প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
সিলেট নগরীতে সম্প্রতি শুরু হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, জেলা প্রশাসন ও সিটি করপোরেশনের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত বিশেষ অভিযান। এ অভিযানের মূল লক্ষ্য নগরীকে হকারমুক্ত করা, অবৈধ যানবাহনের দৌরাত্ম্য কমানো এবং নগরীর শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। দীর্ঘদিন ধরে নগরীর রাস্তাঘাটে অনিয়ন্ত্রিত অটোরিকশা, অবৈধ গাড়ি ও ফুটপাত দখল করে বসা হকারদের কারণে সাধারণ মানুষের চলাচলে সীমাহীন ভোগান্তি তৈরি হয়েছিল। নগরীর সৌন্দর্য ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি নাগরিক জীবনযাত্রাকে সহজ করার উদ্দেশ্যে এ অভিযানের সূচনা হয়।
অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকেই এটি সিলেটবাসীর এক বড় অংশের সমর্থন অর্জন করেছে। নগরীর প্রধান প্রধান সড়কগুলোতে অবৈধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা অটোরিকশা ও ছোটখাটো গাড়ি অপসারণের ফলে যানজট কিছুটা হলেও কমেছে। ফুটপাত দখল করে থাকা হকারদের সরিয়ে দেওয়ায় পথচারীরা অবাধে হাঁটার সুযোগ পাচ্ছেন। অনেকেই এটিকে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণের পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং স্থানীয় আড্ডায় অনেকে জানিয়েছেন, নগরীকে শৃঙ্খলার আওতায় আনার জন্য এমন উদ্যোগ অনেক আগে নেওয়া উচিত ছিল।
তবে জনসমর্থনের পাশাপাশি এ অভিযানের কারণে কিছু সমস্যাও তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে প্রতিদিন কর্মস্থলে যাতায়াত করা অফিসগামী মানুষরা কিছু ক্ষেত্রে বিড়ম্বনায় পড়ছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দায়িত্ব পালনের সময় অনেক গাড়ি আটকাচ্ছে এবং এর ফলে অযথা সময়ক্ষেপণ হচ্ছে। একজন অফিসগামী ভুক্তভোগী একটি বাংলাদেশ অনলাইনের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, “অভিযানটা অবশ্যই ভালো উদ্যোগ। তবে অফিসে পৌঁছাতে প্রতিদিন ঝামেলায় পড়ছি। গাড়ি আটকে রেখে অনেক সময় ধরে দাঁড় করিয়ে রাখা হচ্ছে। যদি আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করা হয়, তাহলে মানুষের ভোগান্তি অনেক কমে আসবে।”
সিলেট নগরীর চিত্র গত কয়েক বছরে ক্রমশ জটিল হয়ে উঠেছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শহরে বেড়েছে অটোরিকশার সংখ্যা। অনিয়ন্ত্রিত এসব যানবাহন শহরের প্রতিটি সড়কে ভিড় বাড়িয়েছে। তাছাড়া ফুটপাতগুলো দখল করে বসা হকারদের কারণে পথচারীদের বিকল্প কোনো উপায় থাকত না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিকল্পনাহীন নগরায়ণ, অব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক শিথিলতার কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। ফলে এ অভিযানের মাধ্যমে শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।
অবশ্য হকারদের উচ্ছেদ নিয়ে কিছু মানবিক প্রশ্নও উঠছে। দীর্ঘদিন ধরে ফুটপাতে বসে জীবিকা নির্বাহ করা মানুষের হঠাৎ উচ্ছেদে তারা বিপাকে পড়েছেন। অনেক হকার জানান, প্রশাসন যদি তাদের জন্য বিকল্প বাজার বা নির্দিষ্ট স্থানে বসার সুযোগ করে দিত, তাহলে তাদের জীবিকা নির্বাহে সমস্যা হতো না। তারা মনে করছেন, জীবিকার নিশ্চয়তা না দিয়ে হঠাৎ উচ্ছেদ করা হলে অনেক পরিবার অনিশ্চয়তায় পড়বে। নগর উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নগরীতে শৃঙ্খলা আনার পাশাপাশি এসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর বিকল্প কর্মসংস্থানের পথ খুঁজে বের করা উচিত।
অন্যদিকে যাত্রী ও সাধারণ নগরবাসী বলছেন, সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ফলে প্রথমদিকে কিছুটা অসুবিধা হলেও দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল সবাই ভোগ করবে। একজন বাসিন্দা বলেন, “যানজট কমছে, ফুটপাত দিয়ে হাঁটার জায়গা হচ্ছে—এটাই বড় অর্জন। কয়েকদিন ভোগান্তি হলেও আমরা চাই নগরী দীর্ঘমেয়াদে সুন্দর ও বাসযোগ্য হয়ে উঠুক।”
সিলেট সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, এ অভিযানের লক্ষ্য কেবল হকার উচ্ছেদ নয়; বরং একটি স্থায়ী নগর ব্যবস্থাপনা তৈরি করা। এ কারণে অবৈধ গাড়ি অপসারণ, ফুটপাত দখল মুক্ত করা এবং শহরের সড়কগুলোতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রাখা হবে। জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানান, সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে যথাসম্ভব দায়িত্বশীলভাবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, শহরের অব্যবস্থাপনা দীর্ঘদিনের সমস্যা। একদিনে সব সমাধান সম্ভব নয়, তবে ধাপে ধাপে পরিস্থিতি উন্নত করা হবে।
সিলেট নগরীর এ উদ্যোগকে অনেকেই মডেল হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, দেশের অন্য শহরগুলোতেও যদি একই ধরনের অভিযান পরিচালিত হয়, তাহলে নগরগুলোতে শৃঙ্খলা ফিরবে এবং মানুষ স্বস্তি পাবে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন, কেবল অভিযান চালিয়ে সমস্যা সমাধান হবে না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, যেখানে নগরীর পরিবহন ব্যবস্থা, হকারদের পুনর্বাসন, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানো অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
সামাজিক বিজ্ঞানীরা মনে করেন, নগরীর শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি সুষ্ঠু নাগরিক সংস্কৃতি গড়ে তোলাও জরুরি। নাগরিকরা যদি আইন মেনে চলার অভ্যাস তৈরি না করেন, তাহলে অভিযান শেষ হওয়ার পর আবারো একই পরিস্থিতি ফিরে আসবে। তাই প্রশাসনের পাশাপাশি নাগরিক সমাজকেও দায়িত্ব নিতে হবে।
সব মিলিয়ে সিলেটে পরিচালিত এ অভিযান নগর উন্নয়ন ও জনজীবনকে নতুনভাবে ভাবার সুযোগ এনে দিয়েছে। এটি যেমন শৃঙ্খলা ফেরানোর আশা জাগিয়েছে, তেমনি মানবিক ও বাস্তব সমস্যার মুখোমুখিও দাঁড় করিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসন কীভাবে জনসমর্থন ধরে রেখে, জনগণের ভোগান্তি কমিয়ে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের বিকল্প সমাধান নিশ্চিত করে এ উদ্যোগকে দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর করতে পারে।