চাঁদপুর সদর উপজেলায় পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরে ছোট ভাই ও তাঁর স্ত্রীর মারধরে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এক ব্যক্তির মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। নিহত ব্যক্তির নাম শাহজাহান পাটোয়ারী। সোমবার সন্ধ্যায় উপজেলার নিজগাছতলা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত ছোট ভাই শাহ আলম পাটোয়ারী ও তাঁর স্ত্রী হাসিনা আক্তার পলাতক রয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
নিহত শাহজাহান পাটোয়ারী নিজগাছতলা গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। তিনি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ছিলেন এবং সরকারি প্রতিবন্ধী ভাতা পেতেন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সম্পত্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তাঁর বিরোধ চলছিল বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সেই বিরোধের জেরেই তাঁকে মারধর করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য অনুযায়ী, শাহজাহানের সঙ্গে তাঁর ছোট ভাই শাহ আলম পাটোয়ারীর সম্পত্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে দুই পরিবারের মধ্যে একাধিকবার উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বিরোধ মীমাংসার জন্য স্থানীয়ভাবে উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই উদ্যোগে স্থায়ী সমাধান হয়নি বলে জানিয়েছেন এলাকার বাসিন্দারা।
অভিযোগ রয়েছে, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরে শাহ আলম ও তাঁর স্ত্রী হাসিনা আক্তার বিভিন্ন সময়ে শাহজাহানকে মারধর করতেন। সোমবার সন্ধ্যাতেও তাঁরা তাঁকে মারধর করেন বলে স্থানীয়দের দাবি। পরে তাঁকে বাড়ির পাশের একটি বাঁশঝাড়ে ফেলে রাখা হয়। সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। খবর পেয়ে চাঁদপুর মডেল থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে শাহজাহানের মরদেহ উদ্ধার করে। পরে মরদেহের সুরতহাল ও প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করতে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে পাঠানোর কথা জানিয়েছে পুলিশ।
বাগাদী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য জাকির হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, শাহজাহান দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ছিলেন এবং সরকারি প্রতিবন্ধী ভাতা পেতেন। দুই ভাইয়ের মধ্যে সম্পত্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। স্থানীয়ভাবে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টাও করা হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সেই বিরোধের অবসান হয়নি।
চাঁদপুর মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. ফেরদৌস হোসেন জানান, ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ হাসপাতালে পাঠানো হবে। ঘটনাটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
এ ঘটনায় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শাহজাহানের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণ এবং অভিযোগের সত্যতা যাচাই। স্থানীয়দের বক্তব্যে মারধরের অভিযোগ সামনে এলেও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও পুলিশের তদন্তের আগে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। একইভাবে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্যও জানা যায়নি। তাঁরা পলাতক থাকায় তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক ও আইনি জটিলতার কারণ হয়ে উঠছে। জমি, বসতভিটা, উত্তরাধিকার কিংবা সম্পত্তির ভাগ-বণ্টন নিয়ে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিরোধ কখনো কখনো দীর্ঘস্থায়ী বিরোধে রূপ নেয়। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে সালিস বা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা হলেও সব বিরোধের স্থায়ী নিষ্পত্তি হয় না। বিরোধের সমাধান না হলে তা পারিবারিক সম্পর্কের পাশাপাশি সামাজিক শান্তিও নষ্ট করতে পারে।
শাহজানের ঘটনাটি সেই বাস্তবতার একটি উদ্বেগজনক উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে। বিশেষ করে তিনি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ছিলেন এবং সরকারি প্রতিবন্ধী ভাতার ওপর নির্ভরশীল ছিলেন—এ তথ্য ঘটনাটিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে একজন মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও চলাচলে বাড়তি সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। এমন অবস্থায় পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে সহযোগিতা ও নিরাপত্তা পাওয়ার প্রত্যাশা স্বাভাবিক। তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় ওঠা অভিযোগ তাই শুধু একটি পারিবারিক বিরোধের বিষয় নয়; প্রতিবন্ধী ব্যক্তির নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে।
তবে এ ধরনের ঘটনায় আবেগের পাশাপাশি তথ্যের নির্ভুলতা ও আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা জরুরি। অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করা যায় না। তদন্তে ঘটনার সময়কার পরিস্থিতি, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, মরদেহের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য গ্রহণের সুযোগও আইনি প্রক্রিয়ার অংশ।
স্থানীয় পর্যায়ে সম্পত্তি বিরোধের সমাধানে স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা এবং আইনসম্মত পদ্ধতি অনুসরণ করা প্রয়োজন। কোনো বিরোধ দীর্ঘদিন ধরে চললে তা উপেক্ষা না করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহায়তা নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে পরিবারের কোনো সদস্য শারীরিকভাবে অসহায় বা প্রতিবন্ধী হলে তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পরিবার ও সমাজ—উভয়েরই রয়েছে।
শাহজান পাটোয়ারীর মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় শোক ও উদ্বেগের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এখন তাঁর পরিবারের সদস্যরা যেমন ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা করছেন, তেমনি স্থানীয় বাসিন্দারাও ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রকৃত সত্য প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছেন। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং পুলিশের তদন্তের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে মৃত্যুর কারণ ও দায় নির্ধারণের পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ।
চাঁদপুরের এই ঘটনায় একটি পরিবারের দীর্ঘদিনের সম্পত্তি বিরোধ কীভাবে ভয়াবহ পরিণতির অভিযোগে গড়িয়েছে, তা তদন্তে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে পারিবারিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ ও আইনসম্মত নিষ্পত্তি এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত