প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর দ্বিতীয়বারের মতো মোংলা বন্দর সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আগামীকাল বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকালে তাঁর এই সফরকে কেন্দ্র করে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দরের অবকাঠামো উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সফরের অন্যতম প্রধান কর্মসূচি হিসেবে মোংলা বন্দরে নতুন দুটি আধুনিক কনটেইনার জেটি নির্মাণ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী। প্রায় ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাণিজ্যিক কার্যক্রমে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
মোংলা বন্দর বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। ভৌগোলিক অবস্থান, নৌপথের যোগাযোগ এবং পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থায় পরিবর্তনের ফলে বন্দরটির গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠান, আমদানিকারক, রপ্তানিকারক এবং ব্যবসায়ীদের জন্য একটি কার্যকর বিকল্প সমুদ্রবন্দর হিসেবে মোংলার সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত হচ্ছে। নতুন দুটি কনটেইনার জেটি নির্মাণের উদ্যোগকে সেই প্রয়োজন পূরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহম্মেদ মোস্তফা জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় প্রধানমন্ত্রী বন্দরে পৌঁছাবেন। এরপর বন্দরের সুবিধাদি সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় দুটি নতুন কনটেইনার জেটি নির্মাণ এবং আনুষঙ্গিক অবকাঠামো উন্নয়নকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর এই আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে প্রকল্পটির নির্মাণ কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে গত ১০ অক্টোবর চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। মোট ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পে বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থাকবে ৪৭৫ কোটি টাকা। বাকি ৩ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকা অর্থায়ন করবে চীন। চীনের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংকের মাধ্যমে দেওয়া এই ঋণের সুদের হার ২ শতাংশ। ঋণ পরিশোধের মেয়াদ ২০ বছর, যার মধ্যে পাঁচ বছর গ্রেস পিরিয়ড হিসেবে নির্ধারিত রয়েছে। ফলে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক দায় ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।
প্রকল্পের আওতায় ৩৬৮ মিটার দৈর্ঘ্যের দুটি আধুনিক কনটেইনার জেটি নির্মাণের পাশাপাশি কনটেইনার সংরক্ষণ ও পণ্য ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় ইয়ার্ড এবং অন্যান্য অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে। বিপজ্জনক পণ্য বা ডেঞ্জারাস কার্গো নিরাপদে ওঠানামা ও ব্যবস্থাপনার জন্যও বিশেষ সুবিধা রাখা হচ্ছে। নতুন কনটেইনার ইয়ার্ডে যুক্ত করা হবে ৪৯টি আধুনিক যন্ত্রপাতি। এসব সরঞ্জাম ব্যবহারের মাধ্যমে বন্দরের পণ্য ওঠানামার কার্যক্রম আরও দ্রুত, নিরাপদ ও দক্ষভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নতুন অবকাঠামো চালু হলে ঘণ্টায় ৩০টির বেশি কনটেইনার ওঠানো-নামানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে বছরে চার লাখ টিইইউ কনটেইনার পরিচালনার সক্ষমতা অর্জন করবে মোংলা বন্দর। টিইইউ বলতে ২০ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি কনটেইনারের সমমানের একককে বোঝানো হয়। এই সক্ষমতা বৃদ্ধি বন্দরের কার্যক্রমে গুণগত পরিবর্তন আনতে পারে। বর্তমানে যেসব ব্যবসায়ী পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে অন্য বন্দরের ওপর বেশি নির্ভরশীল, তাঁদের একটি অংশ ভবিষ্যতে মোংলাকে বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করতে পারবেন।
তবে শুধু জেটি নির্মাণ করলেই বন্দরের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব হবে না। জাহাজ চলাচলের উপযোগী নাব্যতা, পণ্য পরিবহনের জন্য সড়ক ও রেল যোগাযোগ, কাস্টমস কার্যক্রমের দক্ষতা এবং পণ্য সংরক্ষণের পর্যাপ্ত সুবিধা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে মোংলা বন্দরকে একটি সমন্বিত বাণিজ্যিক যোগাযোগকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও গুরুত্ব পাচ্ছে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর বৃহস্পতিবারের সফরে মোংলা বন্দরের সঙ্গে রেল যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার বিষয়েও একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হওয়ার কথা রয়েছে। একই দিন বন্দরের ৯ নম্বর জেটিতে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এবং চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের কথা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলে মোংলা বন্দরের সঙ্গে রেলপথে পণ্য পরিবহনের সম্ভাবনা আরও জোরালো হতে পারে।
