দেশের পোশাকশ্রমিকদের চলমান আন্দোলন, মজুরি বৃদ্ধির দাবি এবং শ্রমিক অসন্তোষ মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, সরকার সময়মতো সঠিক পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হওয়ায় গার্মেন্টস শ্রমিকদের আন্দোলন বড় আকার ধারণ করেছে। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির আন্দোলনে ফ্যাসিস্টদের অনুপ্রবেশ ঘটে থাকলে তার দায় সরকারকেই নিতে হবে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) পাবনা জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে এনসিপির একটি সাংগঠনিক মতবিনিময় সভার আগে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। সভাটির আয়োজন করা হয় দলের সাংগঠনিক অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং স্থানীয় নির্বাচনকেন্দ্রিক পরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্দেশ্যে। এ সময় দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, শ্রমিকদের মজুরি আন্দোলন, সরকারের কার্যক্রম এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন নাহিদ ইসলাম।
শ্রমিকদের চলমান আন্দোলন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার সঠিক সময়ে শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করেনি এবং তাঁদের দাবির বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়েছে। তাঁর মতে, শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির দাবি যৌক্তিক এবং এই দাবি নিয়ে সরকারের সঙ্গে শ্রমিক প্রতিনিধিদের আগেই আলোচনায় বসা উচিত ছিল। সময়মতো উদ্যোগ নেওয়া হলে আন্দোলনের পরিস্থিতি এতটা বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা কম থাকত।
নাহিদ ইসলাম বলেন, অতীতে শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির আন্দোলনকে যৌক্তিক হিসেবে বিবেচনা করা হলেও বর্তমানে বিএনপি কেন শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে না, সেই প্রশ্ন রয়েছে। তিনি জানান, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির পক্ষে এনসিপির অবস্থান অব্যাহত থাকবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শ্রমিকদের দাবি উপেক্ষা না করে সরকার ও সংশ্লিষ্ট মালিকপক্ষের উচিত আলোচনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানো।
শ্রমিক আন্দোলনে রাজনৈতিক অনুপ্রবেশের অভিযোগ প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম সরকারের দায়িত্বের বিষয়টি সামনে আনেন। তাঁর বক্তব্য, শ্রমিকদের প্রকৃত দাবি ও অসন্তোষের যথাযথ সমাধান না হলে বিভিন্ন পক্ষ সেই পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। কোনো রাজনৈতিক বা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী শ্রমিকদের আন্দোলনে প্রবেশ করলে তার দায় এড়ানোর সুযোগ সরকারের নেই। তবে আন্দোলনে কারা অনুপ্রবেশ করেছে, সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ বা ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেননি।
দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে সাম্প্রতিক সময়ে শ্রমিক অসন্তোষ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে মজুরি বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মপরিবেশ এবং শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করার দাবিতে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ ও কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জসহ কয়েকটি শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে উত্তেজনা এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাও সামনে এসেছে। এসব পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের দাবি পূরণে সরকারের কার্যকর ভূমিকা কতটা রয়েছে, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা চলছে।
নাহিদ ইসলামের মতে, শ্রমিকদের অসন্তোষের মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে আগেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল। শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা, মজুরি পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং মালিকপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে সংকট মোকাবিলার সুযোগ ছিল। কিন্তু যথাসময়ে উদ্যোগ না নেওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তাঁর বক্তব্যে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আদায়ের পাশাপাশি আন্দোলনের পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
তিনি সরকারের গত আট মাসের কার্যক্রমের সমালোচনা করে বলেন, সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। বিশেষ করে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে না পারায় সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়ছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, দেশের বিভিন্ন স্থানে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে।
দ্রব্যমূল্য ও জ্বালানি ব্যয় প্রসঙ্গেও সরকারের সমালোচনা করেন এনসিপির আহ্বায়ক। তিনি বলেন, দফায় দফায় এলপিজি গ্যাসের দাম বাড়ানো হচ্ছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে না পেরে অনেক পরিবারকে সংসার পরিচালনায় সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য বাড়তি ব্যয় সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন নাহিদ ইসলাম। তাঁর অভিযোগ, নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে না। সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটছে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এসব কারণে সরকারের ওপর জনগণের আস্থা কমে যাচ্ছে বলে তাঁর দাবি।
সরকারের বিভিন্ন নীতি ও কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে এনসিপির রাজনৈতিক কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি। নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকারের নৈরাজ্য, ব্যর্থতা ও গণবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে তাঁরা কর্মসূচি পালন করছেন। এ সময় তিনি জনগণকে রাজপথে এসে নিজেদের দাবি ও অবস্থান তুলে ধরার আহ্বান জানান। তাঁর ভাষায়, সরকারের কর্মকাণ্ডের জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজপথের আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ডিসেম্বর মাসে সম্ভাব্য ঘটনাপ্রবাহ নিয়েও বক্তব্য দেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ডিসেম্বর মাসে উল্লেখযোগ্য কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তন বা ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা তিনি দেখছেন না। সরকারের বর্তমান কার্যক্রম ও পারফরম্যান্সের ওপর আস্থা না থাকার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর দাবি, ডিসেম্বরে কোনো বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হলে সেটি সরকারের ব্যর্থতা এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতার কারণে হতে পারে। এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হলে এনসিপি রাজপথে থেকে তা প্রতিহত করবে বলেও তিনি জানান। তবে সম্ভাব্য সমঝোতার বিষয়ে তাঁর বক্তব্য একটি রাজনৈতিক দলের নেতার মূল্যায়ন ও আশঙ্কা হিসেবে বিবেচ্য; এ বিষয়ে কোনো নিশ্চিত সিদ্ধান্ত বা সমঝোতার তথ্য তিনি উপস্থাপন করেননি।
পাবনায় অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় এনসিপির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের একাধিক নেতা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে দলের যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আহসান জোনায়েদ, যুগ্ম সদস্য সচিব এস এম সাইফ মোস্তাফিজ, সাংগঠনিক সম্পাদক ইমরান ইমন এবং জাতীয় স্বেচ্ছাসেবক শক্তির আহ্বায়ক মাহিন সরকার ছিলেন। এ ছাড়া পাবনা জেলার এনসিপি ও দলটির অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরাও সভায় অংশ নেন।
সভায় সাংগঠনিক অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং স্থানীয় নির্বাচনকেন্দ্রিক পরিকল্পনা প্রণয়নের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। স্থানীয় পর্যায়ে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম কীভাবে আরও গতিশীল করা যায় এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মসূচি কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, তা নিয়ে নেতাদের মধ্যে আলোচনা হয়। একই সঙ্গে দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সাধারণ মানুষের বিভিন্ন সমস্যা নিয়েও মতবিনিময়ের সুযোগ তৈরি হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, শ্রমিকদের মজুরি ও অধিকারসংক্রান্ত দাবি এখন দেশের শিল্প ও রাজনৈতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা, উৎপাদন অব্যাহত রাখা এবং জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থ—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে একটি কার্যকর সমাধান প্রয়োজন। শ্রমিকদের দাবি উপেক্ষিত হলে অসন্তোষ বাড়তে পারে। অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে শ্রমিক, মালিক এবং দেশের রপ্তানিনির্ভর শিল্প—সব পক্ষই ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
এ অবস্থায় শ্রমিকদের সঙ্গে সরকারের নিয়মিত আলোচনা, মালিকপক্ষের সহযোগিতা এবং শ্রমিক সংগঠনগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে কোনো আন্দোলনে সহিংসতা বা অনাকাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। শ্রমিকদের প্রকৃত দাবি যেন রাজনৈতিক বিরোধের আড়ালে চাপা না পড়ে, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
নাহিদ ইসলামের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সরকারের ভূমিকা, রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান এবং দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সামনে এসেছে। এখন শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি পূরণ, শিল্পাঞ্চলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা কমাতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই নজর থাকবে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত