৩৫ উড়োজাহাজ কেনার আগে সম্ভাব্যতা যাচাই নিয়ে প্রশ্ন

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬
  • ১৩ বার
৩৫ উড়োজাহাজ কেনার আগে সম্ভাব্যতা যাচাই নিয়ে প্রশ্ন

প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জন্য ২৫টি বোয়িং ও ১০টি এয়ারবাসসহ মোট ৩৫টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তির আগে প্রয়োজনীয় সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে জাতীয় সংসদের বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে। উড়োজাহাজগুলো কোন কোন রুটে পরিচালিত হবে, সেসব রুটে পর্যাপ্ত যাত্রী চাহিদা রয়েছে কি না এবং এত বড় ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়েছে কি না—এসব বিষয়েও জানতে চেয়েছেন কমিটির সদস্যরা।

রোববার জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত কমিটির বৈঠকে উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয় বলে জানা গেছে। বৈঠকে কমিটির সদস্য জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য কামরুল হাসান জানতে চান, ৩৫টি উড়োজাহাজ কেনার আগে ফিজিবিলিটি স্টাডি বা সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছে কি না। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এসব উড়োজাহাজ কোন কোন রুটে ব্যবহার করা হবে, যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা ও সম্ভাব্য চাহিদা কী এবং ক্রয় প্রক্রিয়াটি কতটা স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে—এসব বিষয়ও তিনি জানতে চান।

এত বড় পরিমাণে উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা নিয়ে সংসদীয় কমিটির এমন প্রশ্নকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ একটি বিমান কেনার সঙ্গে শুধু ক্রয়মূল্যই জড়িত থাকে না; এর সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণ, পরিচালন ব্যয়, জনবল, প্রশিক্ষণ, জ্বালানি, যন্ত্রাংশ, বিমা এবং নির্দিষ্ট রুটে পর্যাপ্ত যাত্রী নিশ্চিত করার মতো বিষয়ও যুক্ত থাকে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি বহর সম্প্রসারণের আগে আর্থিক ও বাণিজ্যিক বাস্তবতা যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

কমিটির প্রশ্নের জবাবে বিমানমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত জানান, ৩৫টি উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কয়েকটি ধাপ রয়েছে। সব উড়োজাহাজ দেশে আসতে ২০৪০ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। অর্থাৎ একসঙ্গে পুরো বহর হাতে আসছে না; দীর্ঘ সময়ের মধ্যে পর্যায়ক্রমে উড়োজাহাজগুলো যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

মন্ত্রী আরও জানান, উড়োজাহাজ কেনার অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে সফট লোন ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব উড়োজাহাজ পরিচালনা করে যে আয় হবে, তা দিয়েই সংশ্লিষ্ট ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব হবে বলে বৈঠকে জানানো হয়। সরকারের পক্ষ থেকে বহর সম্প্রসারণের আর্থিক কাঠামো নিয়ে এ ব্যাখ্যা দেওয়া হলেও সংসদীয় কমিটির আলোচনায় সম্ভাব্যতা যাচাই, রুট পরিকল্পনা ও যাত্রী চাহিদার বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জন্য বোয়িং থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি দুই ধাপে সম্পন্ন হয়েছে। গত ৩০ এপ্রিল ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি এবং ২৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে আরও ১১টি উড়োজাহাজ কেনার সম্পূরক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর বাইরে গত ৭ অক্টোবর এয়ারবাস থেকে আরও ১০টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করা হয়েছে। সব মিলিয়ে দুই নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে মোট ৩৫টি উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

বহর সম্প্রসারণের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমে পরিবর্তন আসতে পারে। নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হলে পুরোনো বা অপেক্ষাকৃত কম দক্ষ উড়োজাহাজের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে নতুন রুট চালু, বিদ্যমান রুটে ফ্লাইট বাড়ানো কিংবা যাত্রীসেবা সম্প্রসারণের সুযোগও তৈরি হতে পারে। তবে এর বাস্তব সুফল কতটা পাওয়া যাবে, তা নির্ভর করবে সঠিক রুট নির্বাচন, যাত্রী চাহিদা, পরিচালন দক্ষতা এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার ওপর।

বৈঠকে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। টার্মিনাল নির্মাণে প্রকৃত ব্যয় কত হয়েছে এবং অতিরিক্ত ব্যয়ের ক্ষেত্রে কোনো অর্থের অপব্যবহার হয়েছে কি না, তা জানতে চাওয়া হয়। একই সঙ্গে আগামী ১৬ ডিসেম্বর টার্মিনাল চালুর যে সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটি বহাল থাকবে কি না, সে বিষয়েও কমিটির পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়েছে।

তৃতীয় টার্মিনালের ব্যয় বৃদ্ধি ও অতীতের বিভিন্ন কেনাকাটার বিষয় খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠনের দাবিও বৈঠকে তোলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কামরুল হাসান। তবে এ বিষয়ে বৈঠকে কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি। ফলে টার্মিনাল নির্মাণের ব্যয় ও অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণ নিয়ে আরও পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তা আলোচনায় থাকলেও তাৎক্ষণিকভাবে তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়নি।

বিমানবন্দরের সার্বিক কার্যক্রমের অগ্রগতি এবং বিভিন্ন কেনাকাটার বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। গত মার্চ পর্যন্ত বিমানবন্দরের কার্যক্রমের কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে এবং কী কী কেনাকাটা করা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন পরবর্তী সময়ে সংসদীয় কমিটির কাছে উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি ও ক্রয় কার্যক্রম সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য পর্যালোচনার সুযোগ পাবে কমিটি।

বিমানবন্দরে ট্রলি সংকট নিয়েও আলোচনা হয়। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে ট্রলির সমস্যা স্থায়ীভাবে সমাধান হবে। যাত্রীদের বিমানবন্দরে প্রবেশ থেকে শুরু করে লাগেজ সংগ্রহ ও বের হয়ে আসার পুরো প্রক্রিয়ায় ট্রলির মতো মৌলিক সুবিধার গুরুত্ব রয়েছে। ফলে তৃতীয় টার্মিনাল চালুর সঙ্গে এ ধরনের সেবা নিশ্চিত করার বিষয়টিও যাত্রীসেবার মান উন্নয়নের অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বিমানবন্দরে জনবল নিয়োগ ও কর্মকর্তাদের পদায়নের বিষয়েও কমিটির বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তাদের কোনো ধরনের ট্যাগ দিয়ে সরিয়ে না দেওয়ার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে বিমানবন্দরের কারিগরি পদগুলোতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের পদায়ন নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে। বিমানবন্দরের মতো কারিগরি ও নিরাপত্তানির্ভর প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব অনুযায়ী দক্ষ জনবল নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি এতে গুরুত্ব পেয়েছে।

সংসদ সচিবালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অধীন সিভিল অ্যাভিয়েশন, বিমান ও পর্যটনের কেনাকাটা, বদলি, নিয়োগ এবং বিমানবন্দরের সার্বিক ব্যবস্থাপনা তদারকিতে পাঁচ সদস্যের একটি সাবকমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। একই সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের শূন্য পদগুলো যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করে দ্রুত পূরণের সুপারিশ করা হয়েছে।

এ ছাড়া গত আট মাসে সিভিল অ্যাভিয়েশনের কার্যক্রম বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং বিভিন্ন কেনাকাটার বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। এসব তথ্যের মাধ্যমে বিমান ও বিমানবন্দর খাতে চলমান কার্যক্রমের অগ্রগতি, ব্যয় এবং ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সংসদীয় পর্যায়ে আরও নিবিড়ভাবে নজরদারি করার সুযোগ তৈরি হবে।

বৈঠকে বিদেশের সঙ্গে কোনো চুক্তি করার ক্ষেত্রে দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। কমিটির পক্ষ থেকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের স্বার্থে যোগ্যতাসম্পন্ন জনবলকে উপযুক্ত জায়গায় পদায়নের সুপারিশ করা হয়েছে এবং মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য নিয়মিত বৈঠক আয়োজনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সব মিলিয়ে ৩৫টি উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা থেকে শুরু করে তৃতীয় টার্মিনালের ব্যয়, বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপনা, জনবল নিয়োগ ও পদায়ন—বৈঠকে বেসামরিক বিমান খাতের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। নতুন উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পাশাপাশি সেই বহর কীভাবে লাভজনকভাবে পরিচালনা করা হবে, কোন রুটে ব্যবহার করা হবে এবং যাত্রী চাহিদার সঙ্গে তা কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যতে প্রকল্পটির সফলতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বহর সম্প্রসারণের মতো দীর্ঘমেয়াদি ও বড় আর্থিক সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা, যথাযথ পরিকল্পনা এবং বাস্তবভিত্তিক সম্ভাব্যতা যাচাই নিশ্চিত করা হলে দেশের বিমান পরিবহন খাত আরও কার্যকরভাবে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেতে পারে। সংসদীয় কমিটির সাম্প্রতিক আলোচনায় তাই শুধু উড়োজাহাজ কেনার বিষয় নয়, বরং সেই বিনিয়োগের কার্যকারিতা, জবাবদিহি ও দীর্ঘমেয়াদি সুফল নিশ্চিত করার বিষয়টিও সামনে এসেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com