প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ‘ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
কক্সবাজার — দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও নানা পরীক্ষার পর কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালুর রূপকারি ধাপটি অক্টোবরে বাস্তবে পরিণত হওয়ার আশা প্রকাশ করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ও সিভিল অ্যাভিয়েশন কর্তৃপক্ষ জানায়, নির্মাণকাজ এখনও পুরোমাত্রায় সমাপ্ত হয়নি; তবে প্রকল্পের প্রধান অবকাঠামো—বিশেষত সমুদ্রভিত্তিক রানওয়ে ও তার সংযোজন—উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে এবং সেপ্টেম্বরের মধ্যেই বাকী কাজ শেষ হবে বলে তারা প্রত্যাশা করছে। নির্বাহী পর্যায়ের একাধিক পরিদর্শন ও সরকারি নির্দেশনায় আগামী অক্টোবরের মাঝামাঝি সময় থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বেবিচক সূত্র জানায়, সমুদ্রের ভেতরে নির্মিত এক প্রকার ব্লকভিত্তিক সম্প্রসারিত রানওয়ের কাজ প্রায় সম্পূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে; রানওয়ের কাজের আনুমানিক শতকরা ৯৭ ভাগ সম্পন্ন। সমুদ্রপৃষ্ঠের বাঁধ নির্মাণ ৯৫ শতাংশে পৌঁছেছে। সমুদ্রে ২২০০ ফুট দৈর্ঘ্যের প্রিসিশন অ্যাপ্রোচ লাইট স্থাপন এবং মেইনটেন্যান্স স্টিল ব্রিজ নির্মাণকাজের ৮৫ শতাংশ শেষ হয়েছে। অন্যদিকে রানওয়ের চারপাশে নিরাপত্তা সীমানা প্রাচীর ও টহল সড়ক নির্মাণ কাজ ৩২ শতাংশে এবং ড্রেনেজ সিস্টেম নির্মাণ ৬২ শতাংশে আছে। এসব কাজ মিলিয়ে কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য হচ্ছে দ্রুততম সময়ে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচলের যেসব প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত মানদণ্ড আইকাও (ICAO) নির্ধারিত, সেগুলো পূরণ করা।
আইকাও’র নির্দেশিকা মেনে বাংলাদেশ সরকার কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে ঘোষণা করেছে; এ সংক্রান্ত স্বীকৃতি ও প্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন দেওয়ার জন্য বেবিচক ৭ আগস্ট আইকাওকে চিঠি প্রেরণ করেছে। বেবিচক কর্মকর্তারা জানান, আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালুর আগে আইকাওর মাধ্যমে এ্যারোনটিক্যাল ইনফরমেশন রেগুলেশন অ্যান্ড কন্ট্রোল (AIRAC) প্রকাশ করতে হয় এবং এটি সাধারণত ৫৬ দিনের মধ্যে প্রকাশিত হয়—তাই সময়সূচির সামঞ্জস্য হিসেবে আগামী কয়েক সপ্তাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
টার্মিনাল ভবনের কাজ এখনও সম্পূর্ণ হয়নি; প্যাসেঞ্জার অ্যারাইভাল ও ডিপারচার লাউঞ্জ, ডিপারচার কনভেয়ার বেল্ট এবং ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস কাউন্টার সংক্রান্ত কাজ বাকি আছে। বেবিচক জানায়, এসব শেষ করতে আনুমানিক দুই মাসের বেশি সময় লাগার কথা না হলেও প্রকল্প বাস্তবায়নের গতিবেগ অনুসারে নির্ধারিত সময়সীমা বজায় রাখাও চ্যালেঞ্জিং। এজন্য বেবিচক কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও দায়িত্বশীলদের দ্রুত কাজ শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং ২৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বাকি কাজগুলো শেষ করার নির্দেশনা জারিও করা হয়েছে। ওই সময়ের মধ্যে যদি টার্মিনাল-সংক্রান্ত কাজ ও সেবাসংক্রান্ত প্রস্তুতি আইকাও’র নির্ধারিত গাইডলাইন অনুযায়ী সম্পন্ন হয়, তাহলে অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে সীমান্তবাহী আন্তর্জাতিক ফ্লাইটগুলো শুরু করা সম্ভব হবে বলে কর্তৃপক্ষ আশা করছে।
বেবিচকের ১১ আগস্টের এক চিঠিতে দেশের শীর্ষস্থানীয় এয়ারলাইন্স বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সকে তাদের আন্তর্জাতিকরূপে কোন ধরনের ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনা আছে এবং কোন গন্তব্যে রুট চালু করা হবে—তা লিখিতভাবে জানাতে বলা হয়েছে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন এয়ারলাইনসকেও বিষয়টি জানানো হয়েছে; তবে এখনো এসব কোম্পানি থেকে আনুষ্ঠানিক জবাব আসে নি। বেবিচক ও এয়ারলাইন্স দু পক্ষই জানিয়েছে, কক্সবাজার থেকে কোন রুটে প্রথম আন্তর্জাতিক ফ্লাইট করা হবে এবং কোন এয়ারলাইনস উদ্বোধনী ফ্লাইট পরিচালনা করবে—এসব ক্ষেত্রের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যাত্রীর চাহিদা ও ফিডব্যাক, অপারেশনাল সক্ষমতা এবং বাণিজ্যিক পরিমাপের উপর নির্ভর করবে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা সামাজিক ও ভৌগোলিক অন্তরায় প্রকৌশলিদের কাজকে জটিল করে তুলেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিমানবন্দর সম্প্রসারণকে বাধা হিসেবে এখনও প্রায় ৩৩০০ পরিবার থাকায় তাদের উচ্ছেদের কার্যক্রম সম্পূর্ণ করা যায়নি এবং চার দশমিক ৬৪ একর জমির অধিগ্রহণও বাকি রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধান না হলে সময়মতো সব কাজ শেষ করা ও পরিবেশগত এবং সামাজিক প্রতিকার নিশ্চিত করা কঠিন হবে—এর ফলেই বেবিচক বিভিন্ন স্তরে সমন্বয় সভা, মন্ত্রণালয় পর্যায়ের বৈঠক ও কমিটি গঠন করেছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও বেবিচক চেয়ারম্যান একাধিকবার বিষয়টি নিয়ে বৈঠক করেছেন বলে জানা গেছে।
বন্দরটির ভৌত সক্ষমতা ও অন্তর্নিহিত পরিকল্পনা সম্পর্কে বেবিচক সদস্য (অপারেশন অ্যান্ড প্ল্যানিং) এয়ার কমডোর আবু সাঈদ মাহবুব খান বলেন, কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের একটি কার্যকর কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সরকারের লক্ষ্য এবং কাজের অগ্রগতিও সন্তোষজনক। তিনি বলেন, “বাকি কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ্।” এবারের পরিকল্পনায় কক্সবাজারকে শুধু পর্যটনবহুল গন্তব্য হিসেবে নয়, দক্ষিণ এশিয়ার একটি প্রযুক্তিগত ও রি-ফুয়েলিং কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে—যাতে নির্দিষ্ট দূরত্বের ফ্লাইটগুলো এখানে টেকনিক্যাল ল্যান্ডিং বা রি-ফুয়েলিংয়ের সুবিধা পেতে পারে। রানওয়েকে সম্প্রসারণ করে বর্তমানে ৯০০০ ফুট থেকে ১০৭০০ ফুটে উন্নীত করা হয়েছে এবং সমুদ্রের ওপর নির্মিত ১৭০০ ফুটের মধ্যে ১৩০০ ফুট সরাসরি সাগরের ভেতরেই নির্মিত হয়েছে—এটি দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এমন প্রযুক্তিগত উদ্যোগ।
এছাড়া বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরাও তাদের প্রস্তুতি ও সম্ভাব্য রুট পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। ইউএস-বাংলার মহাব্যবস্থাপক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম বলেন, শীতকালীন সময়সূচি (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর) শুরু হলেই রুট পরিকল্পনার ওপর সিদ্ধান্ত নেয়া সহজ হবে; তারা ফিজিবিলিটি সার্ভে করে সিদ্ধান্ত নেবেন। বিমান বাংলাদেশের মুখপাত্র এবিএম রওশন কবীরও জানান, বেবিচক থেকে চিঠি পাওয়া গেছে এবং কক্সবাজার থেকে ফ্লাইট পরিচালনার বিষয়টি নিয়ে তারা বিভিন্ন প্রযুক্তিগত ও বাণিজ্যিক বিষয়গুলো যাচাই করছে।
কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর চালু হলে সমুদ্রঘেরা এই শহর আঞ্চলিক পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ হাব হিসেবে বিকশিত হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও অবকাঠামো সম্প্রসারণে বড় ধাক্কা ফেলবে—এমনটি আশাবাদী বিশ্লেষকদের বক্তব্য। তবে তাঁরা সতর্ক করে বলেন, এই শুভ সম্ভাবনাকে টেকসই করে তোলার জন্য পরিবেশগত সুরক্ষা, ভূমি অধিগ্রহণের ন্যায়সঙ্গত সমাধান ও স্থানীয় জনগণের স্বার্থ রক্ষার ব্যবস্থা অপরিহার্য। অন্যথায় দ্রুত প্রারম্ভিক চলাচলই দীর্ঘমেয়াদে নতুন সমস্যার সূত্রপাত ঘটাতে পারে।
বর্তমানে কক্সবাজার বিমানবন্দর থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের মতো গন্তব্যে বিমানের যাতায়াতের সময় খুবই সংক্ষিপ্ত—প্রায় ৪৫ মিনিট—যা আঞ্চলিক সংযোগ বাড়ালে আন্তর্জাতিক রুটগুলিতে পর্যাপ্ত প্রাপক পাওয়া সম্ভব হবে কি না, সেটাও এয়ারলাইন্সগুলোর ঘনিষ্ঠ বিবেচ্য বিষয়। বেবিচক ও বিমান কর্তৃপক্ষ বলছে, যাতায়াতের চাহিদা ও রুট বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে সেবা পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হবে।
সংশ্লিষ্ট দিকগুলো সমাধানের সঙ্গে আইকাও, আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনস ও স্থানীয় বাস্তবতার সমন্বয় কিভাবে হচ্ছে, সেটাই আগামী কয়েক সপ্তাহে ফাইনাল চিত্র নির্ধারণ করবে। যদি নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে টার্মিনাল ও সার্ভিস-সংক্রান্ত কাজ সম্পন্ন করা যায় এবং আইকাও’র প্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন পাওয়া যায়, তবে কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করতে পারবে—এটাই সংশ্লিষ্টদের বিশ্বাস।