ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিল আরও কয়েকটি দেশ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৩৭ বার
ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিল আরও কয়েকটি দেশ: বাড়ছে আন্তর্জাতিক সমর্থন

প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

ফিলিস্তিনকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার তালিকায় যুক্ত হলো আরও কয়েকটি নতুন নাম। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরুর প্রাক্কালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে আয়োজিত এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অ্যান্ডোরা, মোনাকো, লুক্সেমবার্গ ও মাল্টা আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়। একই মঞ্চে ফ্রান্স ও বেলজিয়ামও একই ঘোষণা দিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ডের খবরে বলা হয়েছে, জাতিসংঘ অধিবেশনের আগে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে একে একে ইউরোপের পাঁচটি দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়। এর মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতির পরিধি আরও সম্প্রসারিত হলো। দীর্ঘদিন ধরেই ফিলিস্তিনকে পূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতির দাবি জানিয়ে আসছিল আরব ও মুসলিম বিশ্বের দেশগুলো। এবার ইউরোপের ছোট কিন্তু প্রভাবশালী দেশগুলোর পাশাপাশি ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোর অবস্থান পরিবর্তন আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

সম্মেলনে অংশ নিয়ে মাল্টার প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমাদের এই সিদ্ধান্ত শান্তি ও ন্যায়বিচারের প্রতি অঙ্গীকারের প্রতিফলন। একই সঙ্গে এটি ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের প্রতি আমাদের অকুণ্ঠ সমর্থন প্রকাশ করছে।” লুক্সেমবার্গের প্রধানমন্ত্রী একে আখ্যা দেন ‘ঐতিহাসিক মুহূর্ত’ হিসেবে। তিনি বলেন, ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া শুধু একটি রাজনৈতিক পদক্ষেপ নয়, এটি বিশ্ব শান্তির পথে অগ্রসর হওয়ার জন্য অপরিহার্য উদ্যোগ।

অন্যদিকে বেলজিয়ামের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এই পদক্ষেপ দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের প্রতি তাদের সমর্থনেরই বহিঃপ্রকাশ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতিগত অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সম্মেলনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘোষণা আসে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর কাছ থেকে। তিনি বলেন, “আজ আমি ঘোষণা করছি— ফ্রান্স ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিচ্ছে। এটাই একমাত্র সমাধান, যা ইসরাইলকে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের সুযোগ করে দেবে।” তার মতে, কার্যকর রাজনৈতিক আলোচনার পথ খুলতে এই স্বীকৃতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একইসঙ্গে তিনি আরব ও মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে আহ্বান জানান, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর যেন তারা ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে।

ফরাসি প্রেসিডেন্ট সাম্প্রতিক সময়ে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়া অন্যান্য দেশ— অ্যান্ডোরা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, মোনাকো, পর্তুগাল, যুক্তরাজ্য ও সান মারিনোর ভূয়সী প্রশংসা করেন। তার মতে, এসব দেশের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে একটি শক্তিশালী বার্তা দিচ্ছে যে, ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকার আর উপেক্ষিত থাকতে পারে না।

ফ্রান্স ও সৌদি আরবের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই সম্মেলনটি ছিল জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত অনুরূপ এক বৈঠকের ধারাবাহিকতা। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল এতে অংশ নেয়নি। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই অনুপস্থিতি প্রমাণ করে যে ইসরাইল ও তার প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্র এখনো ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রশ্নে তাদের অবস্থানে অনড়। তবে ইউরোপের প্রভাবশালী দেশগুলোর অবস্থান পরিবর্তন ইসরাইলের জন্য কূটনৈতিক চাপে রূপ নিতে পারে।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার এই নতুন ধারা ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাতের দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের জন্য আশার আলো জ্বালাচ্ছে। একদিকে আরব রাষ্ট্রগুলো দীর্ঘদিন ধরে এই দাবি জানিয়ে আসছিল, অন্যদিকে পশ্চিমা বিশ্বে এমন সাহসী পদক্ষেপ বিরল ছিল। ফ্রান্সের মতো একটি স্থায়ী নিরাপত্তা পরিষদ সদস্য দেশের স্বীকৃতি দেওয়ার মধ্য দিয়ে এই দাবি এখন বৈশ্বিক রাজনীতিতে নতুনভাবে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

তবে এরই মধ্যে ইসরাইল এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেছে। দেশটির একাধিক নেতা বলেছেন, ফিলিস্তিনকে একতরফা স্বীকৃতি দেওয়ার ফলে শান্তি প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়ে উঠবে। তাদের দাবি, এই স্বীকৃতি আলোচনাকে আরও কঠিন করে তুলবে এবং ইসরাইলের নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলবে।

অন্যদিকে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এই স্বীকৃতিকে স্বাগত জানিয়েছে। ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস এক বিবৃতিতে বলেন, “এটি শুধু ফিলিস্তিন নয়, বরং বিশ্বব্যাপী ন্যায় ও শান্তির জন্য একটি বিজয়।” তিনি এই সিদ্ধান্তকে ইতিহাসের মোড় ঘোরানো ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ধন্যবাদ জানান।

জাতিসংঘ মহাসচিবও এই উদ্যোগকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ফিলিস্তিনকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হলে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান বাস্তবায়নের সুযোগ আরও দৃঢ় হবে। তবে তিনি সব পক্ষকে সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান জানান।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশ দীর্ঘদিন ধরেই ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ঢাকা সবসময় ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও স্বাধীনতার আন্দোলনে দৃঢ় সমর্থন দিয়ে আসছে। সাম্প্রতিক এই ঘোষণার পর বাংলাদেশের কূটনীতিক মহলেও আলোচনা শুরু হয়েছে যে, পশ্চিমা বিশ্বে ফিলিস্তিন স্বীকৃতির ঢেউ ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত এই আন্তর্জাতিক সম্মেলন ফিলিস্তিন প্রশ্নে বৈশ্বিক রাজনীতির একটি নতুন অধ্যায় সূচনা করেছে। ইউরোপের একাধিক দেশ ও ফ্রান্সের মতো প্রভাবশালী রাষ্ট্র ফিলিস্তিনকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ফিলিস্তিনের অবস্থান আরও শক্তিশালী হলো। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল এখনো বিরোধিতার অবস্থানে রয়েছে, তবুও বিশ্ব সম্প্রদায়ের একাংশ মনে করছে— এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী দিনে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা শুধু স্বপ্ন নয়, বাস্তবতায় রূপ নিতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত