেন এবং তারা দুজন ওই বাসায় একসঙ্গে অবস্থান করছিলেন।
বাংলাদেশে বেড়াতে এসে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হওয়া ক্রিস্টিনের মৃত্যুতে স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হয়েছে শোক ও উদ্বেগ। একজন বিদেশি নাগরিক হিসেবে তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন দেশের বিশেষায়িত বার্ন হাসপাতালে। দুর্ঘটনার পর তার চিকিৎসা এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।
ঘটনার পরপরই গ্যাস লিকেজের বিষয়টি সামনে আসে। তবে ঠিক কোথা থেকে গ্যাস বের হচ্ছিল, চুলা বা সংযোগের কারিগরি অবস্থা কেমন ছিল এবং দুর্ঘটনার পেছনে কোনো অবহেলা ছিল কি না—এসব প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় তদন্তের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে আবাসিক ভবনে গ্যাস ব্যবহারের ক্ষেত্রে সামান্য অসতর্কতাও কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে, বনানীর এই ঘটনা তা আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। অনেক সময় গ্যাসের গন্ধ পাওয়া গেলেও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। আবার কোনো কক্ষে গ্যাস জমে থাকলে বৈদ্যুতিক সুইচ, আগুনের শিখা কিংবা চুলা জ্বালানোর মুহূর্তেই বিস্ফোরণ বা অগ্নিকাণ্ড ঘটতে পারে। তাই গ্যাসের লিকেজ শনাক্ত করা এবং দুর্ঘটনার আগেই ঝুঁকি কমানো অত্যন্ত জরুরি।
ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে আবাসিক ভবনে গ্যাস, বৈদ্যুতিক সংযোগ ও রান্নার সরঞ্জামের নিরাপত্তা নিয়মিত পরীক্ষা করা না হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকেই যায়। বনানীর ঘটনাটি সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে মনে করিয়ে দিয়েছে। একটি ছোট ত্রুটি বা অদৃশ্য লিকেজ কীভাবে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে একজন মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে দিতে পারে, ক্রিস্টিনের মৃত্যু তার মর্মান্তিক উদাহরণ।
এ ঘটনায় চিকিৎসার পাশাপাশি পুলিশের পক্ষ থেকেও আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ পরিদর্শক হাবিবুর রহমান জানিয়েছেন, দগ্ধ অবস্থায় চিকিৎসাধীন ফিলিপাইনি নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। তার মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের মর্গে রাখা হয়েছে। বিষয়টি বনানী থানাকে জানানো হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
ময়নাতদন্ত ও তদন্তের মাধ্যমে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং সংশ্লিষ্ট কোনো দায়িত্ব বা অবহেলার বিষয় থাকলে তা স্পষ্ট হতে পারে। একই সঙ্গে বিদেশি নাগরিকের মৃত্যু হওয়ায় তার মরদেহ হস্তান্তর, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং পরবর্তী আনুষ্ঠানিকতার বিষয়গুলোও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সমন্বয়ের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হবে।
ক্রিস্টিনের মৃত্যু শুধু একটি দুর্ঘটনার খবর নয়; এর মধ্যে রয়েছে একজন পর্যটকের অসমাপ্ত বাংলাদেশ সফরের করুণ পরিণতি। ১৫ অক্টোবর যে দেশে তিনি ভ্রমণের উদ্দেশ্যে এসেছিলেন, মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে সেই দেশেই একটি আবাসিক বাসায় আগুনে গুরুতর দগ্ধ হয়ে তাকে জীবন হারাতে হলো। চিকিৎসকদের চেষ্টা, হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা এবং কয়েক দিনের অপেক্ষার পরও শেষ পর্যন্ত তার জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।
এই মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আবারও সামনে এসেছে আবাসিক নিরাপত্তার প্রশ্ন। গ্যাসের চুলা ব্যবহারের আগে সংযোগ পরীক্ষা করা, গ্যাসের গন্ধ পাওয়া গেলে কোনোভাবেই আগুন বা বৈদ্যুতিক সুইচ ব্যবহার না করা, দ্রুত জানালা-দরজা খুলে দেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়ার মতো সতর্কতাগুলো জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
একই সঙ্গে বাড়ির মালিক, ভবন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং ভাড়াটিয়াদেরও গ্যাসলাইন, চুলা ও সংযোগের নিরাপত্তা নিয়মিত পরীক্ষা করার বিষয়ে আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে বিদেশি পর্যটক বা নতুন ভাড়াটিয়ারা কোনো বাসায় উঠলে গ্যাস ও অন্যান্য জরুরি ব্যবস্থার নিরাপদ ব্যবহার সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য জানানোও গুরুত্বপূর্ণ।
বনানীর এই ঘটনায় একজন তরুণ বিদেশি নাগরিকের মৃত্যু তাই কেবল একটি পরিবারের জন্য নয়, নিরাপদ আবাসন ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার ক্ষেত্রেও একটি সতর্কবার্তা। তদন্তের মাধ্যমে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ক্রিস্টিন ভারের মর্মান্তিক মৃত্যু যেন আরেকটি অনিবার্য দুর্ঘটনা হিসেবে হারিয়ে না যায়; বরং তার মধ্য দিয়ে আবাসিক গ্যাস নিরাপত্তা নিয়ে আরও কঠোর সচেতনতা ও দায়িত্বশীলতার পথ তৈরি হয়।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত