প্রকাশ: ০২অক্টোবর ‘২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
গাজার অবরুদ্ধ উপত্যকায় মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করা একটি আন্তর্জাতিক ফ্লোটিলাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন দেশের জনপ্রিয় ইসলামী আলোচক মিজানুর রহমান আজহারী। নিজের ফেসবুক পেজে তিনি লিখেছেন— “প্রভু হে! একটি জলযান হলেও, তুমি সৈকতে ভিড়তে দাও। অভুক্ত ভাই-বোনেরা অধীর আগ্রহে তাদের অপেক্ষা করছে।” সংক্ষিপ্ত এই দোয়াই যেন হাজারো নিরুপায় মানুষের আর্তনাদকে বহন করছে, যারা দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলি অবরোধে বন্দি থেকে ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও চিকিৎসা সংকটে দিনাতিপাত করছে।
আজহারীর পোস্ট মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেটিতে হাজার হাজার লাইক, শেয়ার ও কমেন্ট জমা পড়ে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ পোস্টটিকে শেয়ার করে গাজার মানুষের জন্য দোয়া করেন এবং তাদের পাশে থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। অনেকে লিখেছেন, এই প্রার্থনা কেবল একটি ধর্মীয় অনুভূতি নয়, বরং এটি একটি বৈশ্বিক মানবিক আহ্বান।
গাজায় চলমান পরিস্থিতি বর্তমানে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গত কয়েক দশক ধরে চলতে থাকা ইসরায়েলি অবরোধ গাজাকে একটি খোলা কারাগারে পরিণত করেছে। প্রায় ২৩ লাখ মানুষের বসবাস এই সংকীর্ণ ভূখণ্ডে, যেখানে খাদ্য, পানি, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের মারাত্মক ঘাটতি তৈরি হয়েছে। হাসপাতালগুলোতে বিদ্যুৎ সংকট ও ওষুধের ঘাটতির কারণে চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। প্রতিদিন অসংখ্য শিশু ও বৃদ্ধ মৌলিক চিকিৎসা না পেয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে গাজার অভ্যন্তরে পুষ্টিহীনতায় আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতেই আন্তর্জাতিক মানবাধিকারকর্মী ও বিভিন্ন সংগঠন একত্র হয়ে “সুমুদ ফ্লোটিলা” নামের উদ্যোগ নেয়।
ফ্লোটিলাটি মানবিক সহায়তা নিয়ে সাগরপথে গাজার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছে। প্রথম বহর যাত্রা করে গত ৩১ আগস্ট, স্পেনের বার্সেলোনা থেকে। এরপর ১৩ থেকে ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তিউনিসিয়া এবং ইতালির সিসিলি দ্বীপ থেকে আরও কয়েকটি নৌযান এতে যুক্ত হয়। এর পাশাপাশি গ্রিসের সাইরাস দ্বীপ থেকেও পরবর্তী সময়ে নতুন নতুন জাহাজ বহরে যোগ হয়। বর্তমানে এই ফ্লোটিলায় ৪০টিরও বেশি জাহাজ রয়েছে, যেগুলো খাদ্য, ওষুধ, পোশাক, চিকিৎসা সামগ্রী এবং শিশুদের জন্য বিশেষ সহায়তা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে গাজার দিকে।
যদিও এই ধরনের উদ্যোগ নতুন নয়, বরং অতীতেও বারবার আন্তর্জাতিক মানবিক কাফেলা গাজার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে। তবে প্রায় প্রতিবারই ইসরায়েলি নৌবাহিনী বাধা দিয়েছে, অনেক সময় জাহাজ আটক করেছে এবং মানবাধিকারকর্মীদের গ্রেপ্তার করেছে। ইতিহাসের আলোচিত এক দৃষ্টান্ত হলো ২০১০ সালের “মাভি মারমারা” ফ্লোটিলা, যেখানে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় বহু মানুষ নিহত হয়েছিলেন। সেই রক্তক্ষয়ী স্মৃতি আজও মানবাধিকারের ইতিহাসে কালো অধ্যায় হিসেবে রয়েছে। তাই এবারও অনেকের মনে শঙ্কা, ইসরায়েল হয়তো একই কৌশল নেবে। তবে তবুও মানবিক সহায়তার কাফেলা থামেনি।
আজহারীর আবেগঘন প্রার্থনা এই প্রেক্ষাপটেই এসেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের এমন আহ্বান জনমনে সচেতনতা তৈরি করে এবং আন্তর্জাতিক মহলকে বিষয়টি নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে। আজহারীর অনুসারীরা সাধারণত তরুণ প্রজন্মের, যাদের বড় অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়। ফলে তার পোস্ট মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের নানা প্রান্তে, এবং এটি ফিলিস্তিনের প্রতি নতুন করে সহমর্মিতা তৈরি করতে সাহায্য করছে।
আন্তর্জাতিক মহলেও ফ্লোটিলাকে ঘিরে প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। জাতিসংঘ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা গাজার মানবিক সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং অবিলম্বে সাহায্য পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, ইসরায়েলি অবরোধ অতিক্রম করা অত্যন্ত কঠিন। পশ্চিমা দেশগুলোর একাংশ মৌখিকভাবে মানবিক সহায়তার প্রতি সমর্থন জানালেও প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে তারা অনিচ্ছুক। ফলে ফ্লোটিলার সফলতা এখন অনেকটাই নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক চাপ এবং মানবাধিকারকর্মীদের ঐক্যের উপর।
অন্যদিকে গাজার অভ্যন্তরে ফ্লোটিলাকে ঘিরে দেখা দিয়েছে আশার আলো। স্থানীয়রা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও বার্তা দিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছেন। তারা বলছেন, “আমরা জানি না আগামীকাল বাঁচব কি না, কিন্তু জানি বিশ্ব আমাদের ভুলে যায়নি।” এই কণ্ঠস্বরই প্রমাণ করে, মানবিক সহায়তার বহর কেবল খাদ্য বা ওষুধ পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম নয়, বরং এটি মানুষের বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষাকে বাঁচিয়ে রাখার প্রতীক।
গাজার সংকট আজ শুধু একটি ভূখণ্ডের সমস্যা নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের মানবতার জন্য এক কঠিন পরীক্ষা। আজহারীর দোয়া তাই কেবল একটি ধর্মীয় প্রার্থনা নয়, বরং এটি মানুষের কাছে মানুষের দায়বদ্ধতার স্মারক। তিনি যেন বিশ্ববাসীর কাছে এই বার্তাই দিয়েছেন— একটিমাত্র নৌযান হলেও যদি গাজার সৈকতে পৌঁছায়, তবে তা হবে মানবতার বিজয়।
মানবতার পক্ষে দাঁড়ানো এই ফ্লোটিলা সফল হবে কি না তা এখনো অনিশ্চিত। তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, আজহারীর দোয়া এবং সাধারণ মানুষের ভালোবাসা ও সমর্থন ইতোমধ্যেই গাজার মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে গেছে। এবং সেই আশাই হয়তো একদিন বাস্তবে রূপ নেবে, যখন একটি নয়, বহু জলযান গাজার উপকূলে ভিড়বে, আর ক্ষুধার্ত শিশুদের মুখে ফুটবে হাসি।