২০২৭ সালের পুরুষদের ওয়ানডে বিশ্বকাপ ঘিরে এখন থেকেই ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। টুর্নামেন্ট শুরু হতে প্রায় এক বছর বাকি থাকলেও টিকিটের জন্য আবেদন জমা পড়ছে বিপুলসংখ্যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার গ্রুপ পর্বের ম্যাচ। এই একটি ম্যাচের টিকিটের চাহিদা বিশ্বকাপের ফাইনালকেও ছাড়িয়ে গেছে। ক্রিকেটের বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের টিকিটের জন্য এখন পর্যন্ত প্রায় ৮৪ লাখ আবেদন জমা পড়েছে। অন্যদিকে একই স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বকাপ ফাইনালের টিকিটের জন্য আবেদন এসেছে প্রায় ৮০ লাখ।
ক্রিকেটের অন্যতম আকর্ষণীয় দ্বৈরথ হিসেবে পরিচিত ভারত-পাকিস্তান ম্যাচকে ঘিরে দর্শকদের এই বিপুল আগ্রহ নতুন করে দুই দেশের ক্রিকেটীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার বৈশ্বিক জনপ্রিয়তা তুলে ধরেছে। মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি দুই দেশের সমর্থকদের আবেগ, দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ম্যাচটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব এ আকর্ষণের অন্যতম কারণ। বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে দুই দল মুখোমুখি হলে তা কেবল একটি ক্রিকেট ম্যাচের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কোটি কোটি দর্শকের আগ্রহের কেন্দ্রে পরিণত হয়।
আইসিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ১০ অক্টোবর দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গের ওয়ান্ডারার্স স্টেডিয়ামে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার গ্রুপ পর্বের ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। একই মাঠে ২১ নভেম্বর হবে টুর্নামেন্টের ফাইনাল। দুই ম্যাচের টিকিটের আবেদনসংখ্যার ব্যবধান খুব বেশি না হলেও ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের চাহিদা ফাইনালের চেয়ে প্রায় চার লাখ বেশি। এই পরিসংখ্যান বিশ্বকাপের সূচিতে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর লড়াই কতটা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে, তা স্পষ্ট করে।
তবে শুধু ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ কিংবা ফাইনাল নয়, পুরো বিশ্বকাপ ঘিরেই দর্শকদের আগ্রহ উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছেছে। আইসিসি জানিয়েছে, বিশ্বের ১৯৩টি দেশ থেকে প্রায় ৩০ লাখ সমর্থক টিকিটের জন্য আবেদন করেছেন। এ পর্যন্ত বিভিন্ন ম্যাচের জন্য ৩ কোটি ২০ লাখের বেশি নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে। ফলে দর্শকদের আগ্রহ যে কেবল কয়েকটি আলোচিত ম্যাচের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই বিস্তৃত হচ্ছে, সেটিও উঠে এসেছে নিবন্ধনের পরিসংখ্যানে।
টিকিটের জন্য আবেদন করার সুযোগ এখনো রয়েছে। আইসিসির নির্ধারিত ব্যালট পদ্ধতিতে নিবন্ধনের সময়সীমা ২১ নভেম্বর পর্যন্ত খোলা থাকবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদনকারীরা নিজেদের পছন্দের ম্যাচ নির্বাচন করে টিকিট পাওয়ার জন্য নিবন্ধন করতে পারবেন। তবে আবেদন জমা দিলেই টিকিট নিশ্চিত হবে, এমন নয়। ব্যালট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে টিকিট বরাদ্দ করা হবে। তাই আগ্রহী দর্শকদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিবন্ধন সম্পন্ন করার প্রয়োজন রয়েছে। সময়সীমা শেষ হয়ে গেলে এই ব্যালটের মাধ্যমে টিকিট পাওয়ার সুযোগ আর থাকবে না।
২০২৭ সালের বিশ্বকাপের আরেকটি বিশেষ দিক হলো, দীর্ঘ ২৪ বছর পর আফ্রিকার মাটিতে ফিরছে পুরুষদের ওয়ানডে বিশ্বকাপ। দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে ও নামিবিয়া যৌথভাবে এই আসরের আয়োজন করবে। ১৪ দলের অংশগ্রহণে ২ অক্টোবর থেকে ২১ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে টুর্নামেন্ট। মোট ৫৭টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে ১২টি স্বাগতিক শহরে। আফ্রিকায় সর্বশেষ পুরুষদের ওয়ানডে বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০০৩ সালে। দীর্ঘ বিরতির পর এই আয়োজন ঘিরে আয়োজক দেশগুলোর পাশাপাশি পুরো মহাদেশেই নতুন করে ক্রিকেটীয় উন্মাদনা তৈরি হয়েছে।
টিকিটের আবেদনসংখ্যায় দক্ষিণ আফ্রিকার অবস্থান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দেশটির আটটি ভেন্যুতে অনুষ্ঠিতব্য ৪১টি ম্যাচের জন্য ১০ কোটি ৫০ লাখের বেশি টিকিটের আবেদন জমা পড়েছে বলে আইসিসি জানিয়েছে। এর মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকার নিজস্ব ম্যাচগুলোর জন্য আবেদন এসেছে প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ। আয়োজক দেশের দর্শকদের পাশাপাশি বিদেশি সমর্থকদের আগ্রহও এই চাহিদা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। বিশ্বকাপের ম্যাচগুলোকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের দর্শকসমাগম বাড়লে স্থানীয় পর্যটন, পরিবহন, আবাসন ও অন্যান্য সেবাখাতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
জিম্বাবুয়েতেও বিশ্বকাপের টিকিটের চাহিদা উল্লেখযোগ্য। দেশটিতে বিভিন্ন ম্যাচের জন্য মোট আবেদনসংখ্যা ১ কোটি ৩০ লাখ ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে ২৪ অক্টোবর ভিক্টোরিয়া ফলসে নতুন ‘মোসি-ওআ-তুনিয়া’ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিতব্য জিম্বাবুয়ে-ভারত ম্যাচকে ঘিরে বিশেষ আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। ওই ম্যাচের জন্যই ৩৩ লাখের বেশি টিকিটের আবেদন জমা পড়েছে। নতুন স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের মতো বড় আয়োজনের ম্যাচ অনুষ্ঠিত হওয়া স্থানীয় ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য যেমন বিশেষ অভিজ্ঞতা হতে পারে, তেমনি আন্তর্জাতিক দর্শকদের কাছেও ভিক্টোরিয়া ফলসকে নতুনভাবে পরিচিত করার সুযোগ তৈরি করবে।
নামিবিয়ার রাজধানী উইন্ডহোকে অবস্থিত নামিবিয়া ক্রিকেট গ্রাউন্ডেও বিশ্বকাপের ছয়টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এসব ম্যাচের জন্য ইতোমধ্যে ২০ লাখের বেশি টিকিটের আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে আগামী ৮ অক্টোবর ইংল্যান্ড ও বাংলাদেশের মধ্যকার ম্যাচের জন্য প্রায় ৯ লাখ আবেদন এসেছে। বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য ম্যাচটি বিশেষ আগ্রহের বিষয় হতে পারে। বিশ্বকাপের মঞ্চে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের লড়াই দেখতে প্রবাসী বাংলাদেশি দর্শক এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অনুসারীদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আইসিসির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, টিকিটের নিবন্ধনে এগিয়ে থাকা দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা, যুক্তরাজ্য, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়া। আফ্রিকা মহাদেশ থেকেই ১ কোটি ৪৯ লাখের বেশি টিকিটের আবেদন জমা পড়েছে। এই পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, আয়োজক অঞ্চলের দর্শকদের আগ্রহের পাশাপাশি বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তের ক্রিকেটপ্রেমীরাও টুর্নামেন্টটি সরাসরি মাঠে বসে উপভোগ করতে আগ্রহী।
বিশ্বকাপের টিকিটের চাহিদা একটি বড় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজনের জনপ্রিয়তা ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনার গুরুত্বপূর্ণ সূচক। তবে এত বিপুল আবেদন সামাল দেওয়া আয়োজকদের জন্য বড় ব্যবস্থাপনাগত চ্যালেঞ্জও তৈরি করতে পারে। টিকিট বরাদ্দে স্বচ্ছতা, দর্শকদের নিরাপদ প্রবেশ, স্টেডিয়ামের ধারণক্ষমতা অনুযায়ী আসন ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন দেশের সমর্থকদের যাতায়াত ও আবাসন নিশ্চিত করা হবে আয়োজকদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। বিশেষ করে ভারত-পাকিস্তানের মতো উচ্চ আগ্রহের ম্যাচে টিকিট না পাওয়া দর্শকদের প্রত্যাশা সামাল দেওয়াও সহজ হবে না।
এ ধরনের বড় ম্যাচ ঘিরে টিকিটের চাহিদা বাড়লে অননুমোদিত বিক্রি ও অতিরিক্ত দামে টিকিট বিক্রির ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। ফলে দর্শকদের জন্য নির্ধারিত ও অনুমোদিত পদ্ধতিতে আবেদন করা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে টিকিট বরাদ্দের নিয়ম, মূল্য এবং পরবর্তী বিক্রয়প্রক্রিয়া সম্পর্কে পরিষ্কার তথ্য দেওয়া হলে সমর্থকদের মধ্যে বিভ্রান্তি কমবে। বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আয়োজনের গ্রহণযোগ্যতা বজায় রাখতে এসব বিষয়েও আয়োজকদের সতর্ক থাকতে হবে।
আইসিসির ইভেন্টস অ্যান্ড অপারেশনস বিভাগের মহাব্যবস্থাপক গৌরব সাক্সেনা টিকিটের আবেদনে মানুষের সাড়াকে অভূতপূর্ব বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এই বিপুল চাহিদা টুর্নামেন্টটির আন্তর্জাতিক আকর্ষণ এবং ২৪ বছর পর আফ্রিকায় পুরুষদের ওয়ানডে বিশ্বকাপ ফিরে আসার গুরুত্ব তুলে ধরছে। আয়োজকদের প্রত্যাশা, বিশ্বকাপটি শুধু মাঠের ক্রিকেটীয় প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে ক্রিকেটের প্রসার এবং আন্তর্জাতিক ক্রীড়া পর্যটনের ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে।
সব মিলিয়ে ২০২৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই টিকিটের আবেদনসংখ্যা নতুন মাত্রা পেয়েছে। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের চাহিদা ফাইনালকে ছাড়িয়ে যাওয়া যেমন ক্রিকেটবিশ্বের বহুল আলোচিত প্রতিদ্বন্দ্বিতার জনপ্রিয়তা তুলে ধরছে, তেমনি বাংলাদেশ-ইংল্যান্ডসহ অন্যান্য ম্যাচের জন্য উল্লেখযোগ্য আবেদন পুরো আসর ঘিরে বিস্তৃত আগ্রহের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, মাঠের বাইরের এই বিপুল প্রত্যাশা আয়োজকেরা কতটা সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাস্তবে রূপ দিতে পারেন। ২৪ বছর পর আফ্রিকার মাটিতে ফিরতে যাওয়া বিশ্বকাপ তাই শুধু তিন আয়োজক দেশের জন্য নয়, বিশ্বের কোটি কোটি ক্রিকেটপ্রেমীর জন্যও হয়ে উঠছে প্রতীক্ষিত এক আয়োজন।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত