ইরানের কেশম দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার খবর প্রকাশ্যে আসার পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে আবারও অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) লেনদেনের শুরুতে ব্রেন্ট ক্রুড ও যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই)—উভয় ধরনের তেলের দর ঊর্ধ্বমুখী হয়। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা এবং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বাজারের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার গ্রিনিচ মান সময় রাত ১টা ৪ মিনিটে আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম আগের অবস্থানের তুলনায় ব্যারেলপ্রতি ৪৮ সেন্ট বেড়ে ১০৫ ডলার ২৫ সেন্টে পৌঁছায়। শতকরা হিসাবে এই বৃদ্ধি প্রায় শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ডব্লিউটিআই অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৪৭ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ৯৬ ডলার ৯৩ সেন্টে। সামরিক উত্তেজনার খবরের পর বাজারে এই মূল্যবৃদ্ধি বিনিয়োগকারী ও জ্বালানি খাতের ব্যবসায়ীদের নজর কেড়েছে।
তবে মঙ্গলবারের এই ঊর্ধ্বগতির আগে সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে উল্লেখযোগ্য পতন হয়েছিল। ওই দিন ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮ ডলার ৬৬ সেন্ট কমে যায়, যা প্রায় ৭ দশমিক ৬৩ শতাংশ পতনের সমান। দিন শেষে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট তেলের দাম নেমে দাঁড়ায় ১০৪ ডলার ৭৭ সেন্টে। অর্থাৎ এক দিনের বড় দরপতনের পর নতুন সামরিক উত্তেজনার খবরে বাজার আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। এই ওঠানামা আন্তর্জাতিক তেলবাজারে চলমান অনিশ্চয়তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানের কেশম দ্বীপে হামলা চালিয়েছে বলে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। দেশটির কয়েকজন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে হামলার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই অভিযানকে আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তাঁদের দাবি, হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর ইরানের হামলা চালানোর সক্ষমতা কমিয়ে আনাই ছিল অভিযানের অন্যতম উদ্দেশ্য। তবে হামলার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ, ক্ষয়ক্ষতি এবং এর পরবর্তী পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
কেশম দ্বীপ ভৌগোলিক ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটি হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি অবস্থিত। পারস্য উপসাগর থেকে ওমান উপসাগর এবং আরব সাগরের দিকে জাহাজ চলাচলের জন্য এই প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশ এই পথের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ করে। ফলে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা তৈরি হলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেই প্রভাব ফেলে না, বরং বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারেও দ্রুত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় হরমুজ প্রণালির গুরুত্বের কারণে এই জলপথে যেকোনো ধরনের সংঘাত বা নৌ চলাচলে বিঘ্নের আশঙ্কা তেল ব্যবসায়ীদের উদ্বিগ্ন করে তোলে। এই পথে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এমনকি বাস্তবে সরবরাহ বন্ধ না হলেও সম্ভাব্য বিঘ্নের আশঙ্কা বাজারে অতিরিক্ত ঝুঁকির মূল্য যুক্ত করতে পারে। ফলে সামরিক উত্তেজনার খবর প্রকাশিত হওয়ার পরপরই তেলের দামে পরিবর্তন দেখা যায়।
জ্বালানি বাজারে তেলের দাম নির্ধারণে শুধু উৎপাদন ও চাহিদাই ভূমিকা রাখে না; সরবরাহের নিরাপত্তা, পরিবহন ব্যয়, ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি, মজুতের পরিমাণ এবং ভবিষ্যৎ সরবরাহের পূর্বাভাসও গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্য বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান অঞ্চল হওয়ায় সেখানে সংঘাতের আশঙ্কা দেখা দিলে বাজারের প্রতিক্রিয়া সাধারণত দ্রুত হয়। বিশেষ করে তেল পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়।
ব্রেন্ট ক্রুড সাধারণত আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের অন্যতম প্রধান মূল্যমান হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে ডব্লিউটিআই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে গুরুত্বপূর্ণ বেঞ্চমার্ক। দুই ধরনের তেলের দামের পরিবর্তন আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতি বুঝতে সহায়তা করে। মঙ্গলবার উভয় বাজারে দাম বাড়ার বিষয়টি দেখাচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ কেবল একটি অঞ্চলের বাজারে সীমাবদ্ধ নেই; বরং আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এর প্রভাব পড়ছে।
তেলের দাম দীর্ঘ সময় ধরে বেশি থাকলে এর প্রভাব জ্বালানি খাতের বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, কৃষি ও পণ্য সরবরাহব্যবস্থায় জ্বালানির ব্যবহার ব্যাপক। অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে পরিশোধিত জ্বালানি উৎপাদন ও আমদানির ব্যয়ও বাড়তে পারে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত পণ্য পরিবহন ও উৎপাদন খরচে যুক্ত হয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করে।
বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের দীর্ঘস্থায়ী ঊর্ধ্বগতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে দেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং পরিবহন খাতের ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা থাকে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে এক দিনের মূল্যবৃদ্ধি মানেই দেশে সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানির দাম বেড়ে যাবে, এমন নয়। আমদানির চুক্তি, মজুত, পরিশোধন ব্যয়, সরকারি মূল্যনীতি এবং বাজার পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে স্থানীয় বাজারে এর প্রভাব নির্ধারিত হয়।
বিশ্ববাজারে তেলের দামের ওঠানামা সাধারণ মানুষের জীবনেও পরোক্ষ প্রভাব ফেলতে পারে। জ্বালানির ব্যয় বাড়লে পণ্য পরিবহন ও উৎপাদনের খরচ বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। এতে খাদ্যপণ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের দামেও চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলো মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে থাকলে জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যয় তাদের দৈনন্দিন বাজেটে নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি বাংলাদেশের নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী এবং ভোক্তা—সবার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা আরও বাড়লে জ্বালানি পরিবহনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ গভীর হতে পারে। হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ অঞ্চলে সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে জাহাজের নিরাপত্তা, বীমা ব্যয়, পরিবহন সময় এবং সরবরাহের ধারাবাহিকতা নিয়ে নতুন সমস্যা তৈরি হতে পারে। তবে পরিস্থিতি কতটা বিস্তৃত হবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর পরবর্তী পদক্ষেপ এবং কূটনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।
বর্তমান পরিস্থিতিতে তেলের বাজারের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কেশম দ্বীপে হামলার পর ইরানের প্রতিক্রিয়া কী হয়, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক থাকে কি না এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ আরও বিস্তৃত হয় কি না—এসব বিষয় বিনিয়োগকারীরা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ, উৎপাদনকারী দেশগুলোর সিদ্ধান্ত এবং বৈশ্বিক চাহিদার পরিবর্তনও দামের ওপর প্রভাব ফেলবে।
সব মিলিয়ে সোমবারের বড় দরপতনের পর মঙ্গলবার তেলের দাম আবার বাড়ার ঘটনা বিশ্ব জ্বালানি বাজারের ভঙ্গুর পরিস্থিতি তুলে ধরেছে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার খবর এবং হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাজারে নতুন চাপ তৈরি করেছে। সামরিক উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে তার প্রভাব শুধু তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; আমদানিনির্ভর অর্থনীতি ও সাধারণ ভোক্তাদের ওপরও পড়তে পারে। তাই আগামী দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক তেলের দামের গতিপথ বিশ্ব অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত