প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ‘২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ফিলিস্তিনের জলসীমায় ইসরায়েলের কোনো কর্তৃত্ব নেই বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের (পিএ) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার ওপর ইসরায়েলি বাহিনীর সাম্প্রতিক আক্রমণ ও আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা জানিয়ে এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, আন্তর্জাতিক আইন ও বিচারালয়ের ঘোষণার ভিত্তিতে ফিলিস্তিনের সমুদ্রসীমা স্বাধীন এবং সেখানে ইসরায়েলের কোনো অধিকার নেই।
বৃহস্পতিবার (২ অক্টোবর) কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরার লাইভ প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্তত ২১টি নৌকা আটকে দেওয়ার পর ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ এ নিয়ে তাদের গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা মূলত একটি শান্তিপূর্ণ ও বেসামরিক নেতৃত্বাধীন উদ্যোগ, যার উদ্দেশ্য গাজায় দীর্ঘদিন ধরে চলা অবৈধ অবরোধ ভেঙে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া। ইসরায়েলি অবরোধের কারণে গাজা উপত্যকার প্রায় ২৩ লাখ মানুষ বছরের পর বছর ধরে খাদ্য, ওষুধ, চিকিৎসা সামগ্রী ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের সংকটে দিন কাটাচ্ছে।
পিএ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও মানবিক আইনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণভাবে একটি ন্যায়সঙ্গত ও সাহসী পদক্ষেপ। এর লক্ষ্য হলো ইসরায়েলের আরোপিত অমানবিক অবরোধ ও গণহত্যার নীতি বন্ধ করে বিশ্বকে দেখানো যে, গাজাবাসীকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে রাখার এ নীতি কেবল অন্যায়ই নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) ইতোমধ্যে ইসরায়েলি দখলদারিত্বকে অবৈধ ঘোষণা করেছে। সুতরাং গাজার জলসীমায় ইসরায়েলের কোনো প্রকার কর্তৃত্ব বা সার্বভৌমত্বের দাবি আইনি দিক থেকেও সম্পূর্ণ অবৈধ।
ফিলিস্তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সুমুদ ফ্লোটিলার সাহসী অংশগ্রহণকারীদের প্রশংসা করেছে। তারা বলেছে, আন্তর্জাতিক মানবতার পক্ষের এই যাত্রীরা অবরুদ্ধ জনগণের পাশে দাঁড়ানোর জন্য যে দৃঢ় সংকল্প প্রদর্শন করেছেন, তা শুধু ফিলিস্তিনিদের নয়, সমগ্র বিশ্বের জন্যই এক প্রেরণা। গাজার মানুষ যখন প্রতিদিন অবরোধ, ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও অমানবিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, তখন বিশ্ববাসীর পক্ষ থেকে এমন সংহতি অবরুদ্ধ জনগণের মনে আশার আলো জ্বালায়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসরায়েলের এ ধরনের বাধা প্রদানের কৌশল দীর্ঘদিনের। অতীতে একাধিকবার মানবিক সহায়তা বহনকারী কাফেলাকে বাধা দেওয়া হয়েছে। ২০১০ সালের মাভি মারমারা ঘটনার কথা এখনও আন্তর্জাতিক মহলে আলোচিত, যেখানে ইসরায়েলি নৌবাহিনীর হামলায় বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। সেই ঘটনার পর থেকে প্রত্যেকটি ফ্লোটিলা অভিযানে ঝুঁকি থাকলেও মানবিক সংহতির বার্তা পৌঁছাতে বিশ্বজুড়ে মানুষ এগিয়ে এসেছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিভিন্ন অংশ থেকে ইতোমধ্যেই ইসরায়েলের এ পদক্ষেপের সমালোচনা করা হয়েছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা গাজায় চলমান অবরোধকে মানবিক বিপর্যয় হিসেবে উল্লেখ করেছে। অনেক মানবাধিকারকর্মী মনে করছেন, ইসরায়েলের এ ধরনের বাধা কেবল গাজার জনগণকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং আন্তর্জাতিক আইন ও মানবতার মৌলিক নীতির বিরুদ্ধেও অবস্থান করছে।
ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গাজার অবরোধ কোনো নিরাপত্তা বিষয়ক কৌশল নয়, বরং এটি সরাসরি অনাহার নীতি, যা গণহত্যার সমান অপরাধ। তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আহ্বান জানিয়েছে, অবিলম্বে এই অবরোধ ভাঙতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব জোর দিয়ে বলেছে, বিশ্ব যদি এখনই কঠোর পদক্ষেপ না নেয়, তবে এই মানবিক বিপর্যয় আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।
গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা বর্তমানে আন্তর্জাতিক মিডিয়ার নজরে রয়েছে। প্রায় ৪০টিরও বেশি নৌযান খাদ্য, ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস বহন করে গাজার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। এর যাত্রীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানবাধিকারকর্মী, স্বেচ্ছাসেবী এবং সাধারণ মানুষ, যারা নিজেদের জীবন বিপন্ন করে হলেও গাজায় পৌঁছাতে চান। তাদের লক্ষ্য হলো, ইসরায়েলের আরোপিত কৃত্রিম সীমানা ভেঙে মানবিক বার্তা পৌঁছে দেওয়া।
পিএ মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, ফ্লোটিলার যাত্রা থামানো মানে মানবিক সহায়তা প্রত্যাখ্যান করা। এটি শুধু গাজার মানুষের অধিকার লঙ্ঘন নয়, বরং সমগ্র মানবতার প্রতি অমানবিক আচরণ। তারা আবারও আন্তর্জাতিক আদালতের রায় উল্লেখ করে বলেছে, ফিলিস্তিনের জলসীমায় ইসরায়েলের কোনো কর্তৃত্ব নেই। যে কারণে ফ্লোটিলার গতিপথ আটকানো এবং যাত্রীদের হয়রানি করা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের সামিল।
গাজার অভ্যন্তর থেকে পাওয়া সংবাদে জানা গেছে, স্থানীয় মানুষ ফ্লোটিলাকে ঘিরে আশার আলো দেখছেন। তারা বিশ্বাস করেন, বিশ্ববাসীর সহায়তায় অন্তত কিছুটা হলেও তাদের দুর্ভোগ লাঘব হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বার্তা পাঠাচ্ছেন এবং বলছেন, “আমরা হয়তো মুক্ত নই, কিন্তু জানি আমরা একা নই।”
এখন প্রশ্ন উঠছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, বিবৃতি বা নিন্দা যথেষ্ট নয়, বাস্তবে অবরোধ ভাঙার জন্য শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় গাজার শিশুদের মৃত্যু, হাসপাতালের সংকট ও মানুষের দুর্ভোগ চলতেই থাকবে।
ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের এই শক্ত অবস্থান তাই কেবল একটি কূটনৈতিক বিবৃতি নয়, বরং বিশ্বকে দায়িত্বশীলতার পথে হাঁটার আহ্বান। গাজার মানুষের দিকে তাকালে স্পষ্ট বোঝা যায়, এটি আর কেবল একটি ভূখণ্ডের সংকট নয়, বরং মানবতার সার্বজনীন প্রশ্ন। ইসরায়েলের অবরোধের অবসান ঘটাতে এখন কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।