বাগেরহাট-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, চীনের সঙ্গে প্রস্তাবিত সমঝোতার মাধ্যমে মোংলা বন্দরের সঙ্গে রেলওয়ের সংযোগ স্থাপনের সুযোগ তৈরি হবে। এর ফলে আইসিডি বা অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপো থেকে পণ্য রেলপথে মোংলা বন্দরে আনা সম্ভব হবে। পরে সেসব পণ্য বন্দরের জেটি ব্যবহার করে জাহাজে করে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গন্তব্যে পাঠানো যাবে।
রেল যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হলে পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় কমানোর পাশাপাশি সড়কপথের ওপর চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে দেশের শিল্পাঞ্চল থেকে কাঁচামাল ও তৈরি পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে রেলপথ একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে। আমদানি করা যন্ত্রপাতি, শিল্পের কাঁচামাল এবং রপ্তানিযোগ্য পণ্য পরিবহনে সমন্বিত রেল ও নৌ যোগাযোগ চালু হলে ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন সুবিধা তৈরি হবে। তবে এই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে রেল সংযোগের অবকাঠামো, পণ্য ওঠানামার ব্যবস্থা এবং পরিচালনাগত সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে।
মোংলা বন্দরের উন্নয়নের সঙ্গে স্থানীয় অর্থনীতিরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বন্দরের কার্যক্রম সম্প্রসারিত হলে জাহাজ পরিচালনা, পণ্য খালাস, পরিবহন, গুদামজাতকরণ, শুল্কায়ন এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন পেশার মানুষের কাজের সুযোগ বাড়তে পারে। শিপিং এজেন্ট, ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং এজেন্ট, পরিবহন প্রতিষ্ঠান, শ্রমিক এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এর মাধ্যমে উপকৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বন্দরের আশপাশে নতুন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সহায়ক সেবা গড়ে উঠলেও স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র বিস্তৃত হতে পারে।
বিশেষ করে বাগেরহাট, খুলনা, যশোর, সাতক্ষীরা এবং আশপাশের অঞ্চলের ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের জন্য মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ। পদ্মা সেতু চালুর পর দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীসহ অন্যান্য অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগে যে পরিবর্তন এসেছে, তার সঙ্গে বন্দর অবকাঠামোর উন্নয়ন যুক্ত হলে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। তবে সেই সুফল নিশ্চিত করতে স্থানীয় সড়ক যোগাযোগ, শিল্পাঞ্চল, গুদাম এবং পরিবহনসেবার উন্নয়নও প্রয়োজন।
এর আগে গত ২২ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মোংলা বন্দর ও সুন্দরবন পরিদর্শন করেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর অল্প সময়ের ব্যবধানে দ্বিতীয়বারের মতো এই বন্দর সফরকে কেন্দ্র করে সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনায় মোংলার গুরুত্বের বিষয়টি সামনে এসেছে। দেশের সমুদ্রবন্দরগুলোর মধ্যে সক্ষমতা ও কার্যক্রমের ভারসাম্য তৈরি করা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য বিকল্প সুবিধা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে মোংলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বৃহস্পতিবার মোংলা বন্দরের কর্মসূচি শেষ করে সড়কপথে বাগেরহাটে যাবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তিনি হযরত খানজাহান আলীর মাজার জিয়ারত করবেন। এরপর খুলনায় গিয়ে ‘নতুন কুঁড়ি সিজন-২’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। এসব কর্মসূচি শেষে প্রধানমন্ত্রীর ঢাকায় ফেরার কথা রয়েছে।
সামগ্রিকভাবে নতুন দুটি কনটেইনার জেটি নির্মাণ এবং রেল যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ মোংলা বন্দরের ভবিষ্যৎ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে প্রকল্পের সফলতা নির্ভর করবে নির্ধারিত সময়ে নির্মাণকাজ শেষ করা, অর্থের যথাযথ ব্যবহার, আধুনিক যন্ত্রপাতির কার্যকর পরিচালনা এবং বন্দরের সঙ্গে অন্যান্য পরিবহনব্যবস্থার সমন্বয়ের ওপর। পাশাপাশি চীনা ঋণের অর্থনৈতিক দায় ও প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সুফলও যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। পরিকল্পিত উন্নয়ন বাস্তবায়িত হলে মোংলা বন্দর শুধু দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নয়, বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের একটি আরও শক্তিশালী কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করবে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত