প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আবারও ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে উত্তর কোরিয়া। কৌশলগত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য তৈরি একটি বিশেষ ওয়ারহেডের সক্ষমতা যাচাই করতে সোমবার এই পরীক্ষা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম। পরীক্ষার মাধ্যমে ওয়ারহেডটির বিস্ফোরণক্ষমতা এবং লক্ষ্যবস্তুতে ওপর থেকে সরাসরি আঘাত হানার সময় এর কার্যকারিতা যাচাই করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে এই পরীক্ষা পরিচালিত হয়। দেশটির দাবি, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন সামরিক প্রদর্শন নয়; বরং গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রব্যবস্থার সক্ষমতা উন্নয়নের ধারাবাহিক গবেষণা ও পরীক্ষার অংশ। তবে নতুন এই পরীক্ষা উত্তর কোরিয়ার সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর প্রচেষ্টাকে আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনার সামনে নিয়ে এসেছে।
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরীক্ষায় মাঝারি আকারের একটি ওয়ারহেড ব্যবহার করা হয়েছে। দেশটির সংশ্লিষ্ট ওয়ারহেড ইনস্টিটিউট দাবি করেছে, ওয়ারহেডটির সর্বোচ্চ বিস্ফোরণক্ষমতা প্রয়োগ করা হলে প্রায় ৫ থেকে ৬ হেক্টর এলাকাজুড়ে ব্যাপক ধ্বংস ঘটানো সম্ভব। এই দাবি থেকে বোঝা যায়, উত্তর কোরিয়া ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার শুধু উড্ডয়ন ও লক্ষ্যভেদের সক্ষমতা নয়, এর সঙ্গে যুক্ত বিস্ফোরক ও আঘাতের কার্যকারিতাও আলাদাভাবে উন্নত করার চেষ্টা করছে।
ক্ষেপণাস্ত্র প্রশাসনের ওয়ারহেড ইনস্টিটিউটের ভাষ্য অনুযায়ী, পরীক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সময় ওয়ারহেডের কার্যকারিতা যাচাই করা। বিশেষ করে ওপর থেকে সরাসরি আঘাত হানার সক্ষমতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্রটির শেষ পর্যায়ের আঘাতের ক্ষমতা কতটা কার্যকর, তা পরীক্ষা করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া উত্তর কোরিয়ার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা ইনস্টিটিউট অস্ত্রটির শেষ পর্যায়ের গতিপথ পরিবর্তনের সক্ষমতা আরও উন্নত করেছে বলে দেশটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। লক্ষ্যবস্তু এলাকার প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নিয়ে ক্ষেপণাস্ত্রটি শেষ পর্যায়ে নিজের গতিপথ পরিবর্তন করতে পারবে—এমন সক্ষমতা বাড়ানোর দাবি করা হয়েছে।
ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের ক্ষেত্রে শেষ পর্যায়ে গতিপথ পরিবর্তনের ক্ষমতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচিত হয়। কারণ এ ধরনের সক্ষমতা থাকলে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় ক্ষেপণাস্ত্রের গতিপথ পরিস্থিতি অনুযায়ী সামঞ্জস্য করার সুযোগ থাকে। উত্তর কোরিয়ার সর্বশেষ পরীক্ষায় এই সক্ষমতা উন্নয়নের দাবি দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
উত্তর কোরিয়া দীর্ঘদিন ধরেই নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির ক্ষেত্রে দেশটি বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা চালিয়ে আসছে। এসব পরীক্ষার মধ্যে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং সংশ্লিষ্ট অস্ত্রব্যবস্থার উন্নয়নও রয়েছে। সর্বশেষ পরীক্ষাটি সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র প্রশাসনের মহাপরিচালক পরীক্ষার পর বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা এবং সব ধরনের হুমকি মোকাবিলায় সশস্ত্র বাহিনীকে প্রস্তুত থাকতে হবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সোমবারের পরীক্ষাগুলো যুদ্ধব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে পরিচালিত নিয়মিত বৈজ্ঞানিক গবেষণার অংশ।
উত্তর কোরিয়ার পক্ষ থেকে অস্ত্র পরীক্ষাগুলোকে সাধারণত দেশের আত্মরক্ষার সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরা হয়। দেশটির নেতৃত্বের বক্তব্যে প্রায়ই জাতীয় নিরাপত্তা ও বহিরাগত হুমকির বিষয়টি গুরুত্ব পায়। সর্বশেষ পরীক্ষার ক্ষেত্রেও একই ধরনের ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।
তবে উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সবসময়ই উদ্বেগ তৈরি হয়। কারণ দেশটির সামরিক কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা উত্তেজনার একটি বড় কারণ। নতুন কোনো ক্ষেপণাস্ত্র বা ওয়ারহেডের পরীক্ষা আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে কোরীয় উপদ্বীপে সামরিক উত্তেজনা যখনই বাড়ে, তখন দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান তাদের নিরাপত্তা প্রস্তুতি জোরদার করে। যুক্তরাষ্ট্রও এই অঞ্চলে তার মিত্রদের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বজায় রাখে। বিপরীতে উত্তর কোরিয়া এসব সামরিক তৎপরতাকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় বলে দাবি করে। ফলে এক পক্ষের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পদক্ষেপ অন্য পক্ষের উদ্বেগ বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করে।
নতুন ওয়ারহেডের পরীক্ষার ক্ষেত্রে উত্তর কোরিয়ার দাবিগুলোও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ৫ থেকে ৬ হেক্টর এলাকাজুড়ে ব্যাপক ধ্বংস ঘটানোর সক্ষমতার যে কথা বলা হয়েছে, তা দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনভিত্তিক দাবি। স্বাধীনভাবে এই দাবির কার্যকারিতা বা পরীক্ষার পূর্ণ ফলাফল যাচাই করার সুযোগ সীমিত। তাই পরীক্ষাটির প্রকৃত সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে আরও তথ্য ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন প্রয়োজন।
তবে পরীক্ষার ঘোষণাটি থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, উত্তর কোরিয়া তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে শুধু নতুন অস্ত্র তৈরি নয়, বিদ্যমান অস্ত্রব্যবস্থার বিভিন্ন উপাদানও উন্নত করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। ওয়ারহেডের বিস্ফোরণক্ষমতা, লক্ষ্যবস্তুতে আঘাতের ধরন এবং শেষ পর্যায়ে গতিপথ পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলোতে পরীক্ষা চালানোর মধ্য দিয়ে সেই প্রচেষ্টারই ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
এ ধরনের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন সামরিক পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কোনো ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার কার্যকারিতা শুধু তার পাল্লা বা গতি দিয়ে নির্ধারিত হয় না। লক্ষ্যবস্তুর দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় তার নিয়ন্ত্রণক্ষমতা, নির্ভুলতা এবং ওয়ারহেডের কার্যকারিতাও সামগ্রিক সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। উত্তর কোরিয়ার সর্বশেষ পরীক্ষায় এসব বিষয়কে একসঙ্গে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে রাষ্ট্রীয় প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য কোরীয় উপদ্বীপের স্থিতিশীলতা দীর্ঘদিন ধরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ইস্যু। উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির পাশাপাশি পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়েও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে নতুন অস্ত্র পরীক্ষা আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা হিসাব-নিকাশ আরও জটিল করতে পারে।
অন্যদিকে উত্তর কোরিয়ার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এসব পরীক্ষা দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার অংশ। দেশটির কর্মকর্তারা বারবার বলে আসছেন, সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় সামরিক বাহিনীকে প্রস্তুত রাখা প্রয়োজন। সর্বশেষ পরীক্ষার পরও ক্ষেপণাস্ত্র প্রশাসনের মহাপরিচালক একই ধরনের অবস্থান তুলে ধরেছেন।
এখন নতুন এই পরীক্ষার পর উত্তর কোরিয়া আরও কোনো ক্ষেপণাস্ত্র বা অস্ত্রব্যবস্থার পরীক্ষা চালায় কি না, এবং আঞ্চলিক দেশগুলো এর প্রতিক্রিয়ায় কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকে নজর থাকবে। কারণ কোরীয় উপদ্বীপে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রতিটি নতুন পদক্ষেপ আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
উত্তর কোরিয়ার সর্বশেষ পরীক্ষাকে দেশটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও অস্ত্রব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধির নিয়মিত কার্যক্রম হিসেবে তুলে ধরলেও এর সামরিক তাৎপর্য উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বিশেষ ওয়ারহেডের কার্যকারিতা, লক্ষ্যবস্তুতে ওপর থেকে সরাসরি আঘাত এবং শেষ পর্যায়ে গতিপথ পরিবর্তনের সক্ষমতা উন্নয়নের দাবি দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ধারাবাহিক অগ্রগতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সঙ্গে এসব কার্যক্রম যেন নতুন করে আঞ্চলিক উত্তেজনা না বাড়ায়, সে বিষয়টিও আন্তর্জাতিক মহলের নজরে থাকবে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত