ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিল পর্তুগাল

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৬৯ বার
ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিল আরও কয়েকটি দেশ: বাড়ছে আন্তর্জাতিক সমর্থন

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিল ইউরোপের দেশ পর্তুগাল। রবিবার দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাওলো র‍্যাঞ্জেল নিউইয়র্কে জাতিসংঘে পর্তুগালের স্থায়ী মিশনের সদর দপ্তরে সাংবাদিকদের সামনে এই ঘোষণা দেন। এর মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া দেশগুলোর তালিকায় যুক্ত হলো আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। একই দিনে যুক্তরাজ্য, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়াও একই পদক্ষেপ নেওয়ায় আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার ঝড় উঠেছে।

পাওলো র‍্যাঞ্জেল তার বক্তব্যে বলেন, “ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া আমাদের পররাষ্ট্রনীতির মৌলিক এবং অপরিবর্তনীয় নীতির বাস্তবায়ন। আমরা বিশ্বাস করি, মধ্যপ্রাচ্যে ন্যায্য ও টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার একমাত্র পথ হলো দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, গাজায় বর্তমানে যে মানবিক বিপর্যয় চলছে তা বন্ধ করতে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি প্রয়োজন। ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়া মানেই এই মানবিক সঙ্কটের অবসান নয়, তবে এই স্বীকৃতি আন্তর্জাতিকভাবে ফিলিস্তিনের ন্যায্য অধিকারের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন।

পর্তুগিজ পররাষ্ট্রমন্ত্রী গাজায় চলমান ইসরায়েলি হামলা, অবৈধ বসতি স্থাপন, খাদ্য ঘাটতি ও ধ্বংসযজ্ঞের তীব্র নিন্দা জানান। তিনি বলেন, “আমরা গাজার মানবিক সংকটে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের ভিত্তিতে একটি টেকসই সমাধান নিশ্চিত করতে।”

বিশ্ব কূটনীতিতে এই ঘোষণা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, একই দিনে তিনটি জি৭ সদস্য দেশ—যুক্তরাজ্য, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়া—প্রথমবারের মতো ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এটি একদিকে পশ্চিমা শক্তিধর দেশগুলোর অবস্থানে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে, অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রতি তাদের দীর্ঘস্থায়ী নীতিগত সমর্থনেও নতুন প্রশ্ন তুলছে।

ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি বহু দশক ধরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচিত হয়ে আসছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বহুবার প্রস্তাব গৃহীত হলেও শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক অবস্থান ও ইসরায়েলের চাপের কারণে এ বিষয়ে দীর্ঘ অচলাবস্থা বজায় ছিল। তবে সম্প্রতি গাজায় ভয়াবহ মানবিক সংকট এবং ইসরায়েলের নিরবচ্ছিন্ন সামরিক অভিযানের কারণে পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যেও মতামতের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, পর্তুগালের এই পদক্ষেপ মূলত একটি প্রতীকী বার্তা বহন করছে। যদিও ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি অবিলম্বে গাজার যুদ্ধ থামাতে পারবে না, তবে এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ফিলিস্তিনের অবস্থানকে শক্তিশালী করবে এবং ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক আলোচনায় তাদের দাবিকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলবে।

অন্যদিকে, ইসরায়েল এই ধরনের স্বীকৃতিকে “একতরফা ও অযৌক্তিক” বলে আখ্যা দিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় দাবি করেছে, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া মানে হলো সন্ত্রাসবাদকে পুরস্কৃত করা। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ বলছে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত শান্তি আলোচনাকে এগিয়ে নেবে না বরং আরও জটিল করে তুলবে।

কিন্তু পশ্চিমা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এ ধরনের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ইসরায়েলকে চাপের মুখে ফেলবে এবং আলোচনার টেবিলে ফিরতে বাধ্য করবে। যুক্তরাজ্য ও কানাডার মতো দেশ দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত। তাই তাদের অবস্থান পরিবর্তনকে একটি বড় কূটনৈতিক বাঁকবদল হিসেবে দেখা হচ্ছে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশন সোমবার থেকে শুরু হচ্ছে নিউইয়র্কে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানাচ্ছে, ফ্রান্সসহ আরও কয়েকটি ইউরোপীয় দেশও ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার পথে হাঁটতে পারে। এর ফলে আসন্ন অধিবেশনটি মধ্যপ্রাচ্য সংকট নিরসনে একটি নতুন দিক উন্মোচন করতে পারে।

অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়তে পারে। ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে পশ্চিমা বিশ্ব ভবিষ্যতে ফিলিস্তিনে মানবিক সহায়তা বৃদ্ধি এবং পুনর্গঠনে বিনিয়োগের নতুন পথ খুলে দিতে পারে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের প্রতি আন্তর্জাতিক চাপও বেড়ে যাবে, যাতে তারা অবৈধ বসতি স্থাপন ও সামরিক আগ্রাসন বন্ধ করে।

বাংলাদেশসহ মুসলিম বিশ্ব বহু বছর ধরে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দাবি করে আসছে। বাংলাদেশের সরকার ফিলিস্তিনের প্রতি নীতিগত সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে আসছে প্রতিটি আন্তর্জাতিক ফোরামে। তাই পশ্চিমা বিশ্বের এই অবস্থান পরিবর্তনকে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মহলও স্বাগত জানাচ্ছে।

তবে বাস্তবতা হলো, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার পরও তাৎক্ষণিক কোনো পরিবর্তন আসবে না। গাজায় যুদ্ধবিরতি না হলে কিংবা পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন বন্ধ না হলে ফিলিস্তিনি জনগণের দুর্ভোগ কমবে না। কিন্তু আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ধারাবাহিকতা ফিলিস্তিনকে একটি বৈধ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে নেবে, যা ভবিষ্যতে শান্তি আলোচনায় একটি নতুন শক্তি হিসেবে কাজ করবে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, পর্তুগালসহ যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার একযোগে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া বিশ্ব রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী ঘটনা। এটি শুধু ফিলিস্তিনের সংগ্রামের প্রতি সমর্থন নয়, বরং ইসরায়েলের নীতির বিরুদ্ধে এক ধরনের বৈশ্বিক প্রতিবাদ। এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর থাকবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের দিকে, যেখানে আরও দেশ ফিলিস্তিনের স্বীকৃতিতে যোগ দিলে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির সম্ভাবনা নতুন মাত্রা পেতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত