ত্বকী হত্যা মামলায় এখনও চার্জশিট হয়নি

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬
  • ১৫ বার
ত্বকী হত্যা মামলায় এখনও চার্জশিট হয়নি

প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যা মামলায় দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও আদালতে এখনো অভিযোগপত্র বা চার্জশিট জমা পড়েনি। মামলার ১০৭তম ধার্য তারিখও পার হয়েছে। এরই মধ্যে আদালতের আগের নির্দেশনা অনুযায়ী তদন্তকারী কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা না করায় মামলার অন্যতম অভিযুক্ত রিফাত বিন ওসমানকে তার আইনজীবীসহ তদন্ত কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়ে সাক্ষাৎ করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

রোববার মামলার ধার্য তারিখে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এম সাইফুল ইসলাম এই নির্দেশ দেন। বাদীপক্ষের আইনজীবী প্রদীপ ঘোষ বাবু ও আবু ইশতিয়াক সিদ্দিকী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। আদালতের নতুন নির্দেশনার ফলে তদন্তে সহযোগিতার বিষয়ে রিফাত বিন ওসমানের ভূমিকা আবারও আলোচনায় এসেছে।

মামলার নথি ও সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের বক্তব্য অনুযায়ী, এর আগে ১০৬তম ধার্য তারিখে তদন্তকারী কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে রিফাত বিন ওসমানকে তার আইনজীবীসহ তদন্ত কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়ে দেখা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিনি সেখানে গিয়ে কথা বলেননি। ফলে পরবর্তী শুনানিতে আদালত একই নির্দেশনা আবার দিয়েছেন।

তবে রিফাত বিন ওসমান বর্তমানে জামিনে রয়েছেন এবং রোববার তিনি আদালতে সশরীরে হাজিরা দিয়েছেন। মামলায় জামিনে থাকা আরও কয়েকজন আসামিও এদিন আদালতে হাজির হন। অন্যদিকে, জামিনে যাওয়ার পর পলাতক হওয়া তিন আসামির বিরুদ্ধে আগে থেকেই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে।

মামলায় এ পর্যন্ত মোট ১০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। তাদের মধ্যে আজমেরী ওসমানের গাড়িচালক জামশেদ কারাগার থেকে আদালতে হাজিরা দিয়েছেন। জামিনে থাকা তায়েফ উদ্দীন জ্যাকি, ইউসুফ হোসেন লিটন, কাজল হাওলাদার, সাফায়েত হোসেন শিপন, ইয়ার মোহাম্মদ পারভেজ এবং রিফাত বিন ওসমানও আদালতে উপস্থিত ছিলেন। অপরদিকে সুলতান শওকত ভ্রমর, সালেহ রহমান সীমান্ত ও আবদুল্লাহ আল মামুন জামিনের পর থেকে পলাতক থাকায় তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি রয়েছে।

মামলার পরবর্তী শুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ১৪ ডিসেম্বর। ফলে অভিযোগপত্র দাখিলের অপেক্ষায় থাকা মামলাটির তদন্ত ও পরবর্তী আইনি কার্যক্রম নিয়ে আবারও সময়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে বাদীপক্ষ ও ত্বকীর পরিবারকে।

তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে ২০১৩ সালের মার্চে। ওই বছরের ৬ মার্চ নারায়ণগঞ্জ শহরের শায়েস্তা খাঁ সড়কের বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হন ত্বকী। দুই দিন পর ৮ মার্চ শীতলক্ষ্যা নদীর কুমুদিনী খাল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তখন তিনি ছিলেন একজন মেধাবী কিশোর। তার মৃত্যু নারায়ণগঞ্জের পাশাপাশি সারা দেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।

হত্যাকাণ্ডের পর ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি বাদী হয়ে মামলা করেন। পরে তদন্তে নামে র‌্যাব। মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে সুলতান শওকত ভ্রমর ও ইউসুফ হোসেন লিটনসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে ভ্রমর ও লিটন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন বলে মামলার সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

২০১৪ সালের ৫ মার্চ র‌্যাব এক সংবাদ সম্মেলনে ত্বকী হত্যাকাণ্ডের তদন্তের অগ্রগতি তুলে ধরে। তখন সংস্থাটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, ওসমান পরিবারের নির্দেশে আজমেরী ওসমানের নেতৃত্বে ১১ জন ত্বকীকে হত্যা করেছে। একই সঙ্গে তদন্ত শেষে দ্রুত আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার কথা জানানো হয়েছিল।

কিন্তু সেই ঘোষণার পরও বছরের পর বছর কেটে গেছে। মামলার তদন্ত শেষ করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন সময়ে তদন্তকারী সংস্থা আদালতের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন বা অভিযোগপত্র দাখিলের জন্য সময় চেয়েছে। আদালতও বিভিন্ন সময়ে তদন্ত শেষ করার জন্য সময় নির্ধারণ করেছেন। তবু মামলাটি এখনো অভিযোগপত্র দাখিলের পর্যায়েই আটকে আছে।

২০২৬ সালেও মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য একাধিকবার সময় নেওয়া হয়েছে। আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা না পড়ায় বিচারিক কার্যক্রমও শুরু হয়নি। ফলে হত্যাকাণ্ডের এক যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও মামলার বিচার প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।

মামলার এই দীর্ঘসূত্রতা ত্বকীর পরিবার ও স্বজনদের জন্য গভীর হতাশার কারণ হয়ে আছে। একটি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও বিচার দীর্ঘ সময় ধরে ঝুলে থাকলে স্বাভাবিকভাবেই ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। ত্বকীর পরিবার দীর্ঘদিন ধরে দ্রুত তদন্ত শেষ করে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়ে আসছে।

ত্বকী হত্যার পর থেকে নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটও নিয়মিতভাবে বিচারের দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে। প্রতি মাসের ৮ তারিখে তারা মোমশিখা প্রজ্বালন কর্মসূচির মাধ্যমে ত্বকী হত্যার বিচার এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে আসছে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই কর্মসূচি নারায়ণগঞ্জে মামলাটির বিচার দাবির অন্যতম প্রতীকী কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে।

এদিকে মামলার তদন্তে অভিযুক্তদের ভূমিকা এবং তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে তাদের যোগাযোগের বিষয়টি সাম্প্রতিক শুনানিতে নতুন করে সামনে এসেছে। রিফাত বিন ওসমানকে তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য আদালতের নির্দেশের বিষয়টি তদন্তের প্রয়োজনে নেওয়া একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল না হওয়া পর্যন্ত মামলার অভিযোগগুলোর বিচারিক সত্যতা নির্ধারিত হয়নি—এ বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

কারও বিরুদ্ধে তদন্তে অভিযোগ থাকা বা মামলায় আসামি হিসেবে নাম থাকা মানেই আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং দায় নির্ধারণের জন্য আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়া প্রয়োজন। ফলে তদন্তকারী সংস্থার দায়িত্ব হচ্ছে প্রয়োজনীয় সাক্ষ্য, আলামত ও অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ যথাযথভাবে যাচাই করে একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন বা অভিযোগপত্র আদালতে উপস্থাপন করা।

ত্বকী হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে দীর্ঘ তদন্তের কারণে এখন প্রশ্ন উঠছে, আর কত সময় লাগবে মামলাটির তদন্ত শেষ হতে এবং কখন শুরু হবে বিচারিক কার্যক্রম। সময় যত গড়াচ্ছে, পরিবার ও স্বজনদের অপেক্ষাও তত দীর্ঘ হচ্ছে। একটি হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার শুধু একটি পরিবারের প্রত্যাশা নয়; এটি আইনের শাসন ও বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থার সঙ্গেও সম্পর্কিত।

তাই তদন্তের প্রতিটি ধাপ স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করে দ্রুত আদালতে প্রয়োজনীয় প্রতিবেদন দাখিল করা এখন গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের আইনগত অধিকার নিশ্চিত করে নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। দীর্ঘদিনের এই মামলায় প্রকৃত ঘটনা ও দায়ীদের বিষয়ে আদালতের মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসাই এখন সবচেয়ে বেশি প্রত্যাশিত।

২০১৩ সালের ৬ মার্চ ত্বকীর নিখোঁজ হওয়া থেকে শুরু করে ৮ মার্চ তার মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা নারায়ণগঞ্জের মানুষের স্মৃতিতে আজও গভীরভাবে রয়েছে। সেই ঘটনার বিচার প্রত্যাশায় কেটে গেছে ১৩ বছরেরও বেশি সময়। ১০৭তম ধার্য তারিখেও অভিযোগপত্র জমা না পড়ায় অপেক্ষার প্রহর আরও দীর্ঘ হলো। আগামী ১৪ ডিসেম্বর মামলার পরবর্তী তারিখে তদন্ত ও অভিযোগপত্রের বিষয়ে নতুন কোনো অগ্রগতি আসে কি না, এখন সেদিকেই তাকিয়ে আছেন মামলার বাদীপক্ষ, পরিবার ও দীর্ঘদিন ধরে বিচার দাবি করে আসা মানুষজন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com