প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৫ | সিলেট ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
সিলেটের শ্রীপুর, রাংপানি, জাফলংসহ সংরক্ষিত বাংকার এলাকা এবং বিভিন্ন নদ-নদী ও পর্যটনকেন্দ্রে দীর্ঘ দিন ধরে নির্বিচার বালু লুটপাট চলছে। পাথরের মতো মূল্যবান বালু লুটের কারণে এক সময়ের অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আজ শ্রীহীন হয়ে পড়েছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় গড়ে ওঠা চক্রগুলো প্রকাশ্যে বালু লুট করছে। প্রশাসনের মাঝেমধ্যে অভিযান হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। এই অব্যবস্থার কারণে সিলেটের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও পর্যটনকেন্দ্রগুলোর অস্তিত্বই এখন ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
শ্রীপুর ও রাংপানি এলাকার অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে আগে প্রতিদিনই পর্যটকরা ছুটে আসতেন। তবে ১৯৯২ সালে শ্রীপুরকে পাথর কোয়ারি হিসেবে খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো (বিএমডি) ইজারা দেওয়া শুরু করে এবং ২০১৩ সালে সরকারি গেজেটেও শ্রীপুরকে পাথর কোয়ারি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ধীরে ধীরে এই এলাকা তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য হারাতে শুরু করে। রাংপানি ও শ্রীপুরে অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলনের ঘটনা ২০২০ সালে সরকারি ইজারা বন্ধ হলেও অব্যাহত থাকে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকারের পতনের পর পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। আগে যেখানে বালু লুটপাট আড়ালে-আবডালে হতো, সেখানে এখন তা প্রকাশ্যে চলে। চার দশক আগে সিনেমায় দেখা শ্রীপুর ও রাংপানির সঙ্গে বর্তমানের মিল খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। বড় বড় পাথরের বেশির ভাগই ইতিমধ্যেই লুট হয়েছে। নদী ও আশপাশের চরে থাকা বালু বেলচা-কোদাল দিয়ে খোঁড়া হচ্ছে। একসময়ের সৌন্দর্যের জনপদ আজ অনেকটাই বিরানভূমি হয়ে উঠেছে।
শ্রীপুরের উৎসমুখ এলাকায় স্থানীয়রা জানায়, অভিযানের ভয়ে বালু এখন আপাতত সরানো হচ্ছে না। রাংপানি নদীর বাননঘাট, আদর্শ গ্রাম ও ৪ নম্বর বাংলাবাজারে ১৫-২০ জনকে বালু তুলতে দেখা গেছে। শ্রীপুরেও একই চিত্র লক্ষ্য করা যায়, যেখানে পাথরের পাশাপাশি সমানভাবে বালু লুট হচ্ছে। পরিবেশবাদীরা জানান, ইজারাভুক্ত না হওয়া এলাকা থেকেও বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, জেলার ৪০টি বালুমহাল রয়েছে, এর মধ্যে ২০টি ইজারাযোগ্য।
গোয়াইনঘাটের পিয়াইন নদ ও জাফলং সেতুর আশেপাশে নৌকায় বালু পরিবহনের দৃশ্য চোখে পড়ে। ইজারাভুক্ত অংশে শ্রমিকরা নিয়মিত বালু তুললেও, ইজারাবহির্ভূত এলাকায় ড্রেজার এবং নৌকার মাধ্যমে বালু উত্তোলন অব্যাহত। জৈন্তাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারী বলেন, “কোনো অবস্থাতেই অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করতে দেওয়া হবে না। অভিযান চলছে।”
স্থানীয়রা জানায়, বালুমহাল না হওয়া সত্ত্বেও পিয়াইন নদ, খাসি নদ ও নলজুরি নদ থেকে দেদার বালু লুট হচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে চক্র তৈরি হয়েছে, যা রাজনৈতিক সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকারের পতনের পর বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের স্থানীয় নেতারা বালুমহাল নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন। অভিযোগ পাওয়া গেছে, জৈন্তাপুর উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি আবদুল আহাদ, আলমগীর হোসেন, জৈন্তাপুর ইউনিয়ন জামায়াতের আমির নুরুল ইসলাম ও যুবদলের সাধারণ সম্পাদক দিলদার হোসেন শ্রীপুর ও রাংপানি নদী থেকে বালু তোলার সঙ্গে যুক্ত।
নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতা ও অভিযুক্তদের মধ্যে কেউ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বিএনপি নেতা আবদুল আহাদ বলেন, “২০১৮ সালের পর থেকে আমি পাথরের ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছি। আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।” জামায়াত নেতা নুরুল ইসলামও অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তবে স্থানীয়দের দাবি, শ্রীপুর ও রাংপানি নদী, পাথর কোয়ারি ও পর্যটনকেন্দ্রসহ অনেক এলাকা থেকে নির্বিচার বালু লুট হয়েছে, যা রাজনৈতিক সমন্বয়েই পরিচালিত হচ্ছে।
সিলেটের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদ বলেন, “অবৈধভাবে বালু-পাথর উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে প্রশাসন নিয়মিত ব্যবস্থা নিচ্ছে। যৌথ বাহিনীর অভিযান শুরু হওয়ায় লুটপাট অনেকটাই থেমেছে।”
পরিবেশ ও স্থানীয় সংগঠন ‘ধরা’র সিলেট সদস্যসচিব আবদুল করিম চৌধুরী জানান, “বালু লুট রোধে আমরা আন্দোলন করেছি, তবে প্রশাসন কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। নামমাত্র অভিযান পরিচালিত হওয়ায় লুট অব্যাহত আছে। যা হয়েছে, তা প্রতিসাধ্য নয়। এখনও অবশিষ্ট বালু রক্ষায় কঠোর আইনগত পদক্ষেপ অপরিহার্য।”
সিলেটের নদ-নদী ও পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে নির্বিচার বালু লুট এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বিলীন হওয়ার এই পরিস্থিতি প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি এবং কঠোর আইন প্রয়োগের তীব্র দাবি করছে। সিলেটের একসময়ের লীলাভূমি আজ শ্রীহীন, যা প্রাকৃতিক ও পর্যটন ক্ষেত্রের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।