প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বিমান বাহিনীর হামলার ফলে মাত্র ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ৯৮ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৩৮৫ জন আহত হয়েছেন। বুধবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এই তথ্য জানায়। মন্ত্রণালয় আরও বলেছে যে, নিহত ও আহতদের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে, কারণ অনেকেই ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে রয়েছেন এবং ত্রাণ ও উদ্ধারকাজের সরঞ্জাম ও লোকবলের অভাবে তাদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি অভিযানের পর থেকে গাজায় নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা ৬৫,০৬২-এ পৌঁছেছে। একই সময়ে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৬৯৭ জন আহত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, মিশর ও কাতারের মধ্যস্থতায় ১৯ জুন দুই মাসের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হলেও, ১৮ মার্চ ইসরায়েল তা ভেঙে গাজায় পুনরায় অভিযান শুরু করে। এরপর থেকে গত পাঁচ মাসে গাজায় নিহতের সংখ্যা ১২ হাজার ৫১১ এবং আহতের সংখ্যা ৫৩,৬৫৬ হয়েছে।
গাজায় খাদ্য ও ত্রাণ সরবরাহও ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। গত মে মাসের শেষ দিক থেকে খাদ্য ও ত্রাণ সংগ্রহ করতে যাওয়া ফিলিস্তিনিদের ওপরও ইসরায়েলি বাহিনী হামলা চালাচ্ছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২৭ মে প্রথম ত্রাণ সংগ্রহের সময় ফিলিস্তিনিদের ওপর গুলি চালানো হয় এবং এরপর থেকে এই ঘটনা নিয়মিত ঘটছে। বুধবারও খাদ্য ও ত্রাণ সংগ্রহে যাওয়া ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হলে সাতজন নিহত এবং ৮৭ জন আহত হন। এতে ত্রাণ সংগ্রহের সময় নিহত ফিলিস্তিনির মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২,৫০৪ জন এবং আহত ১৮,৩৪৮ জন।
২০২৩ সালের ২ মার্চ থেকে গাজায় খাদ্য ও ত্রাণ সরবরাহ সীমিত করে দেওয়ায় খাদ্য ও অপুষ্টিজনিত সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। বুধবারও খাদ্য ও অপুষ্টিজনিত কারণে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। গত প্রায় দুই বছরে খাদ্য ও অপুষ্টিজনিত কারণে ৪৩২ জন মারা গেছেন, যার মধ্যে ১৪৬ জন শিশু।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের যোদ্ধারা ইসরায়েলের ভূখণ্ডে আকস্মিক হামলা চালায়। এতে ১,২০০ জন নিহত এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়। এ হামলার জবাবে ইসরায়েল গাজায় সামরিক অভিযান শুরু করে। ১৫ মাসেরও বেশি সময় ধরে অভিযান চালানোর পর ১৯ জানুয়ারি ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়। তবে এখনও জিম্মি অবস্থায় থাকা ২৫১ জনের মধ্যে অন্তত ১৫ থেকে ২০ জন জীবিত আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। আইডিএফ তাদের উদ্ধারের জন্য সামরিক অভিযান চালানোর ঘোষণা দিয়েছে।
জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বহুবার গাজায় সামরিক অভিযান বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে (আইসিজে) ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, হামাসকে দুর্বল ও অকার্যকর করা এবং জিম্মিদের মুক্ত করাই অভিযানের প্রধান লক্ষ্য এবং এটি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সাম্প্রতিক এ হামলা এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ফলে গাজার মানবিক অবস্থা আরও নাজুক হয়ে উঠেছে। ত্রাণ সরবরাহ সীমিত হওয়ার কারণে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থদের স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে। স্বাস্থ্যকর্মী ও আন্তর্জাতিক সাহায্যকারী সংস্থাগুলোও সীমিত সক্ষমতার মধ্যে এই বিপর্যয় মোকাবিলা করছে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই মাত্র ২৪ ঘণ্টার হামলায় নিহতদের মধ্যে বহু নারী ও শিশু রয়েছে। এছাড়া হাসপাতাল ও চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোও আংশিকভাবে ধ্বংস হয়েছে, যার ফলে আহতদের চিকিৎসা ও ত্রাণ প্রদান করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও স্থানীয় এনজিওগুলো এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং দ্রুত শান্তি স্থাপনের আহ্বান জানাচ্ছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইসরায়েলি হামলার পেছনে রাজনৈতিক ও সামরিক কৌশল রয়েছে। তাদের লক্ষ্য হল হামাসকে দুর্বল করা, নিয়ন্ত্রণ পুনঃস্থাপন এবং ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে অঞ্চলে প্রভাব বৃদ্ধি করা। তবে এ ধরনের সামরিক পদক্ষেপের ফলে সাধারণ মানুষের ওপর ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে। অনেকে খাদ্য, পানি, ও নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবে মানবিক সংকটে পতিত হচ্ছে।
এদিকে গাজার ত্রাণ ও চিকিৎসা কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পদক্ষেপও সীমিত। খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহের জন্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা চেষ্টা চালাচ্ছে, তবে অব্যাহত সংঘাত ও আকাশসীমার উপর নিয়ন্ত্রণের কারণে কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
ফিলিস্তিনি নেতা ও স্থানীয় কর্মকর্তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বারবার আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক চাপ সৃষ্টি করে ইসরায়েলি হামলা বন্ধ করার জন্য আহ্বান জানাচ্ছেন। তবুও কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে ক্রমশ মানবিক পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে। সাধারণ মানুষ ক্ষুধা, অপুষ্টি, ঘরবাড়ি ধ্বংস এবং আতঙ্কের মধ্যে দিনযাপন করছে।
গাজায় চলমান এই সংঘাত ও ইসরায়েলি হামলার ফলে পরিস্থিতি দ্রুত মানবিক সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছে। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ত্রাণ কার্যক্রম বাড়ানোর চেষ্টা করলেও তাত্ক্ষণিক সমাধান সম্ভব হচ্ছে না। সামরিক অভিযান, সীমিত খাদ্য সরবরাহ, এবং চিকিৎসা সংকট একত্রিত হয়ে সাধারণ মানুষের জীবন কঠিন করে তুলছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোও অভিযোগ করছে, ইসরায়েলি বাহিনী লক্ষ্যভিত্তিক হামলার মাধ্যমে সivilian এলাকায় ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে। এতে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি পরিবার বাস্তুচ্যুত হচ্ছে এবং শিশু ও বয়স্কদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে একটি স্পষ্ট সংকেত যাচ্ছে যে, গাজায় শান্তি স্থাপন ও সামরিক সংঘাত বন্ধ না হলে সাধারণ মানুষের জীবন ধ্বংস হতে পারে। তবে ইসরায়েল এই অভিযানকে নিজের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা নীতি হিসেবে ব্যাখ্যা করছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, গাজার রাস্তা ও আবাসিক এলাকা পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে। অনেক পরিবার আশ্রয়হীন হয়েছে, হাসপাতালে স্থান সংকট এবং ওষুধের অভাব লক্ষ্য করা গেছে। চিকিৎসক ও স্বেচ্ছাসেবকরা যুদ্ধক্ষেত্রে অব্যাহতভাবে আহতদের সেবা দিতে ব্যস্ত।
বর্তমান পরিস্থিতি থেকে স্পষ্ট যে, গাজার সাধারণ মানুষ এই সংঘাতের প্রধান শিকার। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তৎপরতা ছাড়া তাদের বাঁচার আশা সীমিত। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও প্রতিশোধ মূলক হামলা মানবিক বিপর্যয়কে আরও তীব্র করছে